ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০ | ১৭ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

স্কুলে শিশুদের বেত্রাঘাত: ইসলাম কি বলে?


মাহমুদুর রহমান

প্রকাশিত: ১০:৩১ এএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার | আপডেট: ১১:০৮ এএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার
স্কুলে শিশুদের বেত্রাঘাত: ইসলাম কি বলে? ছবিটি প্রতীকি

আমার মেয়ের বয়স পাঁচ। তাকে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বেসরকারি স্কুলের আরবি শিক্ষক স্কেল দিয়ে পশ্চাদদেশে আঘাত করেছে। মিমোজার জন্মের পর এই প্রথম মার খেলো। ওই স্কুলে আমার বোনের ছেলেও পড়ে। বয়স ৭-৮ হবে। ওকেও পিটিয়েছে ওই ধর্ম শিক্ষক। এযেনো মারপিটের মহোৎসব! 

আমার দুলাভাই মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষ। তিনি যতদিন বেঁচে আছেন তার দুই সন্তানকে অনেক আদর দিয়ে যেতে চান। ছেলের শরীরে মারের দাগ তিনি সহ্য করতে পারছেন না। ছটফট করছেন। 

আমার ইমিডিয়েট বড় বোন ঢাকাস্থ আগা খান স্কুলের শিক্ষিকা। তারা শিশু ছাত্রছাত্রীদের শুধুই আদর করেন। খেলার ছলে শেখান। ওই স্কুলে কোন দুর্বল ছাত্রছাত্রী নেই। সবাই মেধাবী। মেরে পিটে পড়া মুখস্ত করিয়েতো তাদের কাউকে মেধাবী বানাতে হচ্ছে না? 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রয়াত সিরাজুল ইসলাম বড় হুজুরের জানাজায় তার ছেলের মুখে শুনেছিলাম। হুজুর ছাত্রদের মারবেন দূরের কথা কখনো তুই সম্বোধনও করেননি। হুজুর ছিলেন সত্যিকার অর্থে মানুষ গড়ার কারিগর। অসংখ্য আলেম উলামা তার হাতে তৈরি হয়েছেন। 

আসুন শিশুদের বেত্রাঘাত সম্পর্কে ইসলাম ধর্মে কি আছে জেনে নেই-

শাসনের স্বার্থে বাচ্চাদেরকে প্রহার করা ইসলামী শরিয়তে জায়েজ। কারণ ইসলাম একটি শিশুকে মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষককে অনুমোদন দিয়েছেন। চলুন শর্তগুলো মনযোগ দিয়ে পড়ি-

প্রথম শর্ত- একদম ছোট শিশুদের প্রহার করা যাবে না। মানে সেভাবে মারা যাবে না। আস্তে করে পিঠে হালকা পাতলা দিলেন ভয় দেখানোর জন্য সেটা ভিন্ন বিষয়। বেত্রাঘাত বা লাঠি দিয়ে পেটানোর যাবে না। নামায প্রসঙ্গে নবী (সাঃ) থেকে জানি, তিনি ১০ বছর বয়সে সালাত আদায় না করলে তখন প্রহার করার অনুমতি দিয়েছেন। এর নিচের বয়সি শিশুদের প্রহার করার অনুমতি দেননি। এজন্য ওলামায়ে কেরামের মতে, শিশুকে শাসনের জন্য প্রহার করতে হলেও ১০ বছরের আগে সেটা করা উচিত নয়।

দ্বিতীয় শর্ত- বাচ্চাদেরকে কোন অবস্থাতেই যেন অতিরিক্ত প্রহার করা না হয়। খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর শাসনামলে তিনি কোন কোন অঞ্চলের প্রশাসকদের কাছে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন- `শিক্ষকরা যেন কোন ছাত্রকে শাসনের স্বার্থেও তিন বারের বেশি বেত্রাঘাত না করেন। এর বেশি যদি মারেন, তাহলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে সেই শিক্ষককে।`

এবং প্রহারের মাত্রা বোঝাতে তিনি বলেন- বেত্রাঘাতের সময় হাত যেন মাথার উপর না উঠে। হাত যেন বগলের সঙ্গে লেগে থাকে। 

তৃতীয় শর্ত- কোনো অবস্থাতেই চেহারায় মারা যাবে না। এটা প্রহারকারী ব্যক্তিকে আল্লাহর কাঠগড়ার দাঁড় করে দেয়। হোক তিনি শিক্ষক কিংবা মা-বাবা। 

কারণ এব্যাপারে নবী (সাঃ) এর কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। নবী (সাঃ) বলেছেন, `তোমাদের কারো যদি কাউকে প্রহার করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে প্রহার করার সময় চেহারাটাকে বাঁচিয়ে রাখো।` হাদিসটি আবু দায়ুদে বর্ণিত হয়েছে।

চতুর্থ শর্ত- বাচ্চাদের রাগান্বিত অবস্থায় মারা যাবে না। কারণ শিশুর `অপরাধের` জন্য যতটুকু শাস্তি পাওয়া উচিত তার চেয়ে বেশি শাস্তি যদি আপনি দেন আপনার জেদ মেটানোর জন্য; তাহলে সেটা জুলুমের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত, `আল্লাহ্ সুবহানুহুতায়ালা নিজে তাঁর বান্দাদের প্রতি জুলুম করাকে নিজের জন্য হারাম করে রেখেছেন।` 

সেখানে আপনি তো সন্তানের বাবা-মা, শিক্ষক মাত্র, সৃষ্টিকর্তা নন। 

লেখক- মাহমুদুর রহমান, অনলাইন এক্টিভিস্ট

 অমৃতবাজার/এমআর