ঢাকা, সোমবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৭ | ৭ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

মনে রেখো কেবল একজন ছিল …


লুৎফর হাসান

প্রকাশিত: ০৪:১৫ পিএম, ০২ অক্টোবর ২০১৭, সোমবার
মনে রেখো কেবল একজন ছিল …

সুরের ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন এই সবুজ ভূখণ্ডের দাগে দাগে কাল থেকে মহাকাল গানের প্রবাদ পুরুষেরা তাঁদের চিরস্থায়ী চিহ্ন রেখে যান, আর অগণন শ্রোতা বুঁদ হয়ে সেই সুরের বৃত্তে ঢুকে গিয়ে আর বেরুতে চায় না। আনন্দ বিষাদে অথবা উচ্ছ্বাস হতাশায়, গানের পাশাপাশি সে গানের কণ্ঠকেও ভালোবেসে ফেলে নির্দ্বিধায়। বাংলা গানের স্বতন্ত্র এক অধ্যায় জেমস। এই একটি নাম ও নামের সাথে উচ্চারিত সমস্ত গানের ঘোরে ঋণী হয়ে আছে অসংখ্য তরুণ যুবার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন কতো যে নির্ঘুম রাত, সে হিসেব মেলানো কঠিন খুব।

কে আছে এমন প্রেমিকাকে নীলিমার দিকে তাকাতে বলে আস্ত আকাশ দখলে নিতে উস্কানি দেয়। স্তব্ধ করে দিতে পারে নিজের দিকে ঝুঁকে গিয়ে গোটা নক্ষত্রপাড়া আর ঝাঁঝালো কণ্ঠে করতে পারে নির্দ্বিধার উচ্চারণ ‘আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব তুমি আমার’। সন্ধ্যামালতীর বন থাকবে উপেক্ষায়, উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে ক্যামেলিয়া এক, তাকেও নিরুত্তর রেখে দিয়ে কেবল সৌরভ সতেজ রেখে কে আর আছে এমন বলে দেবে ‘আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব আমি তোমার’।

পথ চলতে চলতে কে ছড়াবে এমন যাদুকর ভালোবাসা, কার আছে সাধ্য এমন অবলীলায় হয়ে যেতে পারে প্রেমিক ডাকাত, মৌসুমি বাতাসে ভালোবাসা হারিয়ে যেতে যেতে কে নেবে হৃদয়ের চোরাপথের আধিপত্য আর বলবে সঘন নিশ্বাসে ‘তুমি লুটপাট হয়ে যাবে, তুমি চৌচির হয়ে যাবে’। তুমুল প্রেমের দিব্যি নিয়ে প্রেমিকাকে পথহারা করে দিতে চোখের ইশারায় আর কে আছে ছুঁড়ে দিতে জানে সুতীক্ষ্ণ চুম্বন, তর্জনীর হাহাকারে কে টেনে দেবে সীমারেখা অনন্ত ভালোবাসার আর বলে দেবে সাফ কথা সেই ‘এই চোখে তাকিও না, তুমি লুটপাট হয়ে যাবে’।

মৃত্যুর নিখাদ পরোয়ানা নিয়ে জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে বসে কে আছে এমন তখনও নিতে চায় বুকের দেয়ালে সতেজ রাখতে প্রেমিকার পোস্টার । আর কে আছে এমন স্মৃতির সাঁকো পারাপারে বাতাসের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুপচাপ খবর পৌঁছে দিতে ‘শোনো, জেল থেকে আমি বলছি’।

আঁধারের সিঁধ কেটে বাইরে এসেই চোখের বোরখা নামানোর কথকতায় কে আর আছে এমন নাজিল করে দেয় জোছনার গালিচা, মিছিলের ভিড় ঠেলে সামনে এসেই দুঃখের পৃষ্ঠা উল্টে দেখে নেবার আহবান স্বপ্নের বাগিচার, কার কণ্ঠ এতো উত্তাল যে নিঃসঙ্কোচে দিতে পারে ডাক চুলখোলা রমনীরে, সান্ত্বনায় বা করুণায় নয় , পথচলার পরম আস্থায় কে দিতে পারে নিশ্চয়তা সেই ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না, দুঃখিনী’।

এ জগত সংসারে ভিড় করে আছে কতো সন্তানহারা, আছে কতো মা আর বাবাহারা, আছে হতাশায় নিমজ্জিত ঘুণের আঁচড়ে বিক্ষিপ্তজন, আছে অজস্র পোড় খাওয়া প্রেমিক যারা প্রেমিকার বিশুদ্ধ অবজ্ঞায় ক্ষত বিক্ষত, আছে দুঃখী ও যন্ত্রণাকাতর জীবন। সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বানে সঙ্গী হতে কে আর দিতে পারে নিজস্ব নিশ্চয়তা শতভাগ ‘তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও , শোনাবো গান আজ সারারাত’।

জীবনানন্দের বনলতার মতো এক রহস্যময়ী চলে আসে সুস্মিতা নামে, যে থাকে সবুজ ওড়নায়। সে ভাসায় সবুজ ওড়না তার মফস্বলে, পাহাড়ে, অরণ্যে, সমুদ্রে অথবা সমতটে। সেই ওড়নাকে সকলেই দেখতে পায় না উড়ে যেতে, দেখে কেবল একজন। যে দেখে সে গেয়ে ফেরে তাঁর গনগনে স্বরে ও সুরে ‘সুস্মিতার সবুজ ওড়না উড়ে যায়, উড়ে যায়, উড়ে যায়’। এই এক সুস্মিতা থিতু হয়ে যায় গানের মানচিত্রে। সবুজ ওড়না উড়তে দেখেই যেন গেয়ে ওঠে বেখেয়ালি বাতাসও। যেন সবুজ ওড়না পরার অধিকার কেউ একজন লিখে দিয়েছে সুস্মিতার নামেই।

শিল্পের নিজস্ব কোনও মানচিত্র নেই, শিল্প সভ্যতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে আছে দেশে থেকে মহাদেশ, সাগর থেকে মহাসাগর। সে জনপদের কোথাও না কোথাও ঘুরে বেড়াতে জানে পৃথিবীর যেকোনো বোহেমিয়ান। কোনও এক বোহেমিয়ান হুট করে পেয়ে যেতে পারে প্যারিসের চিঠিও। সে চিঠিতে ফরাসি সীমা পরিসীমা পেরিয়ে ভিয়েনার কথা থাকতে পারে, থাকতে পারে ফ্রাংকফুটের কথা। কথা জুড়ে কেবলই ভালোবাসাবাসির অমরত্বের গান। আর সে গান কণ্ঠে নিতে জানে যে যাদুকর, তাঁকে ছাড়া আর কাকে চিঠি লিখবে আকাশী নাম যার।

একদিন ডাক এসে যায় অন্য পৃথিবীর, যেখানে দরজা আছে প্রবেশের, বেরুবার পথ থাকে আজন্ম সিলগালা। সেই পৃথিবীতে যেতে হবে , এ ধ্রুপদী সত্যের বিপরীতে নেই কোনও অতি ক্ষুদ্র যুক্তিতর্কও। সেখানে যেতে যেতে ভালোবাসার দাবী নিয়ে কেউ একজন ছিটিয়ে দেয় আগুনের সৌরভ। সেই সৌরভে লেগে থাকে সুবর্ণ নিবেদন আর উজ্জ্বল অধিকারের বিশুদ্ধ স্পর্ধা ‘ যেদিন বন্ধু চলে যাব, চলে যাব বহুদূরে, ক্ষমা করে দিও আমায়, ক্ষমা করে দিও, মনে রেখো কেবল একজন ছিল ভালোবাসতো শুধুই তোমাদের’।

উপরের উচ্চারিত সকল কথামালা গেঁথে আছে কণ্ঠে যার, যিনি লক্ষকোটি খ্যাপাটে শ্রোতার কানে, মনে ও মগজে থিতু করে দিয়েছেন তাঁর সমস্ত উচ্ছ্বাস আর বিষাদের অধিকার তিনি এ বঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ – জেমস। দেশের মানচিত্র পেরিয়ে যিনি পৃথিবীর অনেকটা দখলে নিয়েছেন তাঁর সুরে সুরে সেই প্রবাদ পুরুষের আজ জন্মদিন।
শুভেচ্ছা অবিরাম।

লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে।

অমৃতবাজার/মাসুদ

Loading...