ঢাকা, সোমবার, ২৪ জুলাই ২০১৭ | ৯ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

উন্নত আদর্শের অধিকারি মহানবী (সা.)


অমৃতবাজার ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮:০০ পিএম, ১৩ জুলাই ২০১৭, বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৮:০১ পিএম, ১৩ জুলাই ২০১৭, বৃহস্পতিবার
উন্নত আদর্শের অধিকারি মহানবী (সা.)

পৃথিবীতে মহানবী (সা.) এর আবির্ভাব মানবতার জন্য রহমত ও উত্তম চরিত্রের প্রতিবিম্বরূপে, সত্যের আলো ছড়াতে, পুণ্যের পথ দেখাতে। তার আদর্শ গ্রহণ করে রাহজান (ডাকাত) থেকে হয়ে গেল রাহবার। এ পরশমণির পরম সৌভাগ্য যারা লাভ করল, চরিত্র তাদের সুষম হলো, জীবন্ত স্বপ্ন তাদের সফল হলো। খাঁটি সোনার চেয়েও খাঁটি হলো তারা। এ স্বর্গ পুষ্পের সান্নিধ্য সৌরভ যারা পেল, বিশ্ব বাগানে তারা গোলাপের খোশবু ছড়াল। তার মহত্তম অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শের কিছৃ আলোচনা।

রাসুল (সা.) এর চরিত্র মাধুরী : মুহাম্মদ (সা.) হলেন মহান চরিত্রের অধিকারী ও আদর্শের জীবন্ত প্রতীক। জন্মের পর থেকেই তার মাঝে বিরাজ করছিল সর্বোত্তম চরিত্র মাধুরী, সর্বোত্তম আদর্শ, সর্বোত্তম মহৎ মানুষ ও সর্বোত্তম প্রতিবেশী হওয়ার মহত্তম গুণ। বাল্যকাল থেকেই তার স্বভাব ছিল কলুষতা, কর্কশতা ও অহমিকামুক্ত। অনুক্ষণ তিনি ছিলেন দায়শীল, সহানুভূতিশীল ও ঔদার্যশীল এবং নিষ্কলুষ-নির্ভেজাল সোনা। তাই তো অতি অল্প বয়সেই ‘আল আমিন’ উপাধিতে বিভূষিত হন। অধিকন্তু পরনিন্দা, অশ্লীল ও অশিষ্ট বাক্য কখনোই তার পবিত্র মুখ থেকে নিঃসৃত হয়নি।

এককথায় তিনি হলেন, সব গুণের আধার। বিশ্ববাসী সবার নিমিত্ত নমুনা ও মহান আদর্শ।
রাসুল (সা.) এর সততা : সততা উত্তম চরিত্রের পূর্বশর্ত, সততা উত্তম আদর্শ। সততার মাঝেই নিহিত আছে ইহকালীন সাফল্য ও পরকালের নাজাত। বলা বাহুল্য, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি রাসুল (সা.) হলেন সততার মূর্ত প্রতীক। যার দরুন মক্কার কাফের-মুশরেক সবার কাছে তিনি আস-সাদিক তথা সত্যবাদী নামে পরিচিত। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, মক্কার কাফের গোষ্ঠী ছিল তার ঘোরতর শত্রু। তাকে হত্যা করে ইসলামের বিলুপ্তির জন্য সদা অধীর আগ্রহে প্রহর গুনত। এতদসত্ত্বেও তাদের ধনসম্পদ গচ্ছিত রাখার সর্বাধিক বিশ্বস্ত বলে তাকেই জ্ঞান করত। সুতরাং তার সততার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেই মানুষ দলে দলে ইসলামে শামিল হয়েছিল। তাই তাঁর সততা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা একান্ত অপরিহার্য।

রাসুল (সা.) এর উদারতা : প্রিয়নবী (সা.) এর অনুপম বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ গুণ হলো উদারতা। ইসলাম আবির্ভাবের পর দুনিয়ার বুক থেকে এ গুণটি নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য বিধর্মীরা কোনো প্রচেষ্টাই বাদ রাখেনি। এমনকি প্রিয় নবীজির ওপর নৃশংস নির্যাতনও চালিয়েছে তারা। তা সত্ত্বেও সবসময় তিনি তাদের প্রতি ছিলেন উদার, ছিলেন মহৎপ্রাণ। একবার উহুদ প্রান্তরে কাফের বাহিনীর তরবারির আঘাতে হুজুর (সা.) এর পবিত্র দেহ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। বর্শার ফলা শিরস্ত্রাণ ভেদ করে মাথায় আঘাত হেনেছিল। দাঁত মোবারক শহীদ হয়েছিল। কিন্তু সেই করুণ মুহূর্তেও তিনি ঔদার্য ও ক্ষমার আদর্শ ত্যাগ করেননি। বরং কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে এ বলে দোয়া করলেন, ‘হে রাব্বুল আলামিন! ওদের ক্ষমা করে দাও। এরা তো অবুঝ।

রাসুল (সা.) এর সহিষ্ণুতা : মহানবী (সা.) এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অবস্থা এমন ছিল যে, সব সাহাবায় কেরামের ধৈর্য একত্রে তার সমকক্ষ হবে না। এর একটি নমুনা হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এর বর্ণনায় পরিলক্ষিত হয়। তিনি বলেন, ‘একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিল। সাহাবিরা এ কা- দেখে রেগে-রোষে তেড়ে এলেন। রাসুল (সা.) তখন তাদের থামিয়ে বলেন, ‘তাকে তোমরা ছেড়ে দাও। যেখানে সে প্রস্রাব করেছে, তাতে পানি ঢেলে দাও। স্মরণ রেখো, তোমাদের আসানি সৃষ্টিকারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে। দুর্বিষহ বিড়ম্বনা সৃষ্টিকারী হিসেবে নয়।
(বোখারি, কিতাবুল অজু)।

রাসুল (সা.) এর বদান্যতা : বদান্যতা-দানশীলতা একটি মহৎ গুণ। এর পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিফলন মহানবী (সা.) এর মাঝেই ঘটেছিল। প্রিয়নবী (সা.) নিতান্তই দরিদ্র ও অসহায়ের মতো দিনাতিপাত করতেন। তথাপি পৃথিবীর কোনো রাজা-বাদশার দান-দক্ষিণা তার ধারে কাছে পৌঁছতে পারেনি। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ মিলে তিরমিজিতে। নবীজি (সা.) এর কাছে একবার ৯০ হাজার দিরহাম এলে তিনি একটি মাদুরের ওপর উপবেশন করে সেখান থেকে সমুদয় দিরহাম বণ্টন করে দিলেন। বণ্টন শেষ হওয়ার পরক্ষণেই এক ভিখারি এসে হাজির। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আমার কাছে এখন কিছুই নেই। তাই আমার নাম বলে কারও কাছ থেকে কিছু নিয়ে নাও। পরে আমি তা পরিশোধ করে দেব।’
(খাসায়েলে নববি)

এতিম-অসহায়দের প্রতি দয়া : রাসুল (সা.) এতিম ও অসহায়দের প্রতি অপরিসীম দয়া-অনুকম্পা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করতেন। বহু অনাথের মুখে তিনি মধুর হাসি ফুটিয়েছেন। একবার ঈদগাহে যাওয়ার পথে এতিম এক বাচ্চাকে কাঁদতে দেখে প্রিয় নবীজি তাকে আদর দিয়ে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। সব শুনে রাসুল (সা.) তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে এলেন। গোসল করিয়ে সুন্দর কাপড় পরিয়ে ঈদগাহে নিয়ে গেলেন। অতঃপর তাকে বলেন, ‘হে বৎস! আমি যদি তোমার বাবা হই, আয়েশা যদি তোমার মা হয় আর ফাতেমা যদি তোমার বোন হয়, তাহলে কি তুমি সন্তুষ্ট?’ ছেলেটি জবাব দিল হ্যাঁ, অবশ্যই। এবার তার চেহারায় আনন্দের হাসি বিকশিত হলো।

অমুসলিমদের প্রতি সদাচার : রাসুল (সা.) মুসলমান এবং ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রতি যেরূপ সদাচরণের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতেন, তদ্রুপ অমুসলিম বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গেও করতেন এবং সর্বদা তাদের প্রতি সৎ মনোভাব প্রকাশ করতেন। একবার এক ইহুদি আল্লাহর হাবিবকে মারতে এসে তার মেহমান বনে গেল। রাতে রাসুল (সা.) যথাসাধ্য আপ্যায়ন করে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু শয়ন প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করে ইহুদি লোকটি বিছানায় পায়খানা করে চলে গেল। সকালে হুজুর (সা.) তার কোনো সন্ধান পেলেন না। রাসুল (সা.) এর চেহারা মোবারক মলিন হয়ে গেল। আফসোস করে বলতে ছিলেন, ‘হায়! আমি বুঝি তার যথাসাধ্য আপ্যায়ন করতে পারিনি।’ এমনিভাবে একবার এক বেদুঈন এসে প্রিয়নবী (সা.) এর চাদর ধরে এত জোরে টানতে লাগল যে, গলায় ফাঁস লাগার উপক্রম হলো এবং জোর গলায় বলতে লাগল, ‘হে মুহাম্মদ! আমাকে কিছু দাও।’ রাসুল (সা.) তখন তার দিকে ফিরে হেসে কিছু দেয়ার নির্দেশ দিলেন। (বোখারি, মুসলিম)।

জীবজন্তুর প্রতি সদাচার : প্রিয়নবী (সা.) শুধু মানুষের প্রতিই সদাচরণ করেছেন, এমন নয়। বরং তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্ট অন্যান্য প্রাণী ও জীবজন্তুর প্রতিও সদাচরণ প্রদর্শন করতেন। একবার এক সফরে দুইজন সাহাবি একটি পাখির বাসা থেকে দুইটি পাখির ছানা নিয়ে এলেন। মা পাখিটি তার বাচ্চার সঙ্গে সঙ্গে করুণ সুরে মুক্তির আবেদন জানাতে লাগল। প্রিয়নবী এ অবস্থা দেখে বলেন, ‘পাখি ধরে কেন এই মা পাখিটাকে অধীর করে তুলেছ? বাচ্চা দুইটি ছেড়ে দাও। উভয়ে বাচ্চা দুইটি ছেড়ে দিল।’ (সিরাতুন্নবী : ৬/২৪১)।

প্রিয়নবী (সা.) হলেন সর্বাধিক উদার ও দানশীল, সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী, সমধিক অঙ্গীকার পালনকারী, সর্বাধিক নম্র-ভদ্র এবং বংশে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্ভ্রান্ত। সর্বোপরি জীবন চলার পথে প্রতিটি বাঁকে আমাদের জন্য নবীজীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ।

অমৃতবাজার/জয়

এ সম্পর্কিত আরও খবর...
Loading...