ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পর্তুগালে সফল ব্যবসায়ী বাংলাদেশি আব্দুল আলীম


নাঈম হাসান পাভেল, পর্তুগাল থেকে

প্রকাশিত: ০১:০৫ পিএম, ০৪ মে ২০১৯, শনিবার
পর্তুগালে সফল ব্যবসায়ী বাংলাদেশি আব্দুল আলীম

তরুণ উদ্যাক্তাদের জন্য দেশে ও প্রবাসে সফল বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সবসময়ই অনুকরণীয় এবং অনুপ্রেরণার আদর্শ। ইউরোপ আমেরিকার দেশে দেশে এখন শীর্ষ ধনীদের কাতারে বাংলাদেশিদের নাম রয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। পিছিয়ে নেই দক্ষিণ পশ্চিম ইউরোপের দেশ পর্তুগালের বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও। তেমনি একজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী আব্দুল আলীম। যিনি ইতিমধ্যেই পর্তুগালের অন্যতম বড় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

নিরলস পরিশ্রম, একাগ্রতা, একনিষ্ঠতায় ছোট-খাটো ব্যবসা থেকে নিজস্ব মেধা আর চেষ্টায় তার ব্যবসাকে করেন সম্প্রসারিত। রিয়েল বাংলা টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল আলীম। পর্তুগালের বাণিজ্যিক রাজধানী পোর্তো শহরে টেলিকমিউনিকেশন ও ট্যুরিজম ব্যবসা তার। যেখানে তার প্রায় ৯০ভাগ ক্রেতাই পর্তুগিজ খুচরা ব্যবসায়ীরা।

এতোকিছু এমনি এমনিই দিনে দিনে হয়ে যায়নি। এজন্য করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম আর পাড়ি দিতে হয়েছে বহু দূর্গম পথ। সম্প্রতি একান্ত আলাপকালে উঠে আসে ব্যবসায়ী আব্দুল আলীমের দীর্ঘ ৩০ বছরের প্রবাস জীবনের নানা গল্প।

ব্যবসায়ী আব্দুল আলীমের জন্ম ১৯৬৬ সালের ২১শে অক্টোবর কুষ্টিয়া সদর থানায়। শৈশব কেটেছে পাটিকাবাড়ী গ্রামে। তরুণ বয়সে নিজ এলাকার এক লোকের পরামর্শে ইরানে পাড়ি জমান। কনস্ট্রাকশনের কঠোর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। সময় পেরোতে লাগলো কিন্তু তিনি ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারছিলেন না। একদিন সকালে ভাবলেন ভিন্ন কিছু করবেন ইরান ছেড়ে যাত্রা শুরু করলেন তুরস্কের পথে। তুরস্ক পৌঁছে সেখান থেকে রাশিয়া চলে যান। অবৈধ প্রবেশের জন্য ছয় মাসের কারাভোগ করেন রাশিয়ার জেলে।

এই প্রতিবেদকের কাছে রাশিয়ার জেলে কাটানো মানবেতর সেই জীবনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে এখনো গা চমকে উঠে তার। রাশিয়ার জেলে তাকে কাঁচা মাছ খেতে দেয়া হতো, ছয়মাস ভাতের দানাও চোখে দেখেননি। রাতে যখন ঘুমাতে যেতেন গরম পানি বিছানায় ছিটিয়ে দিতো রাশিয়ান কারাগারের জেলাররা। ভালো পরার কোনো কাপড় ছিলো না। দুটো ছেঁড়া জরাজীর্ণ প্যান্ট পরে ছয়মাস সেই কারাগারে কেটেছে। কারাগারে থেকে মাঝে মাঝে অমানবিক অত্যাচারে তার মনে হতো এই জীবনের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। মনে হতো জেল থেকে যদিও ছাড়া পান হয়তো একবছরও তিনি বেঁচে থাকবেন না। এতটাই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্তিতি ছিলো সেখানে।

ছয় মাস পরে জেল থেকে মুক্তি পেলেন ধীরে ধীরে জেলের কংকটময় সময় পিছনে ফেলে তিনি নতুন করে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলেন। জেলের কঠিন সময় আর পুরনো সেই কষ্টের অভিজ্ঞতায় তিনি জীবনে নতুন করে সংগ্রাম করার প্রত্যয় পেলেন।

রাশিয়া থেকে গন্তব্য এবার ইউক্রেন কিন্তু অভাগা সেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। যাত্রাপথে ছিনতাইকারী সব নিয়ে গেলেন যা কিছু শেষ সম্বল ছিলো। পথে বেশ অসহায় হয়ে পড়লেন। এরপর এক দালাল চক্রের সাথে ৯৬ ঘন্টা লরিতে পার করে জার্মানিতে পৌঁছান। রাজনৈতিক আশ্রয়ে জার্মানিতে অবস্থান শুরু করেন। জর্মানিতে ফুল বিক্রি করে জীবন আহরণ করেছেন তিনি। জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাখ্যাত হলো এরপরে পাড়ি জমালেন দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের দেশ পর্তুগালে। এখানে ছোট একটি বাংলাদেশি কমিউনিটি ছিলো। লিসবনে এসে পৌঁছালেন, তেমন পরিচিত কেউ ছিলো না, তেমন কারো কোনো সহযোগিতা পাননি! অর্থ সংকটে সে সময় লিসবনে চারজন বাঙালিসহ টয়লেটে রাত কাটাতে হয়েছিলো তাকে। এমনই কঠিন সময়গুলোর বর্ণনায় ব্যবসায়ী আব্দুল আলীম।

যতো দিন যায় সংগ্রাম ততো কঠিন হতে থাকে। ভাবলেন কিছু একটা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে তাই ঘরে বসে খেলনা সামগ্রি বানাতে শুরু করলেন এবং সেগুলো বিক্রি করে ব্যায় মিটাতেন। এক্সপো-৯৮ তে কনস্ট্রাকশনের কাজ করেছেন। লিসবন ছেড়ে এলেন পোর্তো শহরে গায়া নামের একটি জায়গায় কনস্টাকশনের কাজ করতেন। পরে ১৯৯৯ সালে পেলেন পর্তুগিজ রেসিডেন্স। এরপর একটু ভিন্ন কিছু ভাবতে লাগলেন। মাথায় চাপলো ভিন্ন ধারণা। মনস্থির করলেন ব্যবসা করবেন। রোজ সকালে বেরিয়ে পড়তেন রাস্তায়। দূর দুরান্ত হেঁটেছেন শহর থেকে শহরে ব্যবসা করার জন্য দোকান খুঁজে বেরিয়েছেন।

এরই মধ্যে পৌঁছলেন গিমারাইস নামের একটি জায়গায়। এটি পর্তুগালের প্রথম রাজধানী। ভাগ্যক্রমে গিমারাইসে একটি দোকান খুঁজে পান। এবং সেখানে প্রথম ব্যবসা করার মনস্থির করেন। ফুল বিক্রি আর কনস্ট্রাকশনে কাজ করে জমানো মূলধন ১৩ হাজার ইউরো। ছোট ব্যবসা শুরু করলেন একটি মোবাইল সপ দিয়ে। চাইনিজ ব্যবসায়ীরা সেখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো। সময়ের সাথে তার ব্যবসায়ের সুনাম ছড়িয়ে যেতে লাগলো। এক সময় ৪০-৫০ কি. মি. দূর থেকে পর্তুগিজ ক্রেতারা আসতো তার দোকানে। ব্যবসা শুরু করার ছয় মাস না যেতেই গুমারেইসে আরো চারটি দোকান ক্রয় করলেন। গিমারাইসে প্রথম বাংলাদেশি তিনিই। এরপর পোর্তো শহরে চালু করলেন পর্যটন ও খেলাধুলার সামগ্রি বিক্রি করার একটি পাইকারি সপ। এক বছর না যেতেই সেখান থেকে আয় করলেন মিলিয়ন ইউরো। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ করতে লাগলেন তিনি।

পোর্তোর শিল্প জোনে যাত্রা শুরু করেছেন রিয়েল বাংলা টেলিকমিউনিকেশন নামের একটি কোম্পানি। চায়না থেকে মোবাইল সামগ্রি কোম্পানির ট্যাগ ও সিলসহ পর্তুগালে আসে। সময়ের সাথে সাথে পোর্তো শহরের টেলিকমিউকেশন ইন্ডাস্ট্রিতে স্থানীয় পাইকারদের কাছে রিয়েল বাংলা টেলিকমিউনিকেশন হয়ে উঠলো একমাত্র গন্তব্য। আর ধীরে ধীরে বদলে গেলো ব্যবসায়ী আব্দুল আলীমের গল্প। পোর্তোর টেলিকমিউনিকেশন ইন্ডাস্ট্রিতে আব্দুল আলীম এখন প্রতিষ্ঠিত এক নাম। যার ক্রেতাদের প্রায় ৯০ভাগই স্থানীয় পর্তুগিজ।

দেশে এবং প্রবাসের তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে কিছু পরামর্শ চাইলে আব্দুল আলীম বলেন, মানুষের কারো উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত না। জীবনে বহু প্রতিবন্ধকতা আসবে, কিন্তু সে সবকে আমলে না নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ব্রত থাকতে হবে। কোনো কিছু শুরু করলে মাঝপথে থেমে না গিয়ে তার শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে। স্বপ্ন থাকা চাই, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে লেগে থাকার মানসিকতা জরুরি। আর একটা কথা ব্যবসা করতে গেলে ‘নো কম্প্রোমাইজ’ নীতিতে থাকতে হবে। আর রিস্ক নেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।

ব্যবসা স্বাধীন একটি ক্ষেত্র। অন্যের হয়ে কাজ করার চেয়ে নিজের ব্যবস্যা গড়ে তুললে কারো অধীনে না থেকে স্বাধীন জীবন উপভোগ করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে উদ্যোগী মনোভাব আর চেতনা থাকা জরুরি। জীবনে চলতে গেলে অনেকেই বাজে কথা বলবে, সমালোচনা করবে, হাসিঠাট্টা অবজ্ঞা করবে, তাদের প্রতি আমার উপদেশ হলো মানুষের কথায় কান দিবেন না বরং নিজের বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। যারা সমালোচনা করে তাদের ভয় হয় নতুন করে কেউ যদি তাদের সমকক্ষে চলে আসে। এটা কেউই চায় না। তাই নিজেকে ছাড়িয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। তবেই উন্নতি করতে পারবেন।

আব্দুল আলীম বলেন, ব্যবসা আমার কাছে বিদ্যার মতো। বিদ্যা মাধ্যমে আমরা অজানা কে জানি তেমনি ব্যবসায়ে প্রয়োজন যে ব্যবসা করতে যাচ্ছেন সে নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকা। ব্যবসা শুরুর আগে প্রয়োজনে সে বিষয়ে কিছুদিন কাজ করে হলেও অভিজ্ঞতা অর্জন করা জরুরি।

ব্যবসায়ী আব্দুল আলীমের ব্যবসায়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তিনি ইসলামিক মূল্যবোধে শতভাগ হালাল পন্থায় ব্যবসা পরিচালনা করেন। তিনি মনে করেন তার সফলতার পিছনে এর অবদান আছে।

ব্যবসায়ে দারুণ সফল পোর্তো শহরের ব্যবসায়ী আব্দুল আলীম সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় মানব সেবায় বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজ অব্যাহত রেখেছেন।

প্রতিবার দেশে গেলে গরিব মানুষদের জন্য তিনি ফ্রি-মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। তিনি জানান তার এলাকা কুষ্টিয়া সদরে এমন কোনো অন্ধ ব্যক্তি তার জানামতে নেই, যেখানেই তিনি খবর পান তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। নিজের এলাকার মসজিদ, মাদরাসায় সহায়তার পাশাপাশি পবিত্র রমজান মাসে তিনি ৫০০ পরিবারের জন্য রোজার পুরো মাসের খাবার প্রদান করেন।

আব্দুল আলীম মনে করেন, মানুষ টাকা উপার্জন করে নিজের জন্য পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য এছাড়াও আসে সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা। মানুষের উচিত উপার্জনের অংশ থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। দুনিয়াতে মানুষ সারাজীবন বেঁচে থাকবে না কিন্তু ভালো কাজগুলো রয়ে যায়। যেগুলো অন্য মানুষদেরও অন্যের উপকারে এগিয়ে আসতে অনুপ্রেরণা যোগায়।

পরিশ্রমই এনে দেয় সফলতা। পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সফল হতে হলে প্রথমে দরকার সততা। তারপর সঠিক লক্ষ্য এবং তা বাস্তবায়ন করার স্পৃহা ও কঠোর পরিশ্রম। প্রবাসে এবং দেশে তরুণ উদ্যােক্তাদের জন্য তাই ব্যবসায়ী আব্দুল আলীমের দীর্ঘ সংগ্রামী, পরিশ্রমী জীবন উদহারণ হয়ে থাকবে।

অমৃতবাজার/আরএইচ