ঢাকা, রোববার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের কোচ ও তাদের অস্বাভাবিক বিদায়!


অমিত সূত্রধর

প্রকাশিত: ০৩:৫৬ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৭, সোমবার
বাংলাদেশের কোচ ও তাদের অস্বাভাবিক বিদায়!

কোচ আসে কোচ যায়! বাংলাদেশে ক্রিকেটে কোচের ঘন ঘন আসা যাওয়া একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কোচ এসেছে কোচ চলেও গেছে অনেকেরই বিদায় ছিল প্রশ্নবিদ্ধ! প্রায় অধিকাংশ কোচের বিদায় ছিল বিতর্কিত। বিতর্কিত বিদায় শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্ম লগ্নের সেরা কোচ গর্ডন গ্রিনিজকে দিয়ে এবং এবার চলে যাচ্ছেন বিশ্ব ক্রিকেটকে হঠাৎ চমকে দিয়ে বাংলাদেশকে জয়ের ধারার রাখা, বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত, সমালোচিত, সফল কোচ চান্দ্রিকা হাথুরুসিংহে। গর্ডন থেকে হাথুরু প্রায় অধিকাংশ কোচের বিদায় ছিল অস্বাভাবিক।

• গর্ডন গ্রিনিজ (১৯৯৬-৯৯)
যদি কেউ প্রশ্ন করে বাংলাদেশের সেরা কোচ কারা তবে প্রথম আসবে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান “গর্ডন গ্রিনিজ” এর নাম। কারন তার হাত ধরেই ছোট্ট বাংলাদেশ ক্রিকেটে জয় পেতে শিখেছে। অমর নাথের ব্যর্থতার পর ১৯৯৬ এসেই বাজিমাত করে দিয়ে ছিলেন। ১৯৯৭ এর আইসিসি ট্রফি জয়, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ এ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম ওয়ানডে জয় এবং সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ১৯৯৯ এ বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ খেলা সাথে স্কটল্যান্ড ও বড় দল পাকিস্তানকে হারানো।বাংলাদেশের জন্য করছেন অনেক নিজে মাঠ শুকাতে তোয়ালে নিয়ে নেমে পরেছিলেন মালয়েশিয়ার মাঠে। সেই মানুষটির প্রস্থান হয়েছিল অত্যন্ত বাজে ভাবে। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তান বধের দিন তাকে বরখাস্ত করা হয়। অকৃতজ্ঞতার সেরা উদাহরন দিয়ে একপ্রকার অপমান করে তাকে বিদায় দেয়া হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস চায় না,খেলোয়াড়দের মাঝে গ্রুপিং সৃষ্টি করা সহ আরও অজ্ঞাত অভিযোগ।

• এডি বারলো (১৯৯৯-২০০০)-
নিজের দেশ ছিল সাউথ আফ্রিকা, কিন্তু বিদায়ের সময় যার কান্না দেখে কেউ বুঝতে পারবে না যে বাংলাদেশ তার জন্মভুমি নয়। এডি বারলো, যার সমস্ত আবেগ ভালবাসা ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে। বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পেতে সাহায্য করেছিলেন তিনি। স্থায়ীভাবে থাকতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশে। কিন্তু হঠাৎ মস্তিকে রক্ত ক্ষরণ হয়ে হারিয়ে ফেলেন চলা ফেরা করার শক্তি। যখন বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট খেলতে নামার প্রহর গুনছে তখন বারলো ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার হয়ে হুইল চেয়ারে সময় কাটাচ্ছিল। ২০০০ সালে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচে হুইল চেয়ার নিয়েই মাঠে ছিল দলের সাথে। ২০০১ সালে তাকে বিদায় দেয়া হয় ।

• ট্রেভর চ্যাপেল (২০০১-০২)
“আন্ডারআর্ম” বোলিংয়ের জন্য কুখ্যাতি কামানো সেই ট্রেভর চ্যাপেল। বিখ্যাত গ্রেগ ও ইয়ান চ্যাপেলদের ছোট ভাই ট্রেভর চ্যাপেল যার কোচিং বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য সুফল বয়ে আনে নি। বরং ক্ষতি হয়েছে। তার ছাত্রদের ভুল গুলো আড়াল করা,ভাষাগত সমস্যা,বুলবুল-আকরামদের মোট ট্যালেন্টদের দল থেকে বের করে দেয়ার কারণে তার চুক্তির মেয়াদ বারানো হয় নি। দেশে ও দেশের বাহিরের সিরিজে বাজে ফলের কারণে অস্বাভাবিক ভাবে তাকে বিদায় দেয়া হয়।

• মহসিন কামাল-আলি জিয়া (২০০২-০৩)
বাংলাদেশ ক্রিকেটের কালো অধ্যায়ের রূপকার হয়ে এসেছিলেন পাকিস্তানী ২ কোচ মহসিন কামাল ও তার বন্ধু কোন টেস্ট ম্যাচ না খেলা আলী জিয়া । যাচ্ছে তাই কোচিং ,ব্যাটসম্যানদের শুধু শেখাতেন “সিধা খেলো ভাই” । টানা বাজে পারফর্মেন্স, ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে বিধ্বস্ত এক বাংলাদেশ উপহার দিয়ে ছিল এই দুই পাকিস্তানী। স্বাভাবিক নিয়মে গিয়েছিল তাদের চাকুরি কিন্তু তাদের অস্বাভাবিক, প্রশ্নবিদ্ধ কোচিং পদ্ধতি দেখে প্রশ্ন জাগতেই পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ধ্বংস করতে আসেননি তো তারা!

• জেমি সিডন্স (২০০৭-১১)
হোয়াট মোর ভাঙ্গা চোরা বাংলাদেশকে দাড় করিয়ে চলে জান। এরপর জেমি সিডন্স ভালই করছিল। কিন্তু বোর্ডের সাথে দ্বন্দ্ব, প্রিয় খেলোয়াড় ছাড়া অন্যদের বাকা চোখে দেখা, বোর্ডের নানা কুকীর্তি প্রতিবাদ করায় তাকে বিদায় করা হয়। এত ভালো সার্ভিস দিয়েও অস্বাভাবিক ভাবে তাকে বিদায় করা হয় এমন কি ২ বছর পর ব্যাটিং কোচ হিসেবে আসতে চাইলেও তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়।

• স্টুয়ার্ট ল (২০১১-১২)
সিডন্সের বিদায়ের পর মাত্র ৩ মাস বাংলাদেশের কোচ ছিলেন স্টুয়ার্ট ল। সেরা অল-রাউন্ডার সাকিব কে বসিয়ে মুশফিককে ক্যাপ্টেন করায় বিতর্কিত হন তিনি। ২০১৩ পর্যন্ত মেয়াদ থাকলেও “পারিবারিক কারন” দেখিয়ে এই অস্ট্রেলিয়ান দেশে ফিরে যান। এরপর আর ফিরে আসেন নি বাংলাদেশে।
• রিচার্ড পাইবাস (২০১২)-
ইংলিশ বংশোদ্ভুত দক্ষিণ আফ্রিকান পাইবাসের সাথে বিসিবির বিভিন্ন বিষয়ে বনিবনা না হওয়ায় চুক্তি সই না করেও কোচ হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশের সাথে। বিসিবির কিছু অনিয়ম নিয়ে কথা বলেছিলেন। তাই হঠাৎ করে চারমাস পর নিজ দেশে চলে যান।

• শেন জার্গেসন (২০১২-২০১৪)
স্টুয়ার্ট ল ও রিচার্ড পাইবাসের সহকারি হিসেবে কাজ করেছেন অনেক দিন। চাপা ক্ষোভ ও অভিমানে তিনিও বেশি দিন টিকে নি। বিসিবি তাকে রেখে দেয়ার কোন চেষ্টাই করে নি। কেন তার চলে যাওয়া তাও ভালো করে জানা যায় নি।

• চান্দ্রিকা হাথুরুসিংহে (২০১৪-????)-
বাংলাদেশ ক্রিকেটে কোচদের সাফল্যের দিক থেকে সব চাইতে এগিয়ে হাথুরু। শুরুটা ছিল বাজে কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে অন্য রকম বাংলাদেশের সাথে বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি। চুক্তিও নবায়ন করা হয় ২০১৯ পর্যন্ত। কিন্তু সম্প্রতি সাউথ আফ্রিকা সিরিজে সিনিয়রদের সাথে সমস্যা ও তার কিছু বিতর্কিত সিধান্ত তাকে দোষীর কাঠগড়ায় দাড় করায় মিডিয়া ও বাংলাদেশ ক্রিকেট সমর্থকেরা। সবচেয়ে প্রফেশনাল এই কোচ একপ্রকার অভিমান করে অব্যাহতি পত্র জামা দিয়ে নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। ধরেই নেয়া হচ্ছে হাথুরু অধ্যায় এইখানেই শেষ। অভিমান নাকি অন্য কারো চাপে এই প্রফেশনাল, আবেগহীন ব্যক্তির প্রস্থান তা এখনও অজানা!

এই ভাবে হঠাৎ করে ঘন ঘন কোচের চলে যাওয়া আমাদের অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আশা থাকবে একটাই কোচ হিসেবে যেই আসুক না কেন তাকে যেন বিসিবি দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখতে পারে। যা আমাদের ক্রিকেটের জন্য মঙ্গলবার্তা নিয়ে আসবে।

অমৃতবাজার/মাসুদ

Loading...