ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১১ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কোটার সংস্কারেই সম্মান নিহিত


মো: সাদ্দাম হোসেন বাগমার

প্রকাশিত: ০৮:২৫ পিএম, ২২ মার্চ ২০১৮, বৃহস্পতিবার
কোটার সংস্কারেই সম্মান নিহিত

সম্প্রতি কোটা সংস্কার নিয়ে একটি আন্দোলন তৈরি হয়েছে। সেই আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি, কোটা প্রথা সংস্কারের ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই।

স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও কোটা প্রথার সংস্কারের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, কোটা যদি পূরণ না হয়, তাহলে শূন্য পদে সাধারণ চাকরিপ্রার্থী মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়া হবে। এটাও কিন্তু কোটা সংস্কারের একটি প্রস্তাব।

এখন কথা হল, কোটা প্রথার কতটুকু সংস্কার প্রয়োজনীয়? বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ পদ সংরক্ষিত। এছাড়া নারী ও জেলা কোটা রয়েছে ১০ শতাংশ করে। তার মানে দাঁড়ায়, ৪৪ শতাংশ মেধা ভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে।

বিভিন্ন খবর থেকে যা বুঝা যায়, তা হল প্রচলিত এই কোটা প্রথার সবচেয়ে ক্ষোভের কারণ হল মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩০ শতাংশ বরাদ্ধ থাকা। আচ্ছা সেখানে বলা আছে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু এখন যে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের এই কোটার আওতায় আনা হল, সেটার কি যুক্তি আছে? মুক্তিযোদ্ধাদের কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বিধায় তাদের অধিকার সবার আগে। মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি সবাই সর্বাগ্রে অধিকার ভোগ করবে।

সে কারণে চাকরিতে আমরা কোটার ব্যবস্থা করেছি। খুবই ভাল কথা। আচ্ছা আমরা কি একবারের জন্যেও মুক্তিযোদ্ধাদের জিজ্ঞাসা করেছি যে তারা আসলে কিভাবে সম্মান পেতে চান? আর আসলেই তারা কতটুকু ভাল আছেন?

আপনি ভেবে দেখুন, আপনার নাতি-নাতনি ভাল চাকুরি করে ভাল আছে, তার সাথে আপনার ভাল থাকার সম্পর্ক কতটুকু? আমাদের সমাজেত নিজের বাবা-মাকেই পর করে দেওয়ার হাজারটা উদাহরণ আছে, সেখানে নাতি-নাতিনি কিভাবে আপনাকে ভাল রাখবে!

আরেকটি বিষয় হল, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা কি মেধাবি হয় না? এই কোটার কারণে মেধা থাকা সত্বেও অনেকেই মুখফুটে বলতে পারেনা যে সে মেধাবি। আমার কথা হচ্ছে, আমরা যদি আসলেই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতে চাই, তাহলে এমন কিছু করা উচিৎ যেটা সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা নিজে ভোগ করতে পারবেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৪৭ বছরেও যেখানে এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক কোন তালিকাই তৈরি করা সম্ভব হয়নি, সেখানে কে আসল আর কে নকল তাও বলা মুশকিল।

অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে যারা হয়ত সেই সময়টাতে সার্টিফিকেট নেয়নি। নিবেই বা কেন, তারা অনেকেই হয়ত ভাবতে পারেনি যে পরবর্তিতে এই সার্টিফিকেটই সোনার হরিণ হয়ে দেখা দিবে। আর এই কোটা সুবিধা ভোগ করতে কত কত ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার আবির্ভাব হয়েছে তার কোন হিসাব নেই। আর সেটা দেখে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাও নিশ্চয়ই ব্যথিত হন। তাই যাদের জন্যে এই সুবিধা, তাদের সবাইকে নিয়ে একটি সম্মেলন হতে পারে। সেখানে তারা এই কোটা প্রথার কতটুকু সুফল পেয়েছেন তা বলতে পারবেন। তাদের ভাল থাকার জন্য আর কি কি করা যেতে পারে সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

আমি চাই, মুক্তিযোদ্ধারা প্রকৃত অর্থেই সম্মান এবং সুখ নিয়ে বেঁচে থাকুক। তার জন্য সর্বপ্রথম দরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা। যখন প্রকৃত তালিকা হয়ে যাবে, তখন চাইলে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা অনেক বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। তাদের জন্য স্বল্পমূল্যে জমি, এপার্টমেন্ট দেওয়া যেতে পারে। যা সে নিজে এবং তার ছেলে-মেয়েরা ভোগ করতে পারবে। আর তার ছেলে-মেয়েদের জন্য লেখাপড়ার বিভিন্ন পর্যায়ে সুবিধা দেওয়াটাই শ্রেয়। সে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তির সময় সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু চাকুরির সময় মেধাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

চাকুরির ক্ষেত্রেও যদি সুবিধা দিতেই হয়, তা অবশ্যই ৩০ শতাংশের অনেক কম হওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি। কোটা প্রথার কারণে যেই সকল মেধাবিরা তাদের উপযুক্ত চাকুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে-তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ, তারা আসলেই কি মুক্তিযোদ্ধাদের মন থেকে প্রকৃত সম্মান দিতে পারবে?

আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেনি, কিন্তু সেত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী নয়।

আমিত মুক্তিযুদ্ধের সেই গর্বিত ইতিহাস আমার বাবার মুখেই শুনেছি। তিনিই তো শুনিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সেই বীর সেনাদের আত্মত্যাগের কথা।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা সবাই গর্ব করি, তাহলে কেন সেই মুক্তিযুদ্ধই (কোটা) আমাদের তরুণ সমাজের ক্ষোভের কারণ হবে? তাহলে কেন আমি চাকুরির প্রতিযোগিতায় বৈষম্যের শিকার হব? আমার বন্ধু মহলের অনেককেই দেখেছি, তার বাবা কেন মুক্তিযুদ্ধে যায়নি তা নিয়ে তার বাবকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে।

আমি আমার কথা বলছি না। আল্লাহর রহমতে এবং আপনাদের দোয়ায় আমি সম্মানজনক চাকুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছি। আলহামদুলিল্লাহ। আমি যখন হলে ছিলাম, দেখতাম কিছু বড় ভাই দিন রাত একাকার করে পড়ালেখা করত। তাদের লক্ষ একটাই সরকারি চাকুরি। কিন্তু দিন শেষে যখন ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হত-তখন অনেক হতাশার গল্পের সাক্ষী হয়ে থাকতাম। গল্পগুলো এভাবেই কালের অতল তলে হারিয়ে যায় প্রতিদিন।

এখানে সময়ের পরিবর্তনে গল্পের মানুষ পরিবর্তন হয় ঠিকই, কিন্তু সমাপ্তি প্রায় একই থাকে। তার মাঝে কেউ কেউ হয়ত পৌছে যায় কাঙ্খিত লক্ষ্যে, বাকিরা একরাশ হতাশা নিয়েই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেয়। আর আশায় থাকে তাদের পরবর্তি প্রজন্ম হয়ত নিজেদের অধরা স্বপ্নটাকে সত্যি করবে।

পরিশেষে বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝানো হয়ে থাকতে পারে। ধরুন যদি বলা হয়ে থাকে যে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের জন্য সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী আন্দোলন করছে। সেটা শুনলে নিশ্চয়ই আপনার নিজের কাছেও ভাল লাগবে না। তাই আমার কাছে মনে হয়, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল নয় বরং সংস্কার এই বিষয়টি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলা যেতে পারে।

আমি নিশ্চিত যৌক্তিক দাবি নিয়ে গেলে, তা তিনি শুনবেন। কেননা প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই নিজের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল থকবে বলেননি, বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুভূতি থেকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মত, সেই চেতনা এবং অনুভূতি আমাদেরও রয়েছে। শুধু চাওয়া একটাই সময়উপযোগি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রচলিত কোটা প্রথার সংস্কার।

সহকারী অধ্যাপক (ফলিত পরিসংখ্যান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়