ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০ | ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের করণীয়


সানজিদা আফরোজ

প্রকাশিত: ১০:৪৮ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০২০, বুধবার | আপডেট: ১০:৪৯ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০২০, বুধবার
করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের করণীয় সানজিদা আফরোজ

আজ বুধবার (২২ এপ্রিল) সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে ২৫ লাখ ৮০ হাজার ১১৮ জনের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এ বৈশ্বিক মহামারিতে মারা গেছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৩ জন ও সুস্থ হয়েছে ৭ লাখ ৫ হাজার ১৪১ জন। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩৭৭২ জন, মৃতের সংখ্যা ১২৯ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ৯২ জন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা করোনা ভাইরাস নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছে `বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তিন মাস আগেই এ সতর্কতা জারি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ডেইলি মেইল। এছাড়া অষ্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দাবি করেছে `করোনাভাইরাস সর্বোচ্চ সংক্রমণ ঘটালে বিশ্বজুড়ে অন্তত দেড় কোটি মানুষ প্রাণ হারাতে পারে`।

সম্প্রতি বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে একটি ভয়াবহ পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া এক অভ্যন্তরীণ স্মারক নথিতে সতর্কতামূলক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের কারনে সর্বোচ্চ ২০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে`। বাংলাদেশের এরূপ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একটি আশার বাণী শোনা যায় গাজীপুরের ডুয়েটের গবেষকদের কাছ থেকে।

তারা বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করা সম্ভব যদি সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেয়, সেই অনুযায়ী জনগণ মেনে চলে এবং কাজ করে।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও জনগণ সেটা মানছে না। এটার চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া গণজামায়েত।

একই ভাবে সরকার পর্যাপ্ত অনুদান দিলেও গুটিকয়েক দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তির কারনে জনগণ অনুদান পাচ্ছে না।

যেহেতু এখনো পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক আবিস্কার হয়নি, তাই এই ভাইরাসকে মোকাবেলা করার অন্যতম উপায় ` সামাজিক দূরত্ব ` বজায় রাখা। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। এরূপ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত যে সকল দেশ করোনা মোকাবেলায় ধীরে ধীরে সাফল্য অর্জন করেছে সে সকল দেশের পথ অনুসরণ করা।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে । বাংলাদেশের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের কেরালা রাজ্যও অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কেরালাকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং কেরালাকে অনুসরণ করবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার কাছ থেকে পুরো বিশ্ব শিক্ষা নিতে চাচ্ছে। এছাড়া ভিয়েতনাম, কিউবা ও করোনা মোকাবেলায় অসাধারণ সফলতা দেখিয়েছে।

মালয়েশিয়ার সাফল্যের পিছনে ২ টি কারন রয়েছে। প্রথমত, লকডাউনকে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। দ্বিতীয়ত, যথাযথ ও সুপরিকল্পিতভাবে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা। করোনা ভাইরাস যখন মালয়েশিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে তখন মালয়েশিয়ার সরকার লকডাউন ঘোষণা করে। পাশাপাশি আইন প্রনয়ণ করে যে, সকল নাগরিক লকডাউন অমান্য করবে, তাদেরকে ১ হাজার রিংগিট জরিমানা প্রদান করতে হবে। এই শাস্তির বিধান চালু করেও যখন মালয়েশিয়ার জনগণকে লকডাউন সফল করতে পারলো না। তখন মহিউদ্দিন ইয়াসিরের প্রশাসন নতুন আইন প্রনয়ণ করেন। আইনটি হলো ` রাস্তায় কেউ বের হলে নিরাপত্তা বাহিনী ধরে নিয়ে যাবে এবং সেই সঙ্গে রিমান্ডে নিয়ে যাবে। এরপর ওই ব্যক্তিকে আদালতে উপস্থাপন করা হবে এবং আদালত তাকে সুনির্দিষ্ট কারনের ভিত্তিতে ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দিবে। এছাড়া হাসপাতালগুলোকে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো হয়েছে। মালয়েশিয়ায় করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো ৫ হাজারের উপর। এর মধ্যে আড়াই হাজার মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। এক সপ্তাহ আগে মালয়েশিয়াতে প্রতিদিন ২০০ এর বেশি করোনা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। সেটা আজ শূন্যের কোঠায়। মৃত্যু হয়েছে মাত্র ৮৩ জনের। এরপর আর মৃত্যু হচ্ছে না। এটা অবশ্যই বড় ধরনের সাফল্য।

ভারতের কেরালা রাজ্যে ২০১৮ সালের দিকে নিপাহ ভাইরাসে প্রায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। কেরালা এই ভাইরাসের অভিজ্ঞতা খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে। কেরালার মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ৩ জন। ভারতের প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় উহান ফেরত এক ছাত্রীর। সেই শিক্ষার্থীর বাসা কেরালা রাজ্যে ছিলো। কেরালাতে করোনার আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০। করোনা মোকাবেলার জন্যে প্রথম থেকেই কেরালা বিমানবন্দরে সুপরিকল্পিতভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং জানুয়ারির ২৪ তারিখ থেকে জরুরি বিভাগ খুলেছে। এছাড়া ` কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং ` এর মাধ্যমে একজন করোনা আক্রান্ত রোগী কোন কোন ব্যক্তির সাথে মিশেছে সেটা নির্ধারন করার চেষ্টা করেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো কেরালাতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা বেশি। এইজন্য প্রত্যেক বিদেশ ফেরতকে আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে এবং আলাদা স্থানে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি দিনমজুর ও দরিদ্র মানুষদের রান্না করা খাবার প্রদান করছে।

যেহেতু করোনা ভাইরাসের কোন ঔষধ বা টিকা এখনো আবিষ্কার হয় নি, সামাজিক দূরত্ব হলো এই ভাইরাস মোকাবেলা করার অন্যতম মাধ্যম। তাছাড়া বাংলাদেশের মানুষ সামাজিক দূরত্ব বা সরকার কর্তৃক লকডাউন পালন করছে না। সেহেতু বাংলাদেশ যদি মালয়েশিয়া ও কেরালার মতো করোনা মোকাবেলার কঠোর আইনের মাধ্যমে লকডাউন এবং সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাহলে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা যায়। বিশেষজ্ঞরা ধারনা করেছেন, বাংলাদেশের আগামী ২/৩ মাসের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে, যদি দ্রুত কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে লকডাউন ব্যবস্থা কার্যকর হয়`।

তথ্যসূত্র :
https://www.who.int.
BBC News
https ://ww.zamzamtravelsbd.com
https://bit.ly/c4-News.
কালের কণ্ঠ
প্রথম আলো
দৈনিক ইনকিলাব

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

অমৃতবাজার/আরইউ