ঢাকা, রোববার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ৪ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজা রাখার উপকারিতা!


অমৃতবাজার ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৩৮ পিএম, ১৫ মে ২০১৮, মঙ্গলবার | আপডেট: ০১:৪০ পিএম, ১৫ মে ২০১৮, মঙ্গলবার
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজা রাখার উপকারিতা!

রোজার মাধ্যমে শরীরের মধ্যস্থিত, প্রোটিন, ফ্যাট ও শর্করা জাতীয় পদার্থসমূহ স্বয়ং পারিচালিত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোতে পুষ্টি বিধান হয়। এই পদ্ধতিকে ‘এ্যান্টো লিসিস’ বলা হয়। এর ফলে শরীরে উৎপন্ন উৎসেচকগুলো বিভিন্ন কোষে ছড়িয়ে পড়ে। এটি হচ্ছে শরীর বিক্রিয়ার এক স্বাভাবিক পদ্ধতি। রোজা এই পদ্ধতিকে সহজ, সাবলীল ও গতিময় করে।

রোজার মাধ্যমে লিভার রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয় ফলে ত্বকের নিচে সঞ্চিত চর্বি, পেশীর প্রোটিন, গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারে কোষসমূহের রস সমুহ বেশী নিঃসরণ যার ফলে নিয়মিত অভ্যাসকারীদের শারীরিক অসুখ বিশুখ ও অবকাঠামো অন্যান্যদের চাইতে অনেক ভাল থাকে, যদি ঠিক মত পালন করেন ( প্রমাণিত, মেডিক্যাল সাইন্স এন্ড ইসলাম )

রোজা রাখলে যে সকল উপকার পাওয়া যায়- সংযমী ও ঠিক নিয়মে রোজা রাখতে পারলে আপনার নির্দিষ্ট সুফল পেতে পারেন যেমন-

স্লিম বডি এবং ওজন কমানোর বিশেষ সময়:
যারা শরীর কে কমানোর জন্য জিম বা ভিন্ন ধরণের এক্সারসাইজ করেন তিনিদের জন্য খুবই ভাল একটি সময় এই রমজান মাস। এ সময় দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার ফলে শরীরের জমানো চর্বিগুলো ক্ষয় হতে থাকে। এইভাবেই ধীরে ধীরে ওজন কমতে থাকে তবে সেহেরী ও ইফতার খাওয়ার সময় অবশ্যই পুষ্টিকর খাবারের খেতে হবে ।

রোজা রাখার অভ্যাসে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধা হ্রাস করে বিধায় পরবর্তীতে ঠিক সেই ভাবে যদি জীবন যাপন করতে পারেন, তা হলে অন্য এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে, আপনার শারীরিক অবকাঠামো সাধারনের চাইতে ২০% উন্নিত রাখা সম্ভাব , সেই দৃষ্টিতে রোজা বার্ধক্য রোধে ও শারীরিক সুন্দর বৃদ্ধি করতে অনেকটা সহায়ক। (ইনফ, মেডিসিন )

হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রোগীদের উপকারী:
হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রোগীদের জন্য রোজা উপকারী। রোজার ফলে রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায়। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি ৬০% কমানো সম্ভাব। রোজা শারীরবৃত্তীয় প্রভাব, রক্ত ​​শর্করা কমিয়ে কলেস্টেরল কমিয়ে এবং সিস্টোলিক রক্তচাপ কমিয়ে দেয় অতি সহজে, রক্তে কোলেস্টেরলের স্তর হ্রাস করে .পাশাপাশি ধমনীতে দেয়ালে যে কোলেস্টারলের গাদ থাকে তা precipitating হার কমে যায় ইহা ও প্রমাণিত। লোয়ার কলেস্টেরলের বেলায় লিপিড প্রোফাইল ইতিবাচক প্রভাব রাখে সে জন্য নিম্ন কলেস্টেরল খুভ সহজে নিয়ন্ত্রণ করে বিধায় স্ট্রোকের আক্রমন থেকে ও অনেক খানি মুক্ত রাখে

কু-রুচি সম্পন্ন বদ অভ্যাস দূর করে:
রোজা রাখা ও ধর্মীয় অনুশাসনের ফলে (মহান আল্লাহতালার প্রতি বিশেষ অনুগত থাকার কারণে) মস্থিস্কের স্ট্রেস হরমোন করটিসেল খুভ কম নিঃসরণ হয়। যার কারণে যাহারা মানসিক ভাবে ভিন্ন অসুখে আক্রান্ত তিনিদের জন্য বেশ ভাল একটি সময় বলা যায়। প্রমাণ স্বরুপ দেখা গেছে এতে বিপাকক্রিয়ার ফলে মস্তিষ্কের সেরিবেলাম ও লিমরিক সিস্টেমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ে বিধায় মনের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর হয় বা কর্মোদ্দীপনাও বেড়ে থাকে কার ও কারো বেলায় । অন্য দিকে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে রমজানে রোজা রাখার মাধ্যমে নতুন নতুন কোষের জন্ম হযে মস্তিষ্কের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করতে খুভ সুন্দর সহায়ক । পবিত্র রোজা শরীরের জন্য চমৎকার detox বলতে পারেন এবং ধর্মীয় অনুসাশনের ফলে কু রুচি সম্পন্ন বদ অভ্যাস থাকলে তা ও দূর হয়েযায়।

গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের সমস্যা:
দেখা যায় অনেকেই সারা বছর গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের সমস্যা থাকে। কিন্তু রোজা আসলেই দেখা যায় তা কমে গেছে বা তেমন সমস্যা করেনা এর মূল কারণ পাকস্থলীর উক্তেজিত এঞ্জাইম সমুহকে বেশ উক্তেজিত করতে পারেনা মস্তিষ্কে কিছু হরমুন কম নিঃসরণ হয় বলে, বলা যায় এক ধরণের অবস করে রাখে বা বা এ সময় কিছুটা কম হাইড্রোক্লোরাইড নিঃসরণ হয় ভিলাই থেকে, পাকস্থলীসহ পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায় ও হজম প্রক্রিয়া ও খুভ ধির গতিতে হয়। তাই রোজা রাখলে গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের সমস্যা কম থাকবে, তারপর ও পারফিউরেশন জাতীয় আলসারে আপনার চিকিৎসকের পরামর্ষ নিতে হবে । এ সময় adiponectin নামক হরমোন বৃদ্ধি পেয়ে হজম শক্তিকে সুন্দর একটা পর্যায়ে নিতে সাহায্য করে ইহা ও প্রমাণিত ।

ডায়াবেটিস:
ডায়াবেটিস রোজা রাখার মাধ্যমে অনেক টা সেরে যায়। কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে উপবাসের ফলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা কমে আসে, সর্ত হচ্ছে চিনি জাতীয় খাবার ইফতারের পর না খাওয়া। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিশেষজ্ঞরা রোজা রাখার পরামর্ষ দিয়েই থাকেন অনেকের ক্ষেত্রে । হাইপোগ্লাইসিমিয়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ যারা ইনসুলিন ডিপেন্ডেন্ট ডায়াবেটিস রোগী, তাদের রোজা রাখা কিছু টা ঝুকিপূর্ণ বিধায় খুভ বেশী সতর্ক থাকতেই হবে

কোষ্ঠকাঠিণ্য রোগীদের জন্য:
রোজার সময় যেহেতু দীর্ঘক্ষণ না খেওয়াই কারো কারো পানি স্বল্পতা হতে পারে। যা কোষ্ঠকাঠিণ্য রোগীদের জন্য সমস্যার ব্যাপার। তারা ইফতার ও সেহরিতে প্রচুর পরিমাণ পানি, ডাবের পানি, ফলের রস, সরবত, শাকসবজি, সালাদ, ইসবগুলের ভুসি খেলে আরাম করে রোজা রাখতে সমস্যা হবে না। গরু বা খাসির গোশত, ইলিশ ও চিংড়ি মাছ এবং যেসব খাবার খেলে মল শক্ত হয়ে যায় তা না খাওয়াই ভাল তবে এ ধরণের অসুখ যাদের আছে তাহারা অবশ্যই আঁশ জাতীয় সবজি প্রতিদিন খেতে পারলে রোজার পরে মিল্ক অফ ম্যাগনেসিয়াম জাতীয় ঔষধ খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তাও দূর হয়ে যাবে।

অন্যান্য অসুখে কিছুটা উপকারী:
লিভার ও কিডনির ক্ষেত্রেঃ- রোজা ধারী ব্যাক্তির দেহের টক্সিন অতি সহজে বাহির হয়ে যায় – আমরা সাধারণত যে খাবারগুলো খাই, তার অধিকাংশই প্রসেসড খাবার। যেমন, রুটির চেয়ে পাউরুটি-বিস্কুট, কেক বা পিজা-র মতো খাবার আমাদের প্রিয় বেশি। এসব খাওয়ার পর দেহের ভেতর এগুলো টক্সিনে রূপান্তরিত হয়। রোজাতে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে এই ফ্যাট কমে এবং ক্ষতিকারক টক্সিনগুলো লিভার, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের মধ্য দিয়ে রেচনের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। ফলে ঐ জাতীয় অসুখ অন্য সময়ের চাইতে কম থাকবেই। 

মাথা ব্যাথা:
রোজার সময় বিভিন্ন কারণে মাথাব্যথা হতে পারে। যেমন-পানিস্বল্পতা,ক্ষুধা , কম বিশ্রাম, চা-কফি না খাওয়া। এই স্ব সমাধানে ইফতারের সময় প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা উচিৎ , বা সে জন্য প্রচুর পানি, লেবু বা ফলের রস খাওয়া যেতে পারে। তবে মনে রাখবেন যাদের ডি হাইড্রেশন হওয়ার সম্বাভনা থাকে তাদের অবশ্যই সেহেরীর সময় প্রয়োজনের চাইতে একটু বেশী পানি বা ফলের রস বা ডাবের পানি ইত্যাদি খাওয়া ভাল। অথবা যাদের কিডনিতে ইউরিয়া জমা হওয়ার সম্বাভনা আছে বা সে জাতীয় পাথর হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাহারা সেই আক্রমন থেকে মুক্ত থাকবেন।

রমাজান মাসে রাগ গোসা কেন বাড়ে:
পবিত্র রমজান সম্মন্ধে নিজ ধর্ম সম্মন্ধে কিছু টা অভিজ্ঞতা থাকলে এই মাসে কারও রাগ গোসা বাড়ার কথা নয়, কেন না রোজা মানুষ কে ধৈর্য ও সহানুভূতির শিক্ষা দেয় , তারপর ও মেডিক্যাল সাইন্স অনুসারে – কারও কারও নিজের অজান্তেই একটু বেশী হওয়ার কারন – রোজা রাখার ফলে প্রথম ৬ ঘন্টার মধ্যেই মস্তিস্ক এবং শরীরের মাংস পেশীতে, গ্লকুজের অভাবে এড্রিনালিন এবং নারাড্রিনালিন কিছু টা অনিয়ন্ত্রিত অতিরিক্ত বেড়ে যায় বা কমে যায় , তড়িৎ গতিতে এবং গ্লকজের সাময়িক ভারসাম্মতা ঠিক মত মস্তিষ্কে পৌছাইতে পারেনা এর জন্য মানুষের উপবাস জনিত রাগ বাড়ে । সামান্য কিছু সময় উক্তেজিত বিষয় এড়িয়ে যেতে পারলে তাহলে এমনিতেই ধমে যায় । সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স অনুসারে দেখা যায় আত্মনিয়ন্ত্রণ হারা ব্যাক্তিদের রমজান মাসে রাগ গোস্বা বেশী বাড়ে ।

ভাজা-পোড়া খাবার পরিত্যাগ করবেন ইফতার বা সেহরির সময়:
রোজা পালনের পর ভাজা-পোড়া খাবার পরিবেশন স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তেল হচ্ছে এক ধরনের স্নেহজাতীয় পদার্থ। এটি উচ্চ তাপমাত্রায় বারে বারে গরম বা ভাজার ফলে Acrolene নামে এক ধরনের জৈব হাইড্রোকার্বন তৈরি করে। এটি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বা ইহা ধীরে ধীরে মানুষের হজমশক্তি নষ্ট করে ফেলে। ফলে পেটে বদহজম, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ডায়রিয়া, পাকস্থলী জ্বালা-পোড়াসহ নানা ধরনের জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। সুতরাং খাবারের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি। তার চাইতে ইফতারের সময় খেজুর, পানি, হালকা ও শরবত জাতীয় খাদ্য খাওয়া ভালো।

মানব সভ্যতা শরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সভ্যতা-সংস্কৃতির মানুষও রোজা পালন করতেন। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই উপবাসব্রত উদযাপন বা রোজা পালনের বিধান রয়েছে যদি ও এর নিয়ম নিতি ভিন্ন । ভারতীয় উপমহাদেশ উদ্ভূত হিন্দু ধর্মে– প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় ধর্মীয় অনুশাসন হিসেবে রোজা পালনের বিধান ছিল। যোদ্ধা জাতি গ্রিক ও রোমান সভ্যতায়, হাম্মুরাবির আইন কোড খ্যাত ব্যবিলনীয় সভ্যতায়।

আসুরউবলি্লতে প্রতিষ্ঠিত এসেরীয় সভ্যতায়, জরত্থুস্থ মতবাদের পীঠস্থান পারস্য সভ্যতায় রোজার প্রচলন ছিল। মহাবীর প্রবর্তিত জৈন ধর্মেও উপবাসব্রত পালনের প্রচলন রয়েছে। এছাড়া প্রাচীন স্ক্যানডিনেভিয়া অঞ্চল, প্রাচ্য অঞ্চল, চীন ও তিব্বতের সভ্য মানুষ রোজা পালন করতেন। সভ্যতার ইতিহাসে খ্যাতিমান চিকিৎসক পেরিক্লাস ও হিপোক্রাটস বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় আগত রোগীদের চিকিৎসা বিধানে রোজা পালনের নির্দেশ দিতেন। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার জন্মলগ্ন থেকেই রোজ বা উপবাসব্রতকে চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। পিথাগোরাস পর্যায়ক্রমে ৪০ দিন রোজ বা উপবাস পালন করতেন এবং তিনি তার ছাত্রদেরও অনুরূপ আদেশ দেন। ছাত্রদের তার ক্লাসে প্রবেশের আগে রোজা পালন করতে হতো। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস ও প্লেটো ১০ দিন রোজা বা উপবাস পালন করতেন।

প্লুটার্ককের রোজা বা উপবাস ছিল একদিনের। ইহুদীরা ও একি ভাবে রোজা পালন করে থাকে- তা হলে এ থেকেই বুজা যায় রোজা রাখা পবিত্র ধর্মীয় বাধ্যতা মুলক আদেশ বাদেও- একজন মানুষের স্বাস্থ্য, সামাজিক , সুন্দর চরিত্র ও সংযমী করে তৈরি করতে ১০০% সহায়ক।

অমৃতবাজার/সবুজ