ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টিতে বাংলাদেশের মাহমুদ


পর্তুগাল প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৯:০৭ পিএম, ২৪ নভেম্বর ২০১৮, শনিবার
অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টিতে বাংলাদেশের মাহমুদ

বিদেশে মূলধারার রাজনীতিতে ক্রমেই বাড়ছে বাংলাদেশিদের পদচারণা। বিদেশে মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশ কথাটি সামনে আসলেই ব্রিটেনের রুশনারা আলী নামটি বেশ জেরোশোরে সামনে আসে। তিনিই প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশী এমপি।এরপরই নির্বাচক হন টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক, রুপা হক। এছাড়াও বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন আরো অনেকেই। শুধুমাত্র ব্রিটেন নয় বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্টে বর্তমানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। ক্রমেই মূলধারার রাজনীতিতে বাড়ছে বাংলাদেশি প্রজন্মের অংশগ্রহণ।

তেমনই এক তরুণ রাজনীতিবীদ মাহমুদুর রহমান। অস্ট্রিয়ান মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। সম্প্রতি একান্ত আলাপকালে মাহমুদুর রহমান জানান তার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া এবং অস্ট্রিয়ান রাজনীতির নানা কথা। সাক্ষাতকার নিয়েছেন নাঈম হাসান পাভেল।

বাংলাদেশের বিষ্ময় বালক মাহমুদুর রহমান। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জন্ম হলেও মাত্র একবছর পর পরিবারের সাথে বাংলাদেশে চলে আসেন। এখানে কাটে ১০ বছর। এরপর আবারো অস্ট্রিয়ায় যাত্রা। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিবেশ দশ বছর পর এসে মাহমুদুর রহমানের জন্য কঠিন অনেকগুলো চ্যালেন্জের অন্যতম চ্যালেন্জ নতুন একটি ভাষা, ভিন্ন সহপাঠী, ভিন্ন পরিবেশ। বলতে যতো কঠিন মাহমুদের জন্য যেন ততো সহজ ছিলো। দ্রুত আয়ত্ব করে নেন অস্ট্রিয়ান ভাষা। হাইস্কুল শেষ করে মাহমুদ সরকারি টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে সুযোগ পান। সেখানে নিজেকে ভিন্ন মাহমুদ হিসেবে আবিষ্কার করেন। স্কুলে মাল্টিকাচারাল পরিবেশে পড়াশুনার পাশাপাশি মাহমুদ তার আশপাশের সমস্যাগুলো নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেন। স্কুলের যেকোনো সমস্যা নিয়ে তিনি সমাধানের কথা বলতেন, পরিবর্তন চাইতেন এবং উন্নয়নে নজর দিতেন। এতে করে সময়ের সাথে সাথে সেই সরকারী ইনস্টিটিউটের ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে ছাত্র সংসদে পর পর দুইবার সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করে। স্কুল, ইনস্টিটিউটের উন্নয়ন ও ছাত্রদের নানা বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে দিতে এক সময় মাহমুদ পুরো অল অস্ট্রিয়ান ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে মাহমুদের এমন অর্জন ছিলো গৌরবের।

ইনষ্টিটিউটে পড়া শেষে মাহমুদ উচ্চ শিক্ষায় পাড়ি দেন ব্রিটেনে। আইটি বিষয়ে পড়ার তীব্র আগ্রহ থেকে ব্যাচেলর প্রোগ্রামে ভর্তি হলেন ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ারে। আইটি বিষয়ে ব্যাচেলর স্টাডি শেষে এমএসসি শেষ করেন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিষয়ে।

তখন ২০১৫ সাল উচ্চশিক্ষা গ্রহণে মাহমুদ অবস্থান করছিলেন ব্রিটেনে। সেখানে অবস্থান করলেও অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টির যুব ইউনিটের সাথে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি যখন ব্রিটেনের ল্যাঙ্কাশায়ারে অধ্যয়নরত তখনই প্রথমবারের মতো পিপলস পার্টি থেকে তার জন্য একটি বার্তা আসে। ভিয়েনা সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে ভিয়েনা ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলর হিসেবে মনোনয়ন পান মাহমুদুর রহমান। অপ্রস্তুত মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নের ফাঁকে সময় করে এসে নির্বাচনে অংশ নেন। সেবার তিনি নির্বাচিত হতে পারেননি। তবে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন ও পরবর্তী সময়ে বিপুল সংখ্যক তরুণদের তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন। তার আশপাশের নানা ইস্যু নিয়ে ব্যাপক পরিবর্তনের ডাক দেন। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তিনি দাবি আদায়ে সমর্থ হন আর এতে করে তিনি পিপলস পার্টির তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে অনন্য হয়ে উঠেন।

অস্ট্রিয়ান তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সিবাস্তিয়ান ক্রুজ পিপলস পার্টির তরুণ নেতৃত্ব মাহমুদুর রহমানকে অস্ট্রিয়ান ইন্ট্রিগ্রেশন এম্বাসেডর হওয়ার জন্য প্রস্তাব দেন মাহমুদ সেটি সাদরে গ্রহণ করেন। এখনো পর্যন্ত তিনি বহাল রয়েছেন।

তরুণ মাহমুদুর রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চমকটি হাজির হয় ২০১৭ সালে। অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় অস্ট্রিয়ান জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টির ভিয়েনা ডিস্ট্রিক্টের প্রধান ভিয়েনা ডিস্ট্রিক্ট ২৩ নম্বর আসন থেকে মাহমুদের এমপি পদে মনোনয়ন দিতে মাহমুদের নাম প্রস্তাব করেন। সেন্ট্রাল নমিনেশন বোর্ড মাহমুদুর রহমানকে এমপি পদে চুড়ান্ত মনোনয়ন দেয়।

অক্টোবরের সেই নির্বাচনে মাহমুদুর রহমান বর্তমান বিরোধীদল স্যোসাল ডেমোক্রেট পার্টির প্রার্থীর কাছে মাত্র ৩০০০ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। কিন্তু তার দল অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টি ৩১ বছর বয়সী সাবাস্তিয়ান ক্রুজের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসে। মাহমুদুর রহমান নির্বাচিত হতে পারেননি তবুও ২২ বছর বয়সে মনোনয়ন সেটাও বিরাট চমক ছিলো। জিতলে হয়তো নতুন ইতিহাস হতো, অস্ট্রিয়ান সংসদেও পৌঁছে যেতো বাংলার প্রতিনিধি।

মাহমুদুর রহমান নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অস্ট্রিয়ান তরুণদের আরো বেশী পরিমাণে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন। তরুণদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা, তরুণদের মাঝে রাজনৈতিক ধারণা আরো পরিষ্কার করতে মাহমুদ রাজনৈতিক বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে অংশ নেন, রাজনীতিতে তরুণদের অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি জানান। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টির অন্যতম ইউনিট অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টি যুব ইউনিটের রাজধানী ভিয়েনা শাখার সভাপতি হিসেবে মনোনীত হন বাংলাদেশী বিষ্ময় বালক মাহমুদুর রহমান।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা হিসেবে মাহমুদুর রহমানের ইচ্ছে ২০২০ সালে তিনি আবারো পিপলস পার্টি থেকে ভিয়েনা সিটি নির্বাচনে ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার হিসেবে নির্বাচন করবেন। আর এমপি পদে নির্বাচন প্রশ্নে মাহমুদ জানান, সেটি নির্ভর করছে দলের সেন্ট্রাল মনোনয়ন বোর্ডের উপর। তবে সুযোগ পেলে তিনি আবারো নির্বাচন করতে চান। 

এমপি ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়ে মাহমুদুর রহমান একবার একটি ইনস্টিটিউটে তার অস্ট্রিয়ান জীবন সম্পর্কে বলেন, সেখানে অস্ট্রিয়ান এক ছাত্র তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন "মাহমুদ তোমার মতো যদি সবাই ডেডিগেটেড হতো তাহলে আজ ইন্ট্রিগেশন নিয়ে আমাদের আর কোনো আলোচনা থাকতো না। সেদিনের ক্যাম্পেইনে প্রধানমন্ত্রী সাবাস্তিয়ান ক্রুজ অংশ নিলেও উপস্থিত সবার বেশী নজর এবং প্রশ্ন ছিলো মাহমুদুর রহমানের কাছে।

প্রবাসে থাকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে বেড়ে ওঠা তরুণদের নিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশী তরুণরা নিজেদের কমিউনিটিতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটিতে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরী। স্থানীয় কমিউনিটিতে সম্পৃক্ত হয়ে সেদেশের ভাষা, সংস্কৃতি জানা। এছাড়াও স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক ও খেলাধুলা বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরী।

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের গতানুগতিক রাজনীতিতে আমুল পরিবর্তন আনতে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদগুলোতে তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনীতিতে সুযোগ করে দিতে হবে। নতুন ব্যবসা এবং চাকরীর প্রবেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতি মুক্ত করা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও গতানুগতিক পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে বাইরে এসে জনগণের জন্য রাজনীতি হতে হবে।

অমৃতবাজার/পাভেল/শাওন