ঢাকা, রোববার, ২৯ মার্চ ২০২০ | ১৫ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

এ পুলিশ অফিসার বাই চয়েজ অ্যান্ড নট বাই চান্স


মোঃ মনিরুজ্জামান, এডিশনাল ডিআইজি

প্রকাশিত: ১২:৫৫ পিএম, ২৫ জানুয়ারি ২০২০, শনিবার
এ পুলিশ অফিসার বাই চয়েজ অ্যান্ড নট বাই চান্স মোঃ মনিরুজ্জামান, এডিশনাল ডিআইজি

তারিখটা ঠিক মনে নেই। সম্ভবত ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাস। সেদিন ছিল ১৮তম বিসিএস এর ফরম ফিলাপের শেষ দিন। ড্রপের শেষ সময় দুপুর ১২টা, পিএসসির নীচ তলার বড় বাক্সে। সদ্য হাতে পাওয়া এ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট হাতে নীচে আমরা তিন বন্ধু প্রাণপনে দৌড়াচ্ছি পিএসসির দিকে। উদ্দেশ্যে ১৮ তম বিসিএস এর ফরম জমা দেওয়া। কাকতলীয়ভাবে ঐ দিন সকালেই আমাদের ডিপার্টমেন্টের ভাইভা শেষ হল অর্থ্যাৎ আমরা এ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট পাওয়ার যোগ্য হলাম।

সকাল ১০ টায় পরীক্ষা শুরু, ১১ টায় শেষ। আমার ভাইভা শেষ হয়েছিল সাড়ে দশটার কিছু আগে। এ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট আগেই ডিপার্টমেন্টের মামাদেরকে ম্যানেজ করে টাইপ শেষ করিয়ে রেখেছিলাম। ভাইভা শেষে যখন টাইপ করা সার্টিফিকেট চেয়ারম্যান ম্যাডামকে সই করাতে নিলাম উনি বিস্মিত হলেন বললেন আমলাই যদি হবা তাহলে এত কষ্ট করে এ্যাপ্লাইড ফিজিক্স পড়ার দরকার কি ছিল? ইতিহাস টিতিহাস একটা কিছু পড়লেই তো হোতো(ইতিহাস বা অন্যকোন বিষয় কে আমি ছোট করে দেখিনা,আমি ইতিহাস পড়তে আনন্দ পাই)। মনটা খারপ হয়ে গেল। যাকগে মধ্যবিত্তের বেশীক্ষন মন খারাপ থাকতে নেই!!

তিন তরুন একটি বেবি ট্যাক্সিতে করে দৌড়ালাম। গন্তব্য পিএসসি। বিজয় স্মরনীতে পৌছেই দেখি রাজ্যের জ্যাম, নামলাম, ঘড়িতে তখন ১১:৫০ মিনিট। নেমে ঝাড়া এক দৌড়ে পৌছে গেলাম পিএসসি। ঘড়ির কাঁটা তখন ১২টা ছুঁইছুঁই। পিএসসির স্টাফরা তখন ফরমের বাক্স বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বোধকরি আমরা তিনজনই শেষ ড্রপার।

যাহোক শুরু হল নতুন এক অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে বিসিএসের আলোচনা চরমে। গত ব্যাচে বড় ভাইরা কে কে জব পেল, কোন ক্যাডার পেল এসব আলোচনা সর্বত্রই। আমরাও নাম লেখালাম সেই যুদ্ধে, শুরু হল অনিশ্চিত এক পথচলা। নীলক্ষেতের ফুটপাতে ঘুরি জ্ঞানের জন্য মরিয়া হয়ে। কতকিছু জানতে হয় কবে কে কি আবিস্কার করেছে, কে কি রচনা করেছে, কে কবে জন্মেছে, কে কবে মরে গেছে, কে কি করেছে, কে কি ছদ্মনামে লিখতো, কোথায় বসে in, কোথায় at, আর কোথায় into, ফিলিস্তিনের সমস্যা, আফগান ওয়ার, সাসটেইন্যাবল ডেভেলপমেন্ট, প্রিন্সেস ডায়ানা থেকে শুরু করে সমুদ্রতলের ছোট মাছ টি কি করে কি খায় হাবিজাবি কত কিছুই জানতে হয়েছে। আটলান্টিক থেকে আমাবস্যা,পূর্নিমা থেকে পথের পাঁচালি,নিউটন বা স্টিফেন হকিন্সের তত্বের পাশাপাশি বায়োডাইভার্সিটি, কত কিছুই না শিখতে হয়েছে। সব সময় মনে হোতো কত অজানারে! বেশী কষ্ট হলে সাতকাহন পড়তাম,ছেলে হয়েও ভাবতাম আমিই দীপাবলী।

যাহোক পার হলাম প্রিলিমিনারী। লাখখানেক পরীক্ষার্থীর মধ্য থেকে বাদ গেল ৭০/৮০ হাজার। ভাবতাম আমিও থাকতে পারতাম ওদের দলে। টিক মার্কের পরীক্ষা, একটু এদিক সেদিক হলেই সর্বনাশ। রিটেনের ডেট হল। দিনের বেলা ডিপার্টমেন্টে ক্লাস করি, বিকালে পাবলিক লাইব্রেরী যাই, নীলক্ষেতে ঘুরি, অল্পদামে পুরানো সব বই কিনি, রিক্সা ভাড়া বাঁচিয়ে চা, পুরি, জিলাপি খাই। সাথে থাকেন তিনি, বাঁচার সঙ্গী,হাঁটার সংগী, হাঁসির সঙ্গী, ঝগড়ার ও সংগী,চা-সিঙ্গাড়ার সঙ্গী। পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে প্রয়োজনীয় বইগুলো খুঁজে দেয়, প্রয়োজনে নোট নেয়, মাঝে মাঝে সামনের সিড়িঁতে বসে বাউলদের গান শোনে। সন্ধ্যা নামলেই পাবলিক লাইব্রেরী চত্বরটাকে ভুতূড়ে লাগত। গার্ডেন লাইট একটা জ্বলতো তো দুইটার বালব কাটা থাকতো ।

সেই অদ্ভূত আলো আধারিতে ২২/২৩ বছরের দুই তরুন/তরুনী মানুষের চোখ এড়িয়ে হাতেহাত ধরে ক্লান্তি নিয়ে বসে থাকতাম। একটু-আধটু সিগারেটও তখন খাওয়া শুরু করেছি। মাঝে মাঝে গোল্ডলিফ বা ক্যাপষ্ট্যানে সুখ টান, ফ্লাক্সের চা, চিড়ের মোয়া, আমড়া বা চিনে বাদাম নিয়ে পাশাপাশি বসে থাকা, আশা নিরাশায় দোলা, আব্বা-মা, পরিবার স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভঙ্গের দোলাচাল, বাংলদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী, সাইকোলজি, এপ্লাইড ফিজিক্স, ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞান, ফজলুল হক হল বা মৈত্রী হল, ক্যাম্পাস, টিএসসি, পাবলিক লাইব্রেরী বা সায়েন্স লাইব্রেরীর বারান্দা, মৈত্রী হলের মাঠের সবুজ ঘাস সব মিলেমিশে একাকারহয়ে যেত।

পুলিশ চয়েজ দিয়েছিলাম, একটু লম্বা চওড়াও ছিলাম বলে বন্ধুরা অনেকেই খ্যাপানো শুরু করে দিয়েছিল ‘‘ছাউ এসপি বলে’’। খুব যে খারাপ লাগতো তা বলব না। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের প্রথম প্রহরে পাবলিক লাইব্রেরী হতে বেরুতাম, হাতে বই খাতা আর পাশে তিনি। প্রতিদিন রিক্সা নিতে পারতাম না। হাঁটতাম। চারুকলা, কেন্দ্রীয় মসজিদ, মধুর ক্যান্টিন, কলাভবন, ভিসির বাড়ী, জহুরুল হক হল, নীলক্ষেত নিউমার্কেট হয়ে আবারো মৈত্রী হল। যাওয়ার পথে একফালি কুমড়া,আলু, পেয়াজ, ডিম, চাল, ডাল, তেলনুন কেনা। তাকে তো হলে গিয়েই রান্না করে খেতে হবে!!

সূর্যাস্ত আইন বদলানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের সংগ্রামকে আমি স্যালুট করি। আমার বড্ড কাজে লেগেছিল। রাত ৯টা পর্যন্ত বাইরে থাকা যেত। কোন মতে নটায় তাকে হলে ঢুকিয়ে দিয়ে দৌড়াতাম আমার হলের দিকে, দুজন তো দুপ্রান্তের বাসিন্দা। একজন ফজলুল হক হল আরেকজন মৈত্রী হল। রাত ১০ টায় হলের ডাইনিং বন্ধ হয়। খাবার না পেলে বিরাট লস। পায়ে হেটে , টেম্পুতে বাসে ঝুলে তড়িঘড়ি হলে ফেরা। সোজা ডাইনিং সারা দিনের খাটুনি শেষে পাতলা ডালের যে স্বাদ পেতাম সত্যি করেই বলছি ফাইভষ্টার হোটেলের সেরা কুকের স্যুপেও সে স্বাদ এখন আর পাইনা। রাতের খাবার শেষে রুমে ফেরা।

আমার রুমমেট জসিম বড্ড অল্পভাষী, মিষ্টি চেহারার শান্ত ছেলেটি, বড় ভালবাসতো আমাকে। আমার এক বছরের জুনিয়র ছিল।রুমে ঢোকার সাথে সাথেই চওড়া একটা হাসি দিত। ও খুব গোছানো ছিল। নিজের বিছানার পাশাপাশি আমার বিছানাও গুছিয়ে রাখতো। টুকটাক গল্প, একটু আকটু বিশ্রামের পর শুরু হত এরুম ওরুমে ‘‘ঢু’’ মারা। বন্ধুদের কাছ থেকে ডিপার্টমেন্টের হালচাল, ইনকোর্স বা প্রাকটিক্যাল পরীক্ষার চোথাপত্র যোগাড় এসবতো ছিলই।

বিসিএসের প্রস্তুতির জন্য আমি প্রায়ই দুপুরের পর আর ক্লাস করতাম না। ফাঁকি দিতাম। মোক্তার, হেলাল, সাজ্জাদ, লুৎফর ভাই এই সব বন্ধুদের কাছে আমার ঋণ কোন দিন শোধ হবে না। কতভাবে যে এরা আমাকে সাহায্য করেছে বলে শেষ করা যাবেনা। পড়া বুঝিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে ক্লাসে প্রক্সি সই দেয়া, টার্ম পেপার তৈরী করে দেওয়া আরো কত কি? বড় মনে পড়ে তাদের এসব অবদানের কথা। ওরা না থাকলে আমি মনে হয় মাষ্টার্স পাশ করতে পারতামনা!!

রাত সাড়ে এগোরাটা/বারোটার দিকে ক্লাসের পড়া পড়তে বসতাম। রাজ্যের ক্লান্তিতে চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসতো। ডিপার্টমেন্টে ইনকোর্স পরীক্ষা তো লেগেই থাকতো। অনিচ্ছাতেও মডার্ন ফিজিক্স বা থার্মোডিনামিক্সের জটিল সব তত্ব গিলতে বসতে হোতো সেই ক্লান্ত মধ্য রাত্রিতে। ঘুম পেলে লুৎফর ভাইকে ডাকতাম, নীচতলার আম গাছের ছায়ায় সিড়িতে বসে সিগারেট ফুঁকতাম। লুৎফর ভাইয়ের গানের গলা ছিল চমৎকার। ভিতরে প্রেম ছিল, ব্যাথা ছিল। সুর, ব্যথা গান হয়ে বেরুতো। আমি ছিলাম তার মুগ্ধ শ্রোতা। ক্ষুধা লাগলে আবার চাঙ্খার পুল, মিতালী হোটেলে ডিম, পরোটা।

তারপর আবার ভোর। যত রাতেই ঘুমাই, ফজরের নামাজ সাধারনত মিস করতাম না। ঘুম চোখে ফজর নামাজ, আবার ঘুম, তন্দ্রা, জেগে ওঠা, হেলানের তাড়া, আটটায় ক্লাস। কোন রকমে ব্রাশ করেই দৌড় ক্লাসে বসে ঝিমুনি, মিলনের ক্যান্টিন, কার্জন হলের সবুজ চত্বর। দুপুর গড়ানো এলোমেলো বাতাশ। বেশ তো ছিল জীবন!!

যা হোক বিসিএসের রিটেন শুরু হয়ে গেল। একে একে পরীক্ষা দিতে থাকলাম, একেকটা সিঁড়ি ভাঙ্গতে শুরু করলাম। ভালই হচ্ছিল পরীক্ষাগুলো। কনফিডেন্স বাড়তে থাকল। আবারো পড়লাম সমস্যায়। মাষ্টার্স পরীক্ষা আর বিসিএস এর রিটেন পরীক্ষা একসাথেই চলতে থাকলো। চাপ ছিল প্রচন্ড, কিন্তু দিয়ে যাচ্ছিলাম। ঝামেলা বাধল হরতালের কারনে বদলী ডেটে মাষ্টার্সের একটা পরীক্ষা আর বিসিএস এর রিটেন পরীক্ষার কোন একটি সাবজেক্ট একই দিনে প্রায়ই একই সময়ে পড়ল। ৯টা থেকে ১১ টা মাস্টার্স পরীক্ষা, ভেন্যু কার্জন হল, অইদিকে ১০ টা থেকে বিসিএস পরীক্ষা, ভেন্যু সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, তেজগাঁও।

বিরাট দোটানায় পড়ে গেলাম। কি করব, কিভাবে করব তীরে এসে কি তরী ডুববে? বুঝতে পারছিলাম না। ওর সাথে পরামর্শ করলাম, সাহস দিল। দুঘন্টার পরীক্ষা একঘন্টা দশ মিনিটে দিব সিদ্ধান্ত নিলাম, একটা মটরসাইকেল ঠিক করলাম। ২০ মিনিটে পৌছালাম বিজ্ঞান কলেজে। কর্তৃপক্ষের হাতেপায়ে ধরে কেন্দ্রে ঢোকার অনুমতি পেলাম। ঝড়ের গতিতে লেখা শুরু করলাম। তিন ঘন্টার পরীক্ষা আড়াই ঘন্টায় দিলাম। পরীক্ষা ভাল হল। পরীক্ষা দিয়ে বেরুলাম। ওতো গেটে দাড়িয়ে আছে উদ্বিগ্ন মুখে। আমার চওড়া হাসি দেখে তার মুখের মেঘও সরে গেল। কনফিডেন্স বাড়তে থাকল। আরো কত চড়াই উতরাই পেরিয়ে শেষ করলাম বিসিএসের রিটেন পরীক্ষা। আশাবাদী হতে থাকলাম। চাকরি একটা হবে, চাকরিটা বড় দরকার।

সে তার বাবার বড় মেয়ে। আমার যদিও এক বছরের জুনিয়র কিন্তু একাডেমিক্যালি সমাজ কল্যাণ অনুষদ এগিয়ে ছিল। সেজন্য প্রায় একই সময়েই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সমাপ্ত হয়েছিল। ৯৭/৯৮ শেষ হল।

৯৮তে ও পরীক্ষা দিল ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট। ওরও চাকরি হয়ে গেল সোনালী ব্যাংকে। আমি তখনো বেকার। স্বপ্ন নিয়ে ঘুরিফিরি আর দুঃস্বপ্ন দেখি আসন্ন বেকার জীবনের। বাড়ীর বড় মেয়ে, মেয়ের লেখাপড়া শেষ, চাকরিও পেয়ে গেছে, তাকে তো আর বসিয়ে রাখবেনা।

আমার মাষ্টার্স পরীক্ষা, বিসিএস পরীক্ষা শেষ হল।এবার অপেক্ষা রেজাল্টের।অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দিনটি সম্ভবত ৩০ শে জুন ১৯৯৮। সারাদিন আমি ছিলাম জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট বোনের ভর্তি পরীক্ষার জন্য। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলাম। তখন আমরা তিন বন্ধু থাকতাম আজিমপুর পুরানো পল্টন লেনের একটা ভাড়া বাসায়। পাশের রুমে দুই সিনিয়র ভাই থাকতেন, বিসিএস পরীক্ষা দেন আর টিউশনি করেন। জিজ্ঞেস করলেন খবর কি? আমি জানতাম না যে বিসিএসের রেজাল্ট হয়েছে ঐ দিন। উনাকে বললাম জানিনা। উনি বললেন ঢং করিস? মন খারাপের কিছু নেই। তুই তো মাত্র একবার দিয়েছিস। আমার এই নিয়ে তৃতীয়বার। পরীক্ষা দে, তোর লেখার হাত ভাল, তোর হয়ে যাবে। আমার মাথা তখন শূন্য। এক দৌড়ে পাশের পত্রিকার দোকান। জনকন্ঠ পত্রিকা উল্টানো শুরু করলাম। পেয়ে গেলাম নিজের রোল নম্বরটি। সেই মূহুর্তটা আজো আমার চোখে ভাসে। তখন সন্ধ্যা গড়িয়েছে।

তখন তো আর এমন মোবাইল ফোনের যুগ না। এমন একটি খবর শেয়ার করার কেউ নেই। কোন সুযোগও নেই। ছুটলাম তার কাছে। আব্বা-মার পাশাপাশি তার কথাই মনে হয়েছিল। তখন রাত প্রায় আটটা। পরিচিত এক মেয়েকে পেলাম হলের গেট দিয়ে ঢুকছে। খবর পাঠালাম। তিনি আসলেন। সূর্যাস্ত আইনের সুবাদে আধা ঘন্টামত বাইরে থাকার সুযোগ ছিল। নীলক্ষেতে গিয়ে ফোনের দোকান থেকে ফোন করলাম বাড়ীতে। জানি আব্বা মা খবর পাবেন না। রাতের গাড়ীতেই বাড়ী।

গাড়ী থেকে নামতেই ভোর হয়ে সকাল। সূর্য্যটাও বোধ হয় সেদিন ছিল বড্ড জ্বলজ্বলে। তড়িঘড়ি করে বাড়ীর দিকে ছোটা। পথের মধ্যেই দেখা আব্বার সাথে। শেষের দিকে আব্বার খুব বুকের ব্যাথা হোতো। একটু হাটতেন তো একটু দাঁড়াতেন। দেখা হতেই আব্বা বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকালেন। বুঝলাম চাচার বাসায় করা টেলিফোনের খবর আব্বার কাছে পৌছাইনি। বললেন বিসিএসের রেজাল্ট হয়েছে, কালকের পত্রিকায় দেখেছি। বহুবার আব্বা রোল নম্বর চেয়েছেন কখনো দিইনি। আমার বিসিএস এর রোল নম্বর আমার কাছে প্রথম প্রেমপত্রের মতই সুগন্ধী হয়ে একান্ত নিজের কাছেই ছিল। ভাবতাম রেজাল্ট যদি ভাল হয় তো নিজেই বাবা মাকে জানাবো, অন্য কোনভাবেই তারা যেন আমার রেজাল্টটি জানতে না পারেন।

রাব্বুল আলামিন আমার সে আশা পূরন করেছেন। চাকরিটা পাওয়া আমার জন্য অবশ্যই অনেক বড় একটা ব্যাপার ছিল, কিন্তু তার থেকে কোন অংশেই কম ছিলনা আব্বা মাকে নিজের মুখে সে খবর দেয়া। এসব টুকরো কিছু সুখ স্মৃতি আছে বলেই জীবনটা এত সুন্দর। আব্বাকে রাস্তায় দাড়িয়েই কদমবুছি করলাম। আব্বা যা বোঝার বুঝলেন, ফিরতি পথে বাড়ীর দিকে চললেন আমাকে নিয়ে। ততক্ষনে রাস্তায় ২০/৫০ জনের জটলা হয়ে গেছে, গ্রামের লোক বিসিএস, এএসপি এসব বোঝেনা। গ্রামে রটে গেল মাষ্টার সাহেবের ছেলে এসপি হয়েছে। সুখের বন্যায় ভাসতে লাগল গ্রামবাসী।

আমার গ্রাম আমার স্বর্গ। গ্রামের সাথে আমার সম্পর্ক নিবিড়। আব্বা-মা মারা গেছেন বেশ ‘ক’ বছর হল। সেই অর্থে ভাই বোনেরাও কেউ গ্রামে থাকেনা। কিন্তু গ্রামের দু’পাঁচজন লোকের সাথে কথা হয়না এমন দিন আমার জীবনের কালেভদ্রেও আসে না। যে কদিন বাঁচি এমনটি যেন কখনোই না হয়।

গ্রামের লোকজন খুব ভালবাসত এই হ্যাংলা পাতলা কালো ছেলেটিকে, বোধ হয় আজো বাসে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমার আব্বার টিনের ঘরের সামনে সারা গ্রাম, স্কুলের টিচার, গ্রামের বাচ্চারা, আমার শৈশবের শিক্ষকেরা,নারী পুরুষ আবালবৃদ্ধবনিতা।এত মানুষকে আপ্যায়ন করতে হবে, এত বড় সংবাদে আসা মানুষকেতো আর খালিমুখে ফেরানো যায়না!!

মাসের শেষ, আব্বার তখনো বেতন হয়নি, পকেট তো গড়ের মাঠ। আব্বা মা কিংকর্তব্য বিমূঢ়। অবশেষে মা এর জমানো থলের ধন, যক্ষের ধন, তোশকের তলা, এ ড্রয়ার, ও ড্রয়ার, এমনকি ভাইবোনদের মাটির বাক্স ভেঙ্গে জমা হল কম বেশী আড়াই হাজার টাকা। এক মন চমচম কেনা হল। তাও ফুরালো নিমিষেই। এখনো মনে হয় এই তো সেদিন। এভাবে কাটল দু-তিন দিন। রাতে খেতে বসে আব্বা মাছের মাথাটা আমাকে উপরি দিলেন, হাসি মুখে খুব অল্প ভাষায় সোজা বাংলায় বাংলার এই শিক্ষক যে ব্রিফিংটা আমাকে দিলেন সেটাই আমার জীবনের এখনো পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ মোটিভেশন। যার সারকথা হল আমি মাষ্টার মানুষ, আমার আব্বাও (আমার দাদা) ছিলেন শিক্ষক। পুলিশে চৌদ্দ গুষ্টিতে কেউ নেই। পুলিশ নিয়ে মানুষ ভাল কিছু কমই বলে। আমি সারাজীবন তোমাদেরকে শিখিয়েছি মানুষ হতে, মানুষের কাজে লাগতে, বললেন তোর মেধা আছে, লক্ষ্য স্থির আছে, তোর উপর আল্লার রহমত আছে।

একটি গল্পও বললেন আমার জন্মের পরদিনই আমাদের এলাকার জনৈক বুজর্গ পীর সাহেব যিনি আমার দাদার অগ্রজ ছিলেন, আচমকা এসেছিলেন আমাদের বাড়ীতে। দেখতে চেয়েছিলেন আমাকে। বলেছিলেন অনেক কথা, যার সারকথা হচ্ছে এছেলে একদিন কিছু একটা হবে। আব্বা পীর ফকিরে খুব একটা বিশ্বাস করতেন এমন দেখিনি তবে মাঝে-মাঝেই গল্পটি বলতেন, শুনতাম, ভাল লাগত, বিশ্বাস করতেন একদিন আমি কিছু একটা হবো।

আব্বা বলেছিলেন সম্ভাবনার যেন মৃত্যু না হয়, বলেছিলেন তার মৃত্যুর পরেও যেন মানুষ আমার পিতা হিসাবে কোন দিন তাকে অসম্মান করতে না পারে। আব্বা প্রায়ই বলতেন আমার ছেলে মেয়েরা যদি জীবনে প্রতিষ্ঠিত না হতে পারে তো অত কষ্ট পাবনা, কিন্তু খুব বেশী কষ্ট পাব, আমার আত্মাও কষ্ট পাবে যদি আমার মৃত্যুর পর মানুষে বলে মাষ্টার সাহেবের ছেলে মেয়েরা মানুষ হয়নি। আব্বা আজ নেই। মানুষ হওয়া সহজ নয়। আমি জানিনা মানুষ হতে পেরেছি কিনা।তবে নির্দিধায় একুশ বছর পর অন্তত এটুকু বলতে পারি এই অভাগা দেশ আর মানুষের জন্য কিছু না কিছু করিবার চেষ্টা অন্তত করিয়াছি।

যতটুকু সময় পেতাম আব্বার পাশাপাশিই থাকতে চেষ্টা করতাম। আব্বা শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্যবসা করতেন। রাইস মিল ছিল, সারের দোকান ছিল, আড়ত ছিল। ভার্সিটি লাইফের ছুটিতে বাড়ীতে গিয়েও বন্ধুদের আড্ডা বাদ দিয়ে আব্বার আড়তে গিয়ে বসতাম। সারের গন্ধ, ডিজেলের ঘ্রান, চাউলের গন্ধ আর বাপ-বেটার টুকটাক গল্প একাকার হয়ে যেত। রাত জেগে উপন্যাস পড়তাম, কাক ভোরেই আবার আব্বার সাথে গিয়ে দোকান খুলতাম, ভাল লাগত।

দুদিন পরেই ঢাকা ফিরলাম। তিনি তো পথ চেয়ে বসে আছেন। তিনিও তখন হল ছাড়া। চাকুরীতে জয়েন করেছেন। আত্মীয় পরিজনহীন এই শহরে আশ্রয় নিয়েছেন নীলক্ষেত কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলে। সেখানকার নিয়মনীতি বড্ড কড়া। ঢাকায় আসি। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিই। সকাল হলেই গিয়ে দাড়িয়ে থাকি কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলের বা রাজারবাগের সোনালী ব্যাংক অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমীর সামনে। একসাথে চা খাই, নাস্তা করি। তিনি চলে যান প্রশিক্ষনে আমি তখন এ অফিস সে অফিসে ভাই বেরাদারদের সাথে আড্ডা দিই। বিকাল হতেই বেরিয়ে পড়ি যে দিকে দুচোখ যায়, মূলত প্রিয় ক্যাম্পাসের এখান-সেখানে। দিন পার হতে থাকে এভাবে।

এর মাঝেই পাই জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত।৯৮ এর সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে আব্বা মারা যান। ২২ সেপ্টেম্বর ছিল আমার মেডিকেল টেষ্ট। ভগ্নমনে ঢাকায় আসি, মেডিকেল টেষ্ট দিই। বাড়ী ফিরে যাই। আব্বার কবরের পাশে ফাতিহা পড়ি, চোখের পানিতে বুক ভাসাই। জীবন চলতে থাকে জীবনের নিয়মে।

সময় গড়াতে থাকে। ঢাকায় ফিরে আসি। এক সসময় স্বপ্নরা ডানা মেলতে শুরু করে। ২৫ জানুয়ারি প্রিয় ক্যাস্পাস থেকেই যাই সচিবালয়ে। জনপ্রশাসনের প্রজ্ঞাপন দেখিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি পাই। পুলিশ ক্যাডার দেখে সচিবালয়ের গেটের কনষ্টেবলের কাছে থেকে জীবনের প্রথম স্যালুটটিও পাই। সালামের উত্তর দিই। অল্প বয়স্ক ছেলেটি দারুন স্মার্ট ছিল। সেই আমাকে শিখিয়ে দেয় কিভাবে স্যালুট নিতে হয়। সচিবালয়ে ঢুকি। গভীর সব মুখ দেখি। একটা কনফারেন্স রুমে আমাদেরকে বসানো হয়।আমাদের ক্যাডারের রেজা ভাই আমাদের হলেরই বড় ভাই। রেজা ভাইকে দেখে আত্মায় পানি আসে। আমার পাশেই বসে মাহবুব ভাই। রাশভারি লোক। গোলগাল কর্পোরেট চেহারা। পুরু গোফও আছে। তাকে দেখে আরো ভয় পেয়ে যাই। স্যুটেট বুটেট স্মার্ট তরুন তরুনীদের পাশে আমি নিতান্তই বেমানান অনার্য্য। এক সময় ফরম ফিলআপ করি, নাম লেখাই জনপ্রশাসনের খেরোখাতায়। রাত পেরুলেই ২৫ জানুয়ারি,১৮ ব্যাচের জন্মদিন। দেখতে দেখতে কেটে গেল ২১টি বছর। মনে হয় এই তো সেদিন। চোখ বন্ধ করলে আমি এখনো সেই হ্যাংলা পাতলা কালো ছেলেটিকে দেখি, তার অনুভূতি গুলোতে সাঁতার কাটি, তার স্মৃতিগুলো নিয়ে উল্টাই, পাল্টাই, সাজাই আবার এলোমেলো করি। এই ই আমি, আর এই ই আমার কাহিনী।
আঠারতম বিসিএসের ২১বছর পূর্তিতে সকল বন্ধুদেরকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। কৃতজ্ঞতা ও শুভাষীস জানাই তাদের সকলকে যাদের কারনে এ পথ চলা মসৃণ ও আনন্দময় হয়েছে।ক্ষমা চাই সকল ব্যর্থতা ও অসম্পূর্ণতার জন্য।এই পরিণত বয়সে এসে কিছুটা হলেও বুঝি ক্ষমা চাওয়া ছাড়া কোন সম্পর্কই দীর্ঘস্হায়ী হয়না।বড্ড কৃতজ্ঞ বোধ করি মহামহিমের কাছে।


গুনগুন করে গাই


"আমি অকৃতি অধম
বলেও তো মোরে কমকরে কিছু দাওনি
যা দিয়েছো তারি অযোগ্য ভাবিয়া
কেঁড়েওতো কিছু নাওনি"