ঢাকা, রোববার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পেঁয়াজ কাণ্ড


মো. রফিকুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০১:৪৪ পিএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২০, বুধবার
পেঁয়াজ কাণ্ড

 

পেঁয়াজ একটা অতি প্রয়োজনীয় সবজি যা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র পাওয়া যায়। তবে আমাদের দেশে সবজির পাশাপাশি মসলা হিসেবেই এর সমাদর বেশি। পেঁয়াজ ছাড়া বাঙালি তরকারি রান্নার কথা চিন্তা করতে পারে না। তবে সালাদ হিসেবেও পেঁয়াজের আলাদা একটা কদর আছে। এসবের জন্য পেঁয়াজ খায় না এমন বাঙালি ভু-ভারতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ও, একটু বোধহয় ভুল হলো। বাঙালি ব্রাহ্মণদের মধ্যে পেঁয়াজ খাওয়াকে অবশ্য প্রীতির চোখে দেখা হয় না। তাই তো ব্রাহ্মণ ঠাকুর মেয়ের বিয়ের জন্য বর খুঁজতে গিয়ে পেঁয়াজ খাওয়ার কথা শুনে আৎকে উঠেন।

বুঝতে পারছেন না তো? পুরোটা শুনুন তাহলে সব পরিষ্কার হবে। এক ব্রাহ্মণ তাঁর মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন ঘটকের কাছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছেলের কোনো বদভ্যাস নেই তো?’

ঘটক বলল, ‘না, ছেলে ভালো। তবে ওই মাঝেমধ্যে একটু পেঁয়াজ টেয়াজ খায় আরকি!’
‘এ্যাঁ, বলো কী!’

‘না, পেঁয়াজ তো আর সব দিন খায় না। যেদিন একটু আধটু গরুর মাংস খায়, সেদিন আর কি।’
শুনে তো বাহ্মণের মাথায় হাত।

ঘটক তাঁকে আশ্বস্ত করতে বলল, ‘গরুর মাংস তো আর যখন-তখন খায় না, ওই যেদিন একটু মদ-টদ খায়, সেদিনই একটু।’ অতএব বুঝাই যাচ্ছে পেঁয়াজ মদ-মাংসের কতটা প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ।

পেঁয়াজ নামের এ সবজিটি উদ্ভিদতাত্ত্বিকভাবে বাল্ব নামের পরিবর্তিত কান্ড। আমরা যে অংশটি খাই সেটাও আসলে পরিবর্তিত পাতা। কিন্তু এই পাতারই কি অমিত তেজ। এটা সর্বদা সবাইকে কাঁদায়। আপনি এটা কাটলে কাঁদবেন অথবা অন্য কেউ কাটলেও আপনি কাঁদতে পারেন। কিংবা কখনও কখনও কেউ না কাটলেও আপনি কাঁদতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে কাঁদার কারন একটু ভিন্নতর। কি সে কারন? না, এটা জটিল বা গোপনীয় কোন বিষয় নয়। বিশ ত্রিশ টাকা কেজি পেঁয়াজের দাম যদি তিনশ টাকা হয়ে যায় তখন না কেঁদে কারও উপায় থাকে বলুন? এরপরও যদি কেউ না কাঁদেন তাহলে আরও কিছু ঘটনার কথা বলি তখন আপনি ঠিক করবেন না কেঁদে কারও উপায় থাকে কিনা? পেঁয়াজের দাম বাড়ায় বিক্রেতাদের হেলমেট মাথায় পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়। নাহলে জনতা পেঁয়াজ না পেয়ে কখন আবার মাথা ফাটায় সে ভয়ে। রাতের বেলা পেঁয়াজ রক্ষায় লাঠি সোটা নিয়ে কৃষককে ক্ষেত পাহারা দিতে হয় চুরি ঠেকাতে। শুধু কি তাই? পেঁয়াজ নিয়ে তো আর লঙ্কা (মরিচ) কাণ্ড হওয়া সম্ভব নয় তাই দাম বাড়লে কত যে পেঁয়াজ কাণ্ড ঘটে তার আরও কিছু নমুনা দেই। নতুন বউ বাড়িতে এনে শাশুড়ি বলছেন, ‘বউমা, দুইটার বেশি তিনটা নয়, একটা হলে ভালো হয়।’

বউমা তো লজ্জায় লাল। কিন্তু সে এ যুগের মেয়ে। তাই শাশুড়িকে বলেই বসলো, ‘মা, আপনার তো সাত সাতটি ছেলেমেয়ে, আমার ব্যাপারে এত কঠোর কেন?’

শাশুড়ি বললেন, ‘আরে মা, আমি বাচ্চাকাচ্চার কথা বলছি না, বলছি তো তরকারিতে পেঁয়াজ দেওয়ার কথা।’

কত বলবো? পেঁয়াজের দাম বাড়ায় আজকাল নাকি কেউ বিদেশ গেলে মা-বাবা বা আত্মীয় স্বজনের জন্য গিফট হিসেবে অন্য কিছু না পেঁয়াজ নিয়ে আসছে। এইতো এক ব্যাংক কর্মকর্তা বাবা মার আবদার মেটাতে চীন থেকে ১১ কেজি পেঁয়াজ নিয়ে দেশে ফিরেছেন। আবার দেখলাম বন্ধুর বিয়েতে কয়েক বন্ধু মিলে পেঁয়াজ গিফট করেছে। দাম বাড়লে জামাই বাবাজিরাও শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে মিষ্টি কিংবা ফলমূল নয় পেঁয়াজ নিয়ে হাজির হচ্ছে আজকাল। হাওয়া থেকে পাওয়া একটা গোপন খবর বলে দেই। কিছুদিন আগে আমাদের দেশে বিশেষ অভিযানে ক্যাসিনোগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও কিছু কিছু নামীদামী ক্লাবে নাকি এখনও গোপনে জুয়া খেলা চলছে। কি দিয়ে খেলা হয় জানেন? টাকা পয়সা নয়, পেঁয়াজ দিয়ে। তবে কেউ এর সত্যাসত্য যাচাইয়ের জন্য সত্যি সত্যি পেঁয়াজ নিয়ে কোন ক্লাবে গিয়ে হাজির হবেন না আশা করি।

পেঁয়াজের একটাই সমস্যা কাঁচা খেলে মুখে দুর্গন্ধ ছড়ায়। কিন্তু সেটাও পেঁয়াজের দাম বাড়লে কখনও কখনও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

একটা ঘটনা বলি বিচারের ভার আপনার। এক মেয়ে তার নতুন ছেলে বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেছে। দেখা করে এসে বন্ধুদের সাথে গল্প করছিলো। এক বান্ধবী তাকে জিজ্ঞেস করলো, কেমন বুঝলি? উত্তরে সে বললো, খুব ভালো। বেশ পয়সাওয়ালা মনে হলো। কি করে বুঝলি? কথা বলার সময় ওর মুখ থেকে পেঁয়াজের গন্ধ পেলাম, মেয়েটি উত্তরে বললো।

সকল খারাপ ঘটনারই একটা ভালো দিক থাকে। তাই পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি হলে বিক্রেতার অর্থাগাম ছাড়াও কারও কারও জন্য কিন্তু তা শুভ ফল বয়ে আনতে পারে। যেমন যেসব ছেলেরা নানা কারণে বিয়ে করে উঠতে পারেনি পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি তাদের বিয়ের জন্য একটা বিরাট মওকা নিয়ে হাজির হতে পারে। যারা আমার কথা শুনে মুচকি হাসছেন তাদেরকে ধৈর্য ধরতে অনুরোধ করছি। একটা ঘটনা বলি শুনুন তারপর না হয় মুচকি হাসি বা অট্টহাসি কিংবা দুষ্টু হাসি যা ইচ্ছে হয় করবেন। এক যুবক এক পেঁয়াজের দোকানে গিয়ে দোকানদারকে বললো, ভাই, এক কেজি পেঁয়াজ দিন তো।

যুবকের পিছনে দাঁড়ানো দুই ভদ্রমহিলা নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলো। এক কেজি পেঁয়াজ কেনার কথা শুনে একজন আরেকজনকে বলছে, মনে হয় ছেলেটা বেশ ভাল পরিবারের। আমাদের পিনকির সাথে একে বেশ মানাবে কি বলেন আপা?

ওদিকে একই কারণে আমাদের প্রতিবেশী দেশে বিয়ের বাজারে জৈন পাত্রীর চাহিদাও নাকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। কারণ কি জানেন? জৈন মেয়েরা পেঁয়াজ ছাড়াই নানা পদের সুস্বাদু খাবার তৈরি করতে পারে।

তবে যারা ভাবছেন পেঁয়াজ কিনে বা পেঁয়াজ খেয়ে বিয়ে বা বান্ধবী যোগাড় করবেন তাদের এ নিয়ে একটা সতর্কতা জানিয়ে দেই। কারন পেঁয়াজের দাম বাড়ার কথা শুনে আজকাল আমাদের আয়কর বিভাগ নাকি বেশ নড়েচড়ে বসেছে। তারা বাজারের খুচরা ব্যাবসায়ীদের কি নির্দেশ দিয়েছে কে জানে? কেউ বাজার থেকে এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে চাইলে দোকানদার নাকি আজকাল অনেক সময় টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) দেখতে চাচ্ছে।

পেঁয়াজের দাম বাড়লে যাদের বিয়ে বা বান্ধবী লাভের সম্ভাবনা নেই অর্থাৎ যারা সংসারের যাঁতাকলে ইতোমধ্যে অনবরত পিষ্ট হয়ে চলছেন তাঁরা সংসার খরচের তাল মেলাতে দাম বাড়লে পেঁয়াজ কেনা কমিয়ে দেন। তাঁদেরই কেউ কেউ পেঁয়াজ ছাড়া রান্নারও নানা কৌশল আবিষ্কার করে ফেলছেন। এমন কারও হাতেই হয়তো পেঁয়াজের পরিবর্তে বাঁধাকপির কুচো দিয়ে পেয়াজু তৈরির কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে। তাইতো দেখি পেঁয়াজের দাম বাড়লেও বাড়ে না পেয়াজুর দাম। এমনই কিছু পেঁয়াজ ছাড়া রান্নার নতুন রেসিপি যেমন ডিম পোচ, মাছ ভাজি, বেগুন ভাজি, কাচকলা বা কচু ভাজি, ডাল ইত্যাদি দিয়ে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের লোভের আগুনে সামান্য হলেও জল ঢেলে দেওয়া সম্ভব।

অতএব যাদের বিয়ে বা বান্ধবী লাভের চিন্তা বা সম্ভাবনা আপাতত নেই তারা এসব রেসিপি অনুসরণ করে অসৎ পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের একটা উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার চিন্তা করতে পারেন।

লেখক: অ্যাডিশনাল ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ

অমৃতবাজার/আরইউ