ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আমার সাংবাদিক হবার গল্প


শাহাদত হোসেন কাবিল

প্রকাশিত: ০৪:৩৪ পিএম, ২৩ মে ২০১৯, বৃহস্পতিবার
আমার সাংবাদিক হবার গল্প

কে ভেবেছিল আমি সাংবাদিক হবো। আমি নিজেও ভেবেছিলাম বলে মনে পড়ে না। তবে এ কথা ঠিক যে সুপ্ত বাসনা পরিবেশ পেলে একদিন বাস্তব হয়ে দেখা দেয়। যেমন একটি বীজ মাটিতে পড়লেই কিন্তু চারা হয় না। উপযুক্ত সময়ে পানি পেলে অঙ্কুরোদগম ঘটে। আমার বিষয়টা মনে হয় তেমন কিছু। এ কথাটি বলছি এজন্য যে, আমি যখন কিশোর অর্থাৎ নিচের ক্লাসে পড়ি তখন সংবাদপত্রে আমার নিজ উপজেলা (তখন থানা) ঝিকরগাছার নাম দেখলে রোমাঞ্চিত হতাম। মনে মনে ভাবতাম কি সাংঘাতিক কথা, খবরের কাগজের পাতায় ঝিকরগাছার নাম ছাপা হয়েছে। তখনকার দিনে সংবাদপত্রে এসএসসির রেজাল্ট পুরো ছাপা হতো। ওই রেজাল্টে একবার ঝিকরগাছার নামটা ছাপা হয়েছিল। তা আমি দেখে দারুণ পুলকিত হয়েছিলাম।

আমি তখন নিচের ক্লাসের ছাত্র। সংবাদপত্রের কিছুই কিন্তু বুঝতাম না। তবু সংবাদপত্র আমাকে টানতো। তাই মাঝে মধ্যে সংবাদপত্র কিনতাম। কিন্তু তা পড়ে বুঝলে তো। কিছু গ্রামীণ খবর সামান্য বুঝতাম। তখনকার দিনে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় শিশু-কিশোর পাতা ছিল। নাম ছিল সম্ভবত বাগবানের আসর। ওই আসরে যে লেখা বিশেষ করে ছড়া কবিতা যা বুঝতাম তা আমার বেশ ভালো লাগতো। তার কারণও অবশ্য ছিল। আমি আবার একটু আধটু ছড়া-কবিতা লিখতে পারতাম। ওই ছড়া কবিতা স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হতো। একবার ওই ম্যাগাজিনে স্কুলের (ঝিকরগাছা বিএম হাই স্কুল) প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ মৌলভী বদরুদ্দিন আহমদ সম্পর্কে একটি কবিতা লিখেছিলাম। যার দু’লাইন এখনো মনে আছে। তা হলো, শীর্ণ দেহী সত্যের সৈনিক নাম তব হাজি বদরুদ্দিন/মরিয়াও অমর তুমি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে চির দিন।

ছাত্রজীবনের দিনগুলো পড়াশুনা আর এমনই এলোমেলো ভাবনার মধ্য দিয়ে চলছিল। তারপর ১৯৭০ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। পাসও করলাম। যশোর সরকারি এমএম কলেজে ভর্তি হবার জন্য ফরম তুলতে গেলাম কলেজে। ফরম নেয়ার সময় কলেজ থেকে জানিয়ে দেয়া হলো দু’কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি আবেদনপত্রের সাথে দিতে হবে। কলেজ থেকে গেলাম যশোর শহরের রেলগেটের মিলন স্টুডিওতে। ওই স্টুডিওতে দেখি ঝকঝকে তকতকে একটি সুন্দর পত্রিকা। নাম গণদাবী (তখন এই বানান ছিল)। সাপ্তাহিক এ পত্রিকাটি প্রকাশ হয় রেলগেট থেকেই। পত্রিকাটি আমার যে কি ভালো লেগেছিল তা ভাষায় বর্ণনা করার সাধ্য আমার নেই। স্টুডিও থেকে বের হয়ে খুঁজতে লাগলাম পত্রিকা অফিস। পেয়েও গেলাম। কিন্তু সমস্যা হলো অফিসে ঢুকবো কেমন করে। একে শহরে চলাচল নেই, তার ওপর গিয়েছি গ্রাম থেকে। বুকে তত বল নেই যে আমি কোনো অফিসে চট করে ঢুকে পড়বো। তারপর অফিসে যারা আছেন তাদেরকে কি বলবো আমি। সাত-পাঁচ বহু কিছু ভেবে একটা মোক্ষম বুদ্ধি বের করলাম। ঠিক করলাম অফিসে ঢুকে যারা আছেন তাদেরকে বলবো আমি এই পত্রিকা নিয়মিত পেতে চাই। তাহলে তারা খুশী হবেন। করলামও তাই। অনুমতি নিয়ে ঢুকে সালাম দিলাম।

অফিসের এক ভদ্রলোক (পরে জানি তিনি সম্পাদক নাসিরুদ্দিন আহমদ) পিতৃস্নেহে আমাকে বললেন, খোকা কিছু বলবে?
ভদ্রলোকের কথায় আমি সাহস পেলাম। বললাম, আমি গণদাবী পত্রিকা নিয়মিত নিতে চাই।
ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, তুমি কি করো?
বললাম, এবার এসএসসি পাস করেছি। এমএম কলেজে এইচএসসি’তে ভর্তির চেষ্টা করছি।

ওই সময়কার পত্রিকার দামটা আমার স্মরণে নেই। তিনি বললেন, ছয় মাসের টাকা জমা দিয়ে যাও। তুমি বাড়ি বসে পত্রিকা পাবে। পোস্ট অফিসের পিওন তোমাকে পত্রিকা পৌছে দেবে। আমি নির্ধারিত টাকা জমা দিয়ে বিদায় নিলাম। চলে আসার সময় অফিস থেকে আমাকে একটা পত্রিকা দেয়া হলো। ওই পত্রিকাটি হাতে পেয়ে আমার মনের অবস্থা কি হয়েছিল সে কথা আজ বর্ণনা করতে পারবো না। এক কথায় আমি ভেবেছিলাম সারা পৃথিবী যেন আমার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তেমন কোনো ঘটনাই সেটা নয়। ওটা ছিল তরুণ মনের অভিব্যক্তি।

যাহোক পত্রিকাটি এক জায়গায় বসে পড়বো সে তর যেন সইছিল না। আর তাই বাসে উঠে ছিটে বসে পড়তে শুরু করি। তখন বাসস্ট্যান্ড ছিল রেলগেটেই, গণদাবী অফিসের পাশে। রেলগেট থেকে যশোর বেনাপোলের সড়কের লাউজানী ৯ কিলোমিটার পথ। বাস থেকে নেমে হাটার গতি অন্য দিনের তুলনায় বেড়ে গেল। মনে হচ্ছিল কখন লাউজানী থেকে এক কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্মীপুরের বাড়ি পৌছাবো। বন্ধু-বান্ধবদের দেখাবো একটি খবরের কাগজের গ্রাহক হয়েছি। আমার ঠিকানায় প্রতি সপ্তাহে পিওন এসে কাগজ দিয়ে যাবে, এক কথায় দাম বাড়ানো আর কি।

বাড়ি পৌঁছালাম দুপুরের দিকে। খেয়েদেয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছি। কখন সময় হবে সঙ্গী-সাথীরা কাবে আসবে। তাদের কাছে পত্রিকা দেখাবো, গ্রাহক হবার গল্প বলবো ইত্যাদি। ক্লাব বলতে আমরা তরুণরা ১৯৬৯ সালে গ্রামে আমাদের বাড়ির সামনে বটতলায় যুবক সমিতি নামে একটি ক্লাব করেছিলাম।পরে নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছিল নবারুণ সমিতি। বিকেলে একে একে সবাই আসলো। আর আমি সবার সামনে পত্রিকাটি এগিয়ে দিলাম। পত্রিকা পেয়ে সেকি কোলাহল। একজন পড়ে আর সবাই শোনে। সবার ভাবটা এমন যে আমি যেন কোনো কিছু একটা জয় করে এসেছি। তাদের কাছে যখন বললাম প্রতি সপ্তাহে পিওন এসে আমাকে পত্রিকা দিয়ে যাবে তখন ওদের কৌতুহলের সীমা ছাড়িয়ে গেল। বর্তমান প্রজন্ম যখন এ কথা পড়বে তখন তারা ভাববে ওই আমলে আমরা পাগল ছাড়া আর কিছু ছিলাম না। কারণ এখন ওই রকম একটা পত্রিকা তাদের কাছে কিছুই না। যা হোক সন্ধ্যার দিকে যে যার বাড়িতে চলে গেল। কিন্তু আমার মাথায় চেপে বসেছে ওই পত্রিকায় কিছু লেখা যায় কিভাবে। আমার তখন লেখাপড়ার চাপ নেই। এসএসসি পাসের পর এইচএসসিতে ভর্তি হতে হবে। তারপর কাস শুরু হলে পড়ার চাপ আসবে।

লেখা নিয়ে ভাবতে ভাবতে প্লট মিলে গেল। আমার লক্ষ্মীপুর গ্রামের পাশ দিয়ে যশোর সদর উপজেলার বুকভরা বাঁওড় থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খাল ঝিকরগাছায় কপোতাক্ষ নদের সাথে যুক্ত। যশোর সদর ও চৌগাছা উপজেলার ৩৬৫ টি মৌজার জলাবদ্ধতা নিরসনে এই খালটি ব্রিটিশ আমলে কাটা হয়। এটি একটি কাটা খাল হলেও বর্ষা মৌসুমে অনেকের কাছে নদী বলে মনে হয়। এই খালের ওপর ঝিকরগাছা উপজেলার পগলাদহে একটি কাঠের পুল তৈরি করে দেয়া হয়। যে পুলটি এলাকার অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষের যোগাযোগ রক্ষা হতো। এই ব্রিজ পেরিয়েই অমৃতবাজারের জমিদার শিশির কুমার ঘোষ অমৃতবাজার রেল স্টেশনে এসে ট্রেনে চেপে কলকাতা যেতেন। শিশির কুমার ঘোষ নিজ গ্রাম থেকে পাক্ষিক অমৃতপ্রবাহিনী নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। পরে প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক অমৃতবাজার, যা পরে দৈনিকে উন্নীত হয়ে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো। সুদীর্ঘ কাল জনপ্রিয় দৈনিক হিসেবে অমৃতবাজারের প্রকাশনা অব্যাহত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঝিকরগাছা রেল স্টেশন লাউজানীতে স্থানান্তর করা হয় এবং নাম দেয়া অমৃতবাজার রেল স্টেশন। আর অমৃতবাজারের মূল নাম মাগুরা। শিশির কুমার ঘোষের মা অমৃতময়ী দেবীর স্মরণে জমিদার গ্রামটির নাম অমৃতবাজার করেন। এখন অবশ্য মূল নামটি চালু আছে।

কাটা খালের ওপরের কাঠের পুলটি সংস্কারের অভাবে এক পর্যায়ে ওই বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগ সংকট সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি নিয়ে আমি একটি প্রতিবেদন তৈরি করি। পরে যেদিন এমএম কলেজে ভর্তি ফরম জমা দিতে গিয়েছিলাম সেদিন প্রতিবেদনটি হাতে করে নিয়ে যাই। ফরম জমা দিয়ে ফেরার পথে যাই গণদাবী অফিসে। সালাম জানিয়ে সামনে দাঁড়াতে সম্পাদক মহোদয় বললেন, কিছু বলবে খোকা?

আমি যে একটা প্রতিবেদন লিখেছি সেটা আর ভয়ে বলতে পারছিনে। তো কিছু একটা বলতে হবে তাই জড়তা নিয়ে বললাম আমি গণদাবীর গ্রাহক হয়েছি।
তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, আর কিছু বলবে?
একে গেঁয়ো ছেলে তার ওপর বয়স কম। কিছু বলতে গেলে ঠোট কাঁপছিল। তবু সাহসে বুক বেঁধে বললাম, আমি একটা খবর লিখেছি।
সম্পাদক সাহেব স্মিত হাসলেন।
তার এই হাসি দেখে আমার মনে হলো তিনি মনে করছেন, এতটুকু পোলা, সে আবার বলছে খবর লিখেছে।

সম্পাদক মহোদয় আমাকে নিরাশ করলেন না। চেয়ে নিলেন কপিটি। পড়তে শুরু করলেন। পড়ার সময় তার একটা হাসি-খুশী ভাব দেখে আমার মনে হচ্ছিল লেখাটা মনে হয় ভালো না হলেও একেবারে ফেলে দেয়ার মতো হয়নি। পড়া শেষ করে তিনি জানতে চাইলেন, এর আগে কোনো দিন খবর লিখেছো?
আমি বললাম, না।
তাহলে এটাই কি প্রথম লেখা? খুব সুন্দর হয়েছে। লেখাটির শেষে আমার নাম লেখা ছিল মো. শাহাদত হোসেন।
তিনি জানতে চাইলেন, আমার কোনো ডাক নাম আছে কিনা। বললাম বাবা, মা ও বড় ভাই খোকা বলে ডাকে, পাড়ার মানুষ ও বন্ধুরা ডাকে কাবিল বলে।
তিনি বললেন পত্রিকায় তোমার নাম ছাপা হবে শাহাদত হোসেন কাবিল। তোমার এ লেখাটি গণদাবীর পরবর্তী সংখ্যায় ছাপা হবে।

‘এটাই কি প্রথম লেখা? সুন্দর হয়েছে’ সম্পাদক মহোদয়ের এ কথায় আস্থা আসছিল না আমার। কারণ প্রথম লেখাটির কোনো ত্রুটির কথা না বলে তিনি বললেন সুন্দর হয়েছে, তা হয় কি করে। মাথায় চিন্তার চাপ বেড়ে গেল। ভয়ে ও লজ্জায় বাড়ি ফিরে এ কথা বন্ধু-বান্ধবদের কাউকে বললাম না। শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকলাম পরবর্তী সংখ্যার জন্য। তারপর আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিন পড়ন্ত বেলায় পিওন আসলেন আমার বাড়িতে। গণদাবীর কারেন্ট সংখ্যাটি বের করে আমাকে দিলেন। লেবেল ছিড়ে পত্রিকাটি মেলিয়ে যা দেখলাম সে প্রতিক্রিয়া আমি এখন কি করে বোঝাবো। আমার মনে হয় সাহিত্যে বর্ণনার যাদুকর শরৎচন্দ্রের বেলায়ও যদি এমনটা হতো তিনিও প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করতে পারতেন না। পত্রিকা মেলে কি দেখেছিলাম শুনুন। দেখি প্রথম পাতায় প্রথম খবর (আমরা সাংবাদিকতার ভাষায় যেটাকে লিড নিউজ বলি) হিসেবে তিন কলমে ছাপা হয়েছে। শুধু কি তাই। তাও আবার আমার নামে। ওই যে সম্পাদক মহোদয় বলেছিলেন পত্রিকায় শাহাদত হোসেন কাবিল নামে তোমার লেখা ছাপা হবে। আগেই বলেছি আমার সেদিনকার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ভাষা আমার নেই। আমি তো পত্রিকা নিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছি। সেই সাথে বন্ধুরাও। পাড়ার মুরব্বীরা জেনে হতবাক, কাবিল সাংবাদিক হয়েছে! মনে মনে কবে কি করলো ইত্যাদি। আর সেটি এমনই এক খবর যে সবার স্বার্থ সেখানে জড়িত।

এই খবরটি প্রকাশের পরই অজান্তে অজ্ঞাতে আমি আটকে গেলাম প্রথমে সাংবাদিকতার নেশায়, পরে পেশায়। শত প্রতিকুলতা ও চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়েও এ পেশা থেকে এক দিনের জন্য আর অন্য পেশায় যেতে পারিনি।

প্রতিক্রিয়ার ঘটনা প্রবাহ আরো আছে। এমনিতেই ধান ভানতে শিবের গীতের মতো অনেক কথা বলা হয়ে গেছে। তাই আর দীর্ঘায়িত করে কারো ধৈর্যচ্যুতি ঘটানো উচিত হবে না বলে মনে করে আমার সাংবাদিকতায় প্রবেশের গল্পের এখানেই ইতি টানলাম।

লেখক: সংবাদকর্মী, যশোর

অমৃতবাজার/আরএইচ