ঢাকা, সোমবার, ২৭ মার্চ ২০১৭ | ১৩ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ

নিরপরাধ ঘুম ও অরুণাভ সিনহা


সুমন রহমান

প্রকাশিত: ০৯:২২ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৬, রোববার | আপডেট: ০৯:৩১ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৬, রোববার
নিরপরাধ ঘুম ও অরুণাভ সিনহা

কমনওয়েলথ এর দরবারে গল্পটি বাংলাতেই পাঠিয়েছিলাম। চার/পাঁচ মাস পর ওখান থেকে জানানো হল, তারা আমার গল্পটিকে শর্টলিস্টে রেখেছেন। গল্পটি অনুবাদ করেছেন অরুণাভ সিনহা। অরুণাভ সিনহাকে চিনি না। তবে তারাই জানালেন, ইনি কমনওয়েলথের তালিকাভূক্ত অনুবাদক। ভারতীয়। আমি অনুবাদটুকু পড়তে চাইলাম।

পড়ে আমি তো থ`! নিরপরাধ ঘুম গল্পের শুরুতে জীবনানন্দ দাশের কবিতার একটা উদ্ধৃতি ছিল। সেখানে "মচকা ফুল" এর অনুবাদ করেছেন Heavenly flower! টোটাল গল্পটা যেখানে "ক্রসফায়ার" নিয়ে, সেখানে শুরুর কোটেশনে তিনি "ক্রসফায়ার"কে ঠাউরেছেন একটা "টেলিভিশন প্রোগ্রাম" হিসেবে! বাংলাদেশের একজন লেখকের গল্প অনুবাদ করছেন এক ভারতীয়, বাংলাদেশ সম্পর্কে জ্ঞানের এই বহর নিয়ে!

অচিরেই টের পেলাম কোটেশনের ঐ ভুলগুলো স্রেফ টিপ অব দ্য আইসবার্গ! মারাত্মক সব ভুলে-ভরা গল্পটির অনুবাদ। গল্পে আমি "বুলেট"-কে কলোকিয়ালি "বিচি" লিখেছিলাম, ইনি ইংরেজিতে লিখেছেন "বলস"‍! থানায় নেয়ার পর রাশেদ যখন জানতে চাইল তারে থানায় আনা হয়েছে কেন, অফিসার বললেন, "মুসলমানি" করাইতে। সেইটার ইংরেজি করা হয়েছে "টু বি মুসলিম"। অসংখ্য টাইপো আর গ্রামাটিক্যাল এররসের কথা বাদই দিলাম। একবার রিভাইজ করলেই এসব থেকে গল্পটিকে রক্ষা করা যেত। কিন্তু তা করবার দায় বোধ করেন নি অরুণাভ সিনহা।

অনুবাদ পড়বার পর আমি কমনওয়েলথের অনুরোধে ফিডব্যাক দিলাম। গল্পটি ততক্ষণে বিচারকদের পড়ার টেবিলে চলে গিয়েছে। তাই অরুণাভ বাবুকে বললাম যাতে একটু তাড়াতাড়ি তিনি ফিডব্যাক অ্যাড্রেস করেন। কিন্তু পাঁচ মিনিটের পরিশ্রমটুকু করবার জন্য তিনি সময় লাগালেন এক মাসেরও বেশি। এর মধ্যে আমার এবং কমনওয়েলথের সবগুলো মেইলের লুপে থাকার পরেও জবাব দেন নি। সেটা এমনকি কমনওয়েলথকে অবাক করেছে এমন মন্তব্য তারা মেইলে করেছেন। শেষে আমি যখন কমনওয়েলথ থেকে গল্প উঠিয়ে নেয়ার হুমকি দিলাম, তার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিডব্যাক পাওয়া গেল!

ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে। ফলে, আমার সংশোধিত গল্প বিচারকদের টেবিলে পৌঁছায় নাই, পরবর্তীতে জেনেছি। অবশ্য তা নিয়ে খুব আক্ষেপও নাই। আমার গল্পের পাঠকই আমার সবচে বড় পুরষ্কার। পুরষ্কার নিয়ে আমার কোনো দৌড়ঝাঁপ নাই। নিজের উদ্যোগে একবারই আমার সাহিত্যকে কোনো প্রতিযোগিতায় হাজির করেছি। সেটা এই কমনওয়েলথে। আর কোথাও নয়। দেশে বা বিদেশে।

আমার গল্প কমনওয়েলথ শর্টলিস্টে আসার পরও কিন্তু অরুণাভ সিনহারই জয়জয়কার। ভারতের সবগুলো কাগজে ছাপা হয়েছে, অরুণাভ সিনহা কমনওয়েলথ পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন বাংলাদেশের লেখক সুমন রহমানের গল্প অনুবাদ করার মাধ্যমে! ভারতীয় গণমাধ্যমে আমার মনোনয়ন "ভারতীয় কৃতিত্ব" হিসেবেই গণ্য হয়েছে। আবারো বলি, অরুণাভকে গল্প আমি নই কমনওয়েলথই পাঠিয়েছিল, সেটা তিনি অনুবাদ করেছেন সম্ভবত দাপ্তরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে। তবু এই যে উপরি পাওয়া মনোনয়ন, তাও এক ভুলে ভরা অনুবাদের কারণে, অরুণাভ সিনহা এরকম আর কয়টা তার ক্যারিয়ারে পেয়েছেন আমার জানা নেই।

কিন্তু আমি অবাক হই অরুণাভ সিনহার প্রফেশনালিজম দেখে। অনেকেই বলেন ইনি ভাল অনুবাদক, পেঙ্গুইন থেকে বেশ কয়েকটি অনুবাদের বই বেরিয়েছে তার, ইত্যাদি। একই হাতে তিনি শংকর ও সমরেশ বসু অনুবাদ করতে পারেন, আবার সম্ভবত বাংলাদেশের জাফর ইকবালের লেখাও অনুবাদ করেছেন। ফলে, অরুণাভ সিনহাকে আমি বাজারি অনুবাদক হিসেবেই সাব্যস্ত করছি,। কিন্তু তার পেশাদারিত্ব ও যোগাযোগ পদ্ধতি অন্যের জন্য সম্মানজনক না, এবং ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষতিকর। তার সাথে যারা ভবিষ্যতে কাজ করবেন, তারা এটি খেয়াল রাখবেন।

সুমন রহমানের ফেসবুক থেকে নেওয়া।