ঢাকা, রোববার, ৩০ এপ্রিল ২০১৭ | ১৭ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

বোঝার আগেই লেগুনার হাতল ধরছে শিশুরা


অমৃতবাজার রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৪:৫০ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার | আপডেট: ০৫:০৪ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার
বোঝার আগেই লেগুনার হাতল ধরছে শিশুরা

জীবন ও জীবিকার তাগিদে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে অনেক শিশুই নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত হয়ে পড়ছে। যাত্রী পরিবহনের জন্য স্থানীয়ভাবে তৈরি ‘লেগুনায়’ চালক বা হেলপারের মতো অনিশ্চিত কাজেও যোগদান করছে এসব শিশু।

বরিশাল থেকে জীবিকার তাগিদে ঢাকা শহরে আসা পলাশ চন্দ্র সাহার ১২ বছর বয়সী পুত্র বিপুল চন্দ্র সাহা তাদেরই একজন। রাজধানীতে সে তার পড়াশুনা ও খাবারের জন্য ‘লেগুনার’ হেলপার হিসেবে জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে।

মহাখালীর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র বিপুল ফার্মগেইট-মহাখালী রুটে প্রতিদিন সকাল ১০ থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত হেলপার হিসেবে কাজ করে থাকে। এ সময় সে লেগুনা, লেগুনা বলে যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষন করে তার গাড়ীতে উঠানোর চেষ্টা করে থাকে। সে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়াও সংগ্রহ করে। এ কাজ করে সে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা রোজগার করে থাকে।

আলাপকালে বিপুল জানায়, দু’বছর বয়সে তার মা মারা যায়। তার বাবা তাকে লালন-পালনের জন্য আর বিয়ে-শাদী করেন নি। কিন্তুু দু:খজনকভাবে বেশ কয়েক বছর আগে তার বাবাও অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই এখন বিপুলই তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবাকে দেখাশুনা করা বিপুলের দায়িত্ব হয়ে পডেছে।

বিপুল জানায় সকালে সে স্কুলে যায় এবং সকাল সাড়ে নয়টায় স্কুল থেকে বাসায় ফিরে। অন্যান্য ছাত্রদের সহায়তায় সে স্কুলেই তার বাড়ীর পড়ালেখা শেষ করে। তার বাবা প্রায়ই অসুস্থ্য হয়ে পড়ায় সে মাঝেমাঝে স্কুলে যেতে পারে না।
বিপুল জানায়, সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য লেগুনার এ কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ন কাজ করে যাচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি এডভোকেট মনজিল মুর্শিদ জানান যে বিপুলের মত শিশুরা যাতে বিদ্যালয়ে ফিরতে পারে সেজন্য তার মতো পরিবারকে উচিত সরকারের সহায়তা করা। কারণ দেশের প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ শিশু পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার আগেই যে কোন কাজে যোগদান করতে বাধ্য হয়।

মুর্শিদ শিশুশ্রম বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত।

২০০৩ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর(বিবিএস) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা(আইএলও)’র জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭৮ লাখ শিশু অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত রয়েছে। তার মধ্যে ৩২ লাখ শিশু শ্রমিক এবং ১৩ লাখ শিশু নানা ধরনের ছোট ছোট অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত রয়েছে। শিশু শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা ১৭ দশমিক ৪ ভাগ শিশু রাজধানীতে নানা কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, সস্তা শ্রমের জন্য লোকজন শিশুদের কাজে নিয়োজিত করে থাকে। আর শিশুরা তাদের কাজের ন্যায্য মজুরীর জন্য দর কষাকষিও করতে পারে না। দারিদ্রতা, সামাজিক রীতিনীতি এবং নিয়ম-নীতি ও শিক্ষার অভাব এখনও শিশু শ্রমের জন্য প্রধান কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দেশের যে সাড়ে ছয় লাখ শিশু বিশেষ করে ঢাকায় বর্তমানে নয়টি কঠোর ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় অর্থাৎ চামড়া ও রাসায়নিক শিল্প, পাথর ভাঙ্গা, মোটর গ্যারেজ এবং ওয়েল্ডিং কার্যক্রম, হোটেল ও রেস্তোরা ও বই বাধাইয়ের কাজের সাথে জড়িত সে সকল শিশুদের জন্য বিকল্প উপায় খুঁজে বের করার জন্য সরকারের সাথে কাজ করার জন্য দেশের এনজিওগুলোর প্রতি আহবান জানান তিনি।

ইউনিসেফ এবং আইএলওর ২০০৭ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু গৃহস্থালী শ্রমের সাথে জড়িত, যাদের মধ্যে শতকরা ৮৩ ভাগ কন্যাশিশু। ২০১৩ সালের জাতীয় শিশু শ্রমিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৩৪ লাখ শিশু তাঁদের জীবন ধারনের জন্য কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশার সাথে জড়িত হয়। বাসস।

অমৃতবাজার/এনএস