ঢাকা, সোমবার, ০১ জুন ২০২০ | ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

হুজুকে মাতাল বাঙালি, আমরা আর সচেতন হবো কবে?


এম আলমগীর হোসেন

প্রকাশিত: ০৪:১৪ পিএম, ২৭ এপ্রিল ২০২০, সোমবার | আপডেট: ০৪:৪২ পিএম, ২৭ এপ্রিল ২০২০, সোমবার
হুজুকে মাতাল বাঙালি, আমরা আর সচেতন হবো কবে?

 

হুজুকে মাতাল বাঙালি, আমরা আর সচেতন হবো কবে? কথাটা বারবার মনে পড়ছে। কথায় বলে, নিজের ভাল পাগলেও বোঝে কিন্তু আমরা কেন বুঝছি না! সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের প্রকোপে সারা বিশ্ব নাজেহাল অবস্থা। ২১০ টি দেশে ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা আজ পর্যন্ত (২৭ এপ্রিল ) ৩০ লক্ষ ৩ হাজার ৮৮৯ জন, মৃতের সংখ্যা ২ লক্ষ ৭ হাজার ১০৩ জন, সুস্থ মানুষের সংখ্যা ৮ লক্ষ ৮২ হাজার ৬৭৭ জন। বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্য দেশের তুলনায় আমাদের মৃতের হার অনেক বেশী।

২৭ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, দেশে ৫ হাজার ৯১৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে ১৫২ জন। সুস্থ হয়েছেন মাত্র ১৩১ জন। ৬৪ টি জেলার মধ্যে ৫৯ টি জেলায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। 

সরকার করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করলেও দেশের মানুষ কোনভাবেই আইন মানছে না। ইতালী, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানী, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস,অষ্ট্রিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, পর্তুগালের মত বড় বড় রাষ্ট্রগুলো মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারছে না।জায়গা সংকটের কারণে হাসপাতালে রোগী জায়গা দিতে পারছে না। সেই দেশগুলোর মানুষ হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ইতালী, যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্ট অন্যান্য রাজ্য বা দেশের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে। উপরওয়ালার কাছে সপে দিচ্ছে তাদের ভবিষ্যাৎ। মক্কা, মদিনার সব মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উমরা হজ্জ্ব বন্ধ করা হয়েছে।

১৪৪ ধারা জারি হয়েছে মক্কা ও মদিনা শহরে। তারাবির ও ওয়াক্ত নামাজ বাড়িতে আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইরানে আযানের ধ্বনির সাথে আর একটি কথা যুক্ত করা হয়েছে। যার বাংলা অর্থ তোমরা বাড়িতে সালাত আদায় করো। মালেশিয়ায় ঘর থেকে বের হলেই এক হাজার রিংগিট জরিমানা। সারা পৃথিবী লকডাউন করা হয়েছে। কোন মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ নেই। মুখ দেখাদেখি নেই। চারিদিকে শুধু মৃত্যুর জয়গান। মানুষের মাঝে করুণ আর্তনাথ আর হাহাকার। দিশা হারিয়ে ফেলছে উন্নত রাষ্ট্রগুলো। সেখানে আমরা বাঙ্গালী আমাদের মনে লেগেছে ঈদ আনন্দ এবং উৎসবের ইমেজ। কোন আইন তাদেরকে ঘরে রাখতে পারছে না।

করোনা প্রতিরোধের জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের কিছু কিছু জেলা ও অঞ্চল লকডাউন করা হয়েছে। সকল সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষনা করা হয়েছে। প্রত্যেক নাগরিক যাতে নিজ ঘরে বসে করোনা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয় সে জন্য। কিন্তু আমরা কি দেখছি! ছুটি ঘোষনার সাথে সাথে বাস টার্মিনাল, ট্রেনের টিকিট কাউন্টার, ফেরিঘাট সহ সর্বত্রই ঈদের ছুটিতে যেমন সবাই বাড়ি ফেরে, তেমনি বাড়ি ফিরতে শুরু করল। একটি ফেরিঘাটের ভিডিও দেখে হতবাক হয়েছিলাম। সম্প্রতি ব্রাক্ষ¥বাড়িয়ার দুটি জানাযার নামাজ আমাকে রীতিমত হতাশায় ফেলে দিয়েছে। তাছাড়া শ্রমিকদের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন করার খবরও দেখা যাচ্ছে।

করোনা প্রতিরোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনী মাঠে কাজ করছে। সকল বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা প্রশাসন মাঠে রাত-দিন কাজ করছে। ডাক্টাররা নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে, নিজের এবং পরিবারের মানুষের ঝুকিতে রেখে নিরর্লসভাবে পরিশ্রম করছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারন মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মাইকিং, ব্যানার ফেস্টুন ও লিফলেট বিতরণ, আর্মি ও পুলিশ সাথে নিয়ে জনসমাগম এড়ানো ও দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখার জন্য নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, সরকার প্রদত্ত চাউল, আলু, মুসুরির ডাল ও সাবান গরীব ও দুস্থ মানুষের বাড়িতে পৌছে দেয়া, বিভিন্ন হাট-বাজার ও রাস্তায় জীবাণুনাশক ব্রিচিং পাউডার স্প্রে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জনসমাগম এড়ানোর জন্য যে জায়গা থেকে যখনই মোবাইল আসছে, তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। এত পদক্ষেপ নেয়ার একটিই কারণ করোনা প্রতিরোধ করা। করোনা এমন এক মরণ ভাইরাস, যার প্রতিষেধক ঔষধ বা টিকা এখন আবিস্কার হয়নি। সবেমাত্র বিজ্ঞানী চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে ১/২ জনের শরীরে দেয়া হয়েছে। এ ভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র ঔষধ, সবাইকে ঘরে থাকা, নিরাপদে থাকা, হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা। কিন্তু সরকার কেন এবং কাদের জন্য এত ব্যবস্থা করছে? আমরা তার কতটুকু মূল্যায়ন করছি বা মানছি! শহর কি গ্রাম সব জায়গার চিত্র একই রকম। সকল বাজারে ব্যাপক জনসমাগম। প্রশাসনের কোন কথাকে গুরত্ব দিচ্ছে মানুষ। কারণে-অকারণে নানা অজুহাতে ঘরের বাইরে যাচ্ছে। বিভিন্ন দোকানে আড্ডা দিচ্ছে।

যশোর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০/৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাঁকড়া বাজার। ঝিকরগাছা উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। কিন্তু সরকারের এত কড়াকড় নিয়ম বা নিষেধ থাকার পরও বাজার ছিল চরম রমরমা। কাঁচা বাজার, মাছ বাজার, ইজিবাইক ষ্ট্যান্ড, ভ্যান ষ্ট্যান্ড সহ সমস্ত বাজার ছিল লোকেলোকারণ্য। মানুষ দেখে মনেই হয়নি সারা বিশ্বে মহামারি করোনা ভাইরাসের মৃত্যুর মিছিল চলছে। সরকার দেশ সরকার মানুষকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে! আর্মি, বিজিপি, পুলিশ জনগণের ঘরে থাকার জন্য কড়া টহল দিচ্ছে এবং মাঝে মাঝে মারপিট করছে!

খবর সংগ্রহ এবং বাজারের সার্বিক অবস্থা এবং জনসমাগম কেমন হচ্ছে সেটা দেখার জন্য গিয়েছিলাম বাঁকড়া বাজারে। এমন সময় চারিদিকে দোকানেগুলোতে সার্টার টানার শব্দ। হঠ্যাৎ এমন শব্দ শুনে কি হলো জানার চেষ্টা করছি। তখন একজন বললো, আর্মি আসছে, তাই সবাই দোকানপাট বন্ধ করছে। যে যার মত জায়গায় পলানোর চেষ্টা করছে। মূহুর্তের মধ্যে সারা বাজারের হাজার হাজার মানুষ আর দোকানীরা পলাতক। কিছুক্ষণের মধ্যেই আর্মি পুলিশ আসলো, সারা বাজার ঘুরে গেল। একাবেরই একটি লকডাউন বাজার বাঁকড়া। কোন লোক সমাগম নেই। প্রয়োজনীয় দোকানগুলো ছাড়া কোন কিছুই খোলা নেই। আমরা যেন সভ্য একটি জাতি। একটি সুন্দর ও সভ্য জাতির বাঁকড়া বাজার দেখে আর্মি পুলিশ চলে গেল। ১০ মিনিটের মধ্যে বাঁকড়া বাজার আবার পুরানোরুপে ফিরে গেল। হাজার হাজার লোক আর শ,শ দোকানদার আবার দোকান খুললো। বিভিন্ন সময়ে এলাকার নায়ড়া, উলাকোল, শিত্তরদাহ, সোনাকুড়,মাটিকোমরা সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ফোন আসছে। এ সব বাজারগুলোতে লোক সমাগম কোনভাবেই কমানো যাচ্ছে না। সন্ধ্যা হলেই চায়ের দোকান এবং গ্রামের মুদি দোকানগুলোতে বসছে আড্ডা। তাদের দেখে মনে হয় না আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুবরণ করেছে ১৪৫ জন এবং আক্রান্ত পাওয়া গেছে ৫ হাজার ৪১৬ জন। এটাই অসচেতন বাঙ্গালী আমরা!!

আমরা এখন সভ্য সমাজে এবং ডিজিটাল যুগে বাস করছি। সম্প্রতি কয়েকটি বিষয় মনে পড়ে গেল। এই কয়েকদিন আগের কথা- পদ্মাসেতুর তৈরির জন্য শিশুদের মাথা লাগবে। তাই সারা দেশে ছেলেধরা ছড়িয়ে পড়েছে। এমন গুজবে গ্রাম এলাকার মানুষ রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। রাত জেগে গ্রাম পাহারা দেয়া এবং প্রতিদিন ছায়ার পেছনে ছেলে ধরা বলে দৌড়াদৌড়ি- সে কি এক আতংক!! যাদের ছোট বাচ্ছা ছিল তারা বাচ্চা কোলে নিয়ে বাইরে যেত বা একজনকে পাহারা দিতে রেখে বাইরে যেত। এই ছেলে ধরা গুজবে সারা দেশে ১৪ জন মানুষের প্রাণ গিয়েছিল আর মার খেয়েছিল পাগল আর ভিক্ষকরা। তার কয়েকদিন আগে ভোরবেলা একর পর এক ফোন আসা শুরু করল। বিষয় কি? কে যেন স্বপ্নে দেখেছে, বাঁশ বাগানে গিয়ে বাঁশের রস খেলে সকল রোগ ভাল হয়ে যাচ্ছে। ফোন কলে অতিষ্ঠ হয়ে বাড়ির পাশে বাঁশ বাগানে তাকিয়ে দেখি লাইটের আলোই আলোকিত সারা বাঁশ বাগান। কারও কোন রোগ ভাল হয়েছে কিনা তা পরে আর জানা যায়নি। এমন করে লবণ গুজব, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখতে পাওয়ার মত গুজবকে আমরা বিশ্বাস করি।

এইতো দু-চারদিন আগের কথা, এক ভাইপো ফোন করে বলে- চাচু শুনেছেন, রংপুর এলাকায় একটি শিশু জন্ম নিয়েই কথা বলেছে। সে বলেছে- থানকুনির পাতা, আদা, কালোজিরা, মধু খেলে করোনা হবে না। আমি খেয়ে নিয়েছি!!! পরে সোস্যাল মিডিয়া এমন ধরণের অনেক পোষ্টও চোখে পড়েছে। ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির অনেক নজির আমাদের দেশে আছে। রামু ও ভোলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই করোনা ভাইরাস নিয়ে লোক সমাগম কমানোর জন্য সারা বিশ্ব মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ হয়েছে। এমন কি ইসলামের ধারক-বাহক দেশ সৌদি আরব, ইরান, ইরাক সহ মুসলিম দেশ গুলোতেও। কিন্তু বাংলাদেশের মসজিদ গুলোতে এক সঙ্গে নামাজ পড়ার বিষয়টি নিরুৎসাহিত করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে খুব দ্রুত বিরুপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। একদল মানুষ প্রচার শুরু করে মরতে হলে মসজিদের মধ্যে মরবো। নামাজ পড়েই মরবো। তবুও মসজিদ বন্ধ হতে দেব না। আসলে কি মসজিদ বন্ধের কোন ঘোষনা সরকার দিয়েছে? মূলত সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে মসজিদে এক সঙ্গে ওয়াক্ত ও তারাবির নামাজ আদায়ের জন্য অল্প লোক রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

বিশ্বের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যখন কোন মহামারি বা দূর্যোগ দেখা দেয় তখন সেই দেশের ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য শিথিল করে দেয়। মানুষকে দান করে এবং মানুষের পাশে দাড়ায় কিন্তু আমাদের দেশে হয় তার সম্পূর্ণ উল্টো। করোনার আসার পর বাজারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হেক্সাসল, মাক্স, স্যাভলন, ডিটল সহ প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র মার্কেট আউট। দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে গেছে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসন লাগাতে হচ্ছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জিনিষের দাম বাড়ানো হচ্ছে। গানে শুনেছি এবং বইতে পড়েছি- “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য” কিন্তু বাঙ্গালীর সকল বিষয় বিবেচনা করে মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে আমরা কতটুকু মানুষ হতে পেরেছি!!! হুজুকে মাতাল বাঙ্গালী আর কবে দেশ ও জাতির কথা ভেবে সভ্য হবে। করোনা ভাইরাসের মত ভাইরাসকে প্রতিরোধ করার জন্য সরকারের নির্দেশনা মানবো! এ জন্যই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, হে বঙ্গজননী, সাড়ে সাত কোটি জনতাকে বাঙ্গালী করেছো, মানুষ করোনি।

পরিশেষে এতটুকু বলি, সরকারী নির্দেশ মেনে বিশ্বের অনেক দেশ আজ করোনা প্রতিরোধে সুফল পেয়েছে। তাই আসুন আমরা সবাই দেশের কাজে, দেশের দূর্দিনে, দেশের মহামারিতে এক সাথে কাজ করি। সরকারের কাজে সহযোগিতা করি। সবাই সচেতন হই। ঘরে থাকি, সুস্থ থাকি এবং সবাইকে সুস্থ রাখি।

লেখক: শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী