ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

রোজা রাখার উপকারিতা!


অমৃতবাজার ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৩৪ এএম, ১৬ মে ২০১৮, বুধবার
রোজা রাখার উপকারিতা!

আসছে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। আরবী মাসের মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ মাস, পবিত্র রমযান মাস। মুসলমানদের জন্য কল্যাণময়, কুরআন নাযিলের, রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস হচ্ছে রমজান মাস। এ মাস তাকওয়া, সংযম প্রশিক্ষণের মাস ও ধৈর্য্যের মাস রমজান। প‌বিত্র রমজান জীবনকে সমস্ত পাপ হতে মুক্ত করে মহান আল্লাহর ইবাদত ব‌ন্দেগী ও নৈকট্য লাভের উপযুক্ত মাস।

এ ব্যাপারে পবিত্র আল-কুরআ‌নে বলা হয়েছে যে, ‘রমযান মাস- এ মাসে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন নাযিল হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম তথা রোযা পালন করে।’ (বাকারা- ১৮৫)

রমজান মা‌সের ফ‌জিলত বা মহাত্বের কথা ব‌লে শেষ করা যা‌বে না। আল্লাহর তার বান্দা‌দের জন্য রমজান মাস ইহকাল ও পরকা‌লের জন্য কল্যাণ ব‌য়ে আ‌নে। তাই রোজা রাখলে শারীরিক ও মান‌সিকভা‌বে অ‌নেক উপকার পাওয়া যায়। যা কিনা চি‌কিৎসা বিজ্ঞা‌নের বি‌ভিন্ন গ‌বেষণায়ও উ‌ঠে এ‌সে‌ছে। এখন জেনে নেয় স্বাস্থ্য ও ম‌নের উপকারিতায় রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে।

পাপ কলঙ্ক থে‌কে মু‌ক্তি:
প‌বিত্র রমজান মা‌স হচ্ছে পাপ ও কলঙ্ক মুক্তি জন্য উপযুক্ত মাস। রোজা রাখার কার‌ণে মানু‌ষের ম‌ধ্যে আল্লাহভী‌তি কাজ ক‌রে। ফ‌লে তার মন সমস্ত অন্যায় তথা পাপ কাজ থে‌কে বিরত থাকতে স‌চেষ্ট হয়। আত্ম-শুদ্ধির পাশাপা‌শি মানবিকতার বিকাশ ঘ‌টে। রোযা পালনকারী ব্য‌ক্তির প‌ক্ষে খারাপ কাজ করা সম্ভব হয় না।

দেহের টক্সিন দূর:
প্রতিদিন আমাদের মধ্যে বেড়ে চলেছে প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা। যেমন- হাতে বানানো রুটির বদলে খাই পাউরুটি, বিস্কুট, কেক, পিৎজার মতো নানা ধরনের মুখরোচক খাবার। কিন্তু এসব খাবার থেকে আমাদের দেহে জমা পড়ে ক্ষতিকারক টক্সিন। এতে অ্যাজমা, আথ্রারাইটিস, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেইলিওর, দৃষ্টিশক্তি হারানো, দাঁত পড়ে যাওয়া, মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদি। রোজাতে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে এই ফ্যাট কমে আসে। ক্ষতিকারক টক্সিনগুলো লিভার, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের মধ্য থেকে বেরিয়ে যায়।

হজমক্রিয়ায় জনিত সমস্যা দূর:
দেহের মধ্যে যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খাবার হজমের কাজ করে, রোজার সময় এ অঙ্গসমূহ কিছুটা বিরতি পায়। হজমের রস নিঃসরণ তখন ধীর হয়। খাবারগুলোও ভাঙে ধীরে। দেহের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিও তখন নিঃসরণ হয় ধীরে। তবে রোজা রাখলেও পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ বন্ধ হয় না। এজন্যই পেপটিক আলসারের রোগীদের রোজা রাখার ক্ষেত্রে ডাক্তাররা কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেন।

এলার্জি এবং চর্মরোগ উপকার:
গবেষণায় দেখা যায়, জীবাণু ও আঘাতের কারণে দেহ যে প্রক্রিয়ায় অসুস্থ থাকে, রোজা রখলে সে প্রক্রিয়াকে নষ্ট করে দেয়। ফলে রিউমাটয়েড আর্থ্রারাইটিস, এলার্জি, সোরিয়াসিস নামক চর্মরোগ ইত্যাদি থেকে নিরাময়ে রোজার ভূমিকা আছে বলে মনে করেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, পিত্তথলির রোগ আলসারেটিভ কোলাইটিস নিরাময়েও রোজার ভূমিকা অনেক।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে:
এক জন রোজাদার রাখাকালীন সময় দেহের গ্লুকোজগুলো দ্রুত ভাঙতে থাকে এবং দেহের জন্যে প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করে। ফলে তখন ইনসুলিনের উৎপাদন কমে যায়, যা প্যানক্রিয়াসকে কিছুটা বিশ্রাম দেয়। অন্যদিকে গ্লুকোজ ভাঙার সুবিধার্থে শরীরে গ্লাইকোজেন তৈরি হয়। এর ফলে দেহে ব্লাড সুগারের পরিমাণ কমে তা ডায়াবেটিস প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

ফ্যাট বা চ‌র্বি হ্রাস পায়:
মানবদেহে রোজাদার ব্যাক্তির প্রথম প্রভাবই হলো গ্লুকোজের প্রভাব কমানো। আর গ্লুকোজ যখন কমে যায় তখন কেটসিস নামে দেহের এক ধরনের জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা ফ্যাট কমায় এবং শরীরে শক্তি যোগায়। এমনকি কিডনি বা পেশিতে যে ফ্যাট জমে তাও ক্ষয় হয়ে শরীরে শক্তি উৎপাদিত হয়।

রক্তচাপ কমায়:
ওষুধ ছাড়া রক্তচাপ কমানোর এক আদর্শ পদ্ধতি রোজা রাখা। কারণ রোজা রাখলে প্রথমে গ্লুকোজ, পরে চর্বিকণাগুলো ক্ষয় হয়ে শক্তি উৎপাদন করে। রোজা রাখলে মেটাবলিক রেটও কমে। এড্রিনালিন এবং নরএড্রিনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন উৎপাদন কমে। আর এতে করে মেটাবলিক হার একটা স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। ফলে ব্লাড প্রেশার কমে। আর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এথেরেসক্লেরোসিস বা ধমনীতে চর্বি জমার প্রক্রিয়ার ওপর যা হার্ট এটাকের ঝুঁকি কমায়।

নেশাদ্রব্য হতে মুক্তি:
অনেকেরই ধরনের বদ অভ্যাসের প্রতি আসক্তি থাকে। এর মধ্যে ধুমপান, নেশা করা, অতিরিক্ত চিনি জাতীয় খাবার খাওয়া প্রভৃতি রয়েছে। রমজানে সারাদিন খাওয়া থেকে বিরত থাকায় অনেক ধরণের রদ-অভ্যাস থেকে দূরে সরে আসা সহজ হয়। একটানা কয়েকদিন বিরত থাকলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সেই অভ্যাসটা ত্যাগ করা সহজ হয়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস রমজান মাসটাকে ধুমপান ছেড়ে দেবার জন্য আদর্শ সময় বলে আখ্যায়িত করেছে।

ভোজনবিলাস কমে:
রমজানে খাদ্য কম খাওয়াতে পাকস্থলী সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে অল্প খাবার খেলেই পেট ভরে যায়। রমজান মাস হচ্ছে সঠিক খাদ্যাভ্যাস শুরু করার একটা অত্যন্ত ভালো সময়। কাজেই এ ধরনের অভ্যাসের কারণে রমজানের পরেও দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ করাটা সহজ হয়।

কোলেস্টেরল কমাতে:
কার্ডিওলজিস্ট গবেষণায় রোজার ব্যাপারে বলেছেন, যারা রমজানে রোজা রাখেন তাদের রক্তে কোলেস্টেরল এর পরিমাণ কমে যায়। নানা ধরণের হৃদরোগ যেমন হার্ট আটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির ঝুঁকিও কমে যায়। আর যদি রমজানের পরেও সুষম এই খাদ্যাভ্যাস চালু রাখা যায় তবে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না।

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে:
রোজা রাখার ফলে দেহ ও মনে নিঃসন্দেহে একধরণের ইতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি হয়। আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী গবেষণা করে দেখেছেন যে, রমজানে রোজা রাখার মাধ্যমে মস্তিষ্কে নতুন নতুন কোষের জন্ম হয়। ফলে মস্তিষ্কের কর্মদক্ষতা বেড়ে যায়। অন্যদিকে কোটিসল নামক একধরণের হরমোন রয়েছে যা আড্রিনালিন গ্রন্থি থেকে নিঃসরিত হয় তার পরিমাণও কমে যায়। এর ফলে পুরো রমজান মাসে এবং রমজানের পরেও মানসিক চাপ বেশ কম থাকে।

অমৃতবাজার/সবুজ