ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

পরপারে ভালো থাকুন মানজারুল ইসলাম রানা


হাসনাইন মোঃ আকীফ

প্রকাশিত: ০৬:৪৬ পিএম, ১৬ মার্চ ২০১৮, শুক্রবার | আপডেট: ১২:২২ পিএম, ১৮ মার্চ ২০১৮, রোববার
পরপারে ভালো থাকুন মানজারুল ইসলাম রানা

বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দল তখন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। পরেরদিন ভারতের সাথে ম্যাচ। সবাই যখন সেই ম্যাচের অপেক্ষায় বাংলাদেশ তখন শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে পোর্ট অব স্পেনে। ঠিক তখনই দেশ থেকে উড়ে আসলো একটি দুঃসংবাদ। রানা আর নেই! মানজারুল ইসলাম রানা নিহত হয়েছেন। খবরটা প্রথম জানলেন অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। বিষয়টা হজম করতে অনেকটা সময় নিলেন। জাতীয় দলে রানার অনেক সতীর্থ, খুলনা বিভাগের হয়ে যাদের সাথে খেলতেন সেই হাবিবুল বাশার, আবদুর রাজ্জাক, সৈয়দ রাসেল, সদ্য কৈশর পার হওয়া সাকিব আল হাসান ছাড়াও রয়েছেন রানার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, রানার "ভাই" মাশরাফি বিন মর্তুজা। বাশার অজান্তেই বলে উঠলেন, "একি করলি রানা? "

রাসেল, রাজ্জাক চিৎকার করে কাঁদছেন। হোটেলের ভদ্রতা, সৌজন্যতা আর কারো মাথায় নেই। সিনিয়ররা সবাই হাউমাউ করে কাঁদছেন। ছোটরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, কী করা উচিত। রানা ভাইকে তারাও চিনত, তারাও ভালোবাসত। কিন্তু বড়দের যে ভাই মারা গেল।

‘হ্যাঁ। চুকনগরে যাচ্ছিল। মোটরসাইকেল অ্যাকসিডেন্ট করে... সুমন নিজেকে সামলে নিলেন। আবার চোখ বোলালেন, ম্যাশ কই!

মাশরাফিকে খবরটা জানালেন বাশার নিজেই। স্তব্ধ মাশরাফি কিছুই বললেন না। চলে গেলেন রুমের দিকে, হোটেল রুমের লাইট বন্ধ। সবাই তখন একটু ভয়ই পেয়ে গেছেন। সবার কাছে রানা একজন সতীর্থ, এই দুদিন আগেও জাতীয় দল মাতানো খেলোয়াড়। মাশরাফির তো ছোটবেলার বন্ধু; জাতীয় দলের সবাইও বলে-দুই ভাই।

মাশরাফি কিছু ঘটিয়ে ফেলবে না তো!

রাসেলের কাছে রুমের বাড়তি চাবি আছে। সে ছুটল চাবি নিয়ে রুমের দিকে। দরজা খুলে দেখলেন রুম অন্ধকার। মাশরাফি বিছানায় পড়ে আছেন। চোখ দুটো ফোলা। রাসেলকে আলো জ্বালাতে দেখেই হাউমাউ করে উঠলেন, ‘রাসেল রে, অন্ধকার না হলি ঘুমাতি পারত না রানা!’

দুই বন্ধু পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে ভাই হারানোর শোকে। রাসেল সেই অবস্থায়ই টের পেল মাশরাফির শরীরে প্রচন্ড জ্বর।

কিন্তু শোকে ভেঙে পড়েনি বাংলাদেশ। বরং জানিয়ে দিলো "রানার জন্যেই খেলবে বাংলাদেশ"। রানার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মাশরাফি, খুলনায় তাদের দুই ভাই বলা হতো। রানা আর কৌশিক দুই ভাই, রানা শুধু একটু কালো, কৌশিক একটু ফর্সা! ভারতের সাথে সেই ম্যাচে মাশরাফির বোলিং যারা দেখছিলেন তারা জানেন, কি ভয়ংকর বোলিং ছিলো। আর উইকেট নেবার পর আকাশের দিকে তাকিয়ে বিকট চিৎকার! পুরা দলটাই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছিলো।

রানাকে উৎসর্গ করা সেই ম্যাচে বাংলাদেশ কি করেছিলো সেটা সবাই জানেন। শুধু সেই ম্যাচেই কেন? ১৬ মার্চের আশেপাশের যেকোন ম্যাচেই বাংলাদেশ হয়ে যায় অপ্রতিরোধ্য। গত বছর যেমন ১৬ মার্চ পড়েছিলো শততম টেস্ট ম্যাচের ভেতর।

বাংলাদেশের প্রথম তারকা অলরাউন্ডার হবার সম্ভাবনা নিয়ে যার আগমন যিনি ছিলেন জাতীয় দলের প্রাণভোমরা তার ক্যারিয়ার থমকে গিয়েছিলো মাত্র ৬ টেস্ট আর ২৫ ওয়ানডে ম্যাচেই।

আজ যেই ভূমিকা সাকিব আল হাসান পালন করেন ঠিক সেই ভূমিকা পালনের জন্যেই বাংলাদেশ দলে এসেছিলেন রানা। বাহাতি স্পিন আর মিডিল ওর্ডার ব্যাটসম্যান। ছিলেন ডেভ হোয়াটমোরের আবিষ্কার। আর্ম বলের আলোচনায় আসা বাংলাদেশে রানার হাত ধরেই যদিও শুরুটা মোহাম্মদ রফিকের হাতে। ক্যারিয়ার মাত্র শুরু হয়েছিলো, মাত্র ২২ বছরেই হয়েছিলেন খুলনা বিভাগের অধিনায়ক। জীবনের শেষ প্রথম শ্রেনীর ম্যাচে বল হাতে দুই ইনিংসে ২৫/৫ এবং ১১৩/৪ ছিলো তার বোলিং ফিগার, খুলনার অধিনায়ক হিসাবে ঢাকা বিভাগের বিপক্ষে জয়ে রেখেছিলেন মূল ভূমিকা, তার আগের দুই ম্যাচে চট্টগ্রামের বিপক্ষে ১৫১ আর সিলেটের বিপক্ষে করেছিলেন ১২০ রান। শেষ ম্যাচে ৬৩ রানে অপরাজিত থেকেই দলকে জিতিয়েছিলেন খুলনার একটি স্থানীয় ম্যাচে। সেটাই শেষ ম্যাচ ছিলো কে জানতো! আব্বাসের হোটেলের চুঁই ঝালের খাসির মাংসের টানে ম্যাচ শেষে বাইকে করে দুপুরের খাবার খেতে যাচ্ছিলেন খুলনার সহ অধিনায়ক সেতুর সাথে। হঠ্যাৎ দ্রুতগতিতে একটি অ্যাম্বুলেন্স ধাক্কা দেয় রানার বাইকে। ঘটনাস্থলেই নিহত হন রানা এবং সেতু। কখনো জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাননি আর তারকা ছিলেন না বলে সেতুর মৃত্যুর বিষয়ে তেমন কোন আলোচনা বা প্রতিক্রিয়া দেখায়নি ক্রীড়াঙ্গন। কিন্তু প্রতিভাবান, সম্ভবনাময় জাতীয় দলের ক্রিকেটার হওয়ার রানার মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিলো সমগ্র বাংলাদেশকে। শোকের চাদরে যেন ঢেকে দিয়েছিলো কেউ দেশটাকে।

বেঁচে থাকলে আজ হয়তো সাকিবের মত তিনিও বড় মাপের অলরাউন্ডার হতেন। হতে পারতেন জাতীয় দলের অধিনায়ক অথবা বিপিএলে আইকন প্লেয়ার। সাকিবের প্রায় তিন বছর আগে এই রানার মাধ্যমেই প্রথম একজন ভালো মানের অল রাউন্ডারের সন্ধান পেয়েছিলো বাংলাদেশ। মানজারুল ইসলাম রানার এই মৃত্যুটা কখনোই মেনে নেয়ার মতো না, তবুও ভাগ্য বলে কথা। আজ যদি রানা বেঁচে থাকতেন হয়তো মাশরাফির মতো একজন অভিভাবক হতেন জুনিয়র প্লেয়ারদের। হয়তো মিরাজ, অপু, আফিফদের আগলে রাখতেন। হয়তো ঝুঁলিতে ৩০০ আন্তর্জাতিক উইকেট থাকতো, হয়তো সাকিবের হুট করে আসা ইনজুরিতে আত্মবিশ্বাস হারাতোনা বাংলাদেশ, রানা তো থাকতেন দলে! কত কিছুই তো হতে পারতো! কে সেরা অলরাউন্ডার সাকিব না রানা সেটা নিয়েও হয়তো তর্ক জমে উঠতো, গরম চা ঠান্ডা হয়ে যেত!

২০০৫ সালে প্রথম ক্রিকেট খেলা সরাসরি দেখেছিলাম বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। সেই সিরিজে ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলো বাংলাদেশ। ম্যাচটা ছিলো তৃতীয় ম্যাচ, জিম্বাবুয়ে ম্যাচটা প্রায় বের করেই ফেলেছিলো রান তাড়া করতে নেমে। কিন্তু মানজারুল ইসলাম রানা দ্রুত ৪ উইকেট তুলে নিলে বাংলাদেশ ম্যাচটা জিতে যায়। ৩৪/৪ ছিলো রানার ম্যাচ ফিগার এবং রানা ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়েছিলেন। পরের ম্যাচেও রানা ৪ উইকেট নিয়েছিলেন এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পর পর দুই ম্যাচে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়েছিলেন। পিছিয়ে পড়েও ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিলো বাংলাদেশ।

ডেভ হোয়াটমোরের অত্যন্ত পছন্দের ছাত্র ছিলেন রানা। ছোট্ট ক্যারিয়ারে যখনই খারাপ সময় এসেছিলো প্রতিবারই রানাকে আগলে রাখতেন ডেভ। সেই সম্পর্ক মৃত্যুর পরেও ভুলে যাননি ডেভ, যখনই এদেশে এসেছেন ছুটে গিয়েছেন রানার বাসায়। কিছুটা সময় কাটিয়েছেন রানার কবরের পাশে নীরবে।

আমাদের খুলনায় ক্রিকেট খেলার সবচেয়ে বড় মাঠ সার্কিট হাউজ মাঠ। বিভিন্ন ক্লাবের অবস্থান এই মাঠের চারপাশেই। তখন ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়ি, স্কুল থেকে সার্কিট হাউজ কাছেই। আমরা স্কুল পালিয়ে চলে যেতাম সার্কিট হাউজে। তখনই প্রথম জানলাম রানার সম্পর্কে। নেটে অনুশীলন দেখতাম। তিনি তখন উঠতি ক্রিকেটার জেলায়, জাতীয় দলের রাডারে আসেননি। কখনো অবশ্য কথা হয়নি।

সেই রানা ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম বিশ্বকাপের আগে, ফেব্রুয়ারী মাসে মিরপুরের ইনডোরের সামনে। তখন প্রাথমিক দল ঘোষনা করা হয়েছে। সেই দিনের সেই কথাই প্রথম এবং শেষ কথোপকথন আমার।

বিদেশের মাটিতে খেলা, নিয়ম অনুযায়ি স্কোয়াড দিতে হবে ১৫ জনের। হয়তো ব্যাটিং প্রত্যাশিত হচ্ছিলো না বলেই রানার বদলে অলরাউন্ডার হিসেবে নির্বাচকরা দলে রাখলেন সাকিব আল হাসানকে। সাকিব, রাজ্জাক, রফিকের পর চতুর্থ বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে রানার জায়গা হয়েছিলো না। কিন্তু রানা খুব ভালো করেই জাতীয় দলের পরিকল্পনায় ছিলেন। মোহাম্মদ রফিকের অবসরের পর রানাকেই জাতীয় দলে নিয়মিত করার ইচ্ছা ছিলো তৎকালীন নির্বাচক প্যানেলের।

কিন্তু বিধাতার ইচ্ছা যে ছিলো অন্যকিছু!

অনেকেই হয়তো জানেন না খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের কিছু অংশ পড়েছে মানজারুল ইসলাম রানাদের পারিবারিক জমির উপর, এজন্য খুলনায় বলা হয় ওইটা রানার "বাপ দাদার" স্টেডিয়াম! এখনো খুলনায় খেলা হলে টিকিট বিক্রির অর্থের একাংশ রানার পরিবারকে দেয়া হয়। ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে সিরিজের একটা ওয়ানডের পুরা টাকাই দেয়া হয়েছিলো রানার মায়ের হাতে। আছে মানজারুল ইসলাম রানা স্ট্যান্ড, এটা রানার মায়ের একমাত্র ইচ্ছা ছিলো, ছেলের নামে একটা স্ট্যান্ডের নামকরণ।

মানজারুল ইসলাম রানা টেস্ট ক্রিকেটের এমন একটি রেকর্ড দখল করে রয়েছেন যেই রেকর্ড কেউ কখনোই ভাঙতে চাইবে না। সবচেয়ে কম বয়সে পৃথিবী থেকে আউট হয়ে যাওয়া টেস্ট ব্যাটসম্যানের নাম মানজারুল ইসলাম রানা। বয়স হয়েছিলো মাত্র ২২ বছর ৩১৬ দিন।

আজ ১৬ মার্চ প্রয়াত মানজারুল ইসলাম রানার ১১-তম মৃত্যুবার্ষিকী। এখনো মেনে নিতে প্রচন্ড কষ্ট হয় যে রানা বেঁচে নেই। সদা হাস্যজ্জ্বল মানুষটা ঘুমিয়ে আছেন অন্ধকার কবরে।

মাশরাফি আর রানা দুই বন্ধু। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে জাতীয় দলে একসাথে খেলেছে। একরুমে ঘুমিয়েছেন। রুমে আলো থাকলে ঘুমাতে পারতেন না রানা। আর অন্যদিকে অন্ধকার হলে ভয়ে ঘুমাতে পারতেন না মাশরাফি। আজ মাশরাফির মনটা খুব বেশি খারাপ থাকবে। খুব বেশি।

মাশরাফি ভাই হয়তো এখন বাতি নিভিয়ে ঘুমাতে পারেন। কিন্তু রানা? রানার বাসায় আজকের সকালটা একটু অন্যভাবে শুরু হবে। রানার মা জায়নামাজে বসে একটু বেশি সময় কাটাবেন। কাঁদবেন, আফসোস করবেন। রানার ট্রফি ক্যাবিনেটে জমা ধুলো গুলো পরিষ্কার করবেন, রানার নাম লিখা জার্সিটার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকবেন, হেলমেটে হয়তো রানার ঘামের গন্ধ খুজবেন।

আচ্ছা সেদিন যদি চুইঝালের খাসির মাংস না খেতে যেতেন সেতুর সঙ্গে? অথবা ঘাতক অ্যাম্বুলেন্সটা যদি কোনভাবে সংঘর্ষ এড়াতে পারতো? বা রানার বাইকের গতিটা যদি কম থাকতো!

রানার ট্রফি ক্যাবিনেটে ধুলো জমবে, হেলমেট থেকে ঘামের গন্ধ শুকিয়ে যাবে, মানজারুল ইসলাম রানা স্ট্যান্ড হয়তো ঢেলে সাজানো হবে, বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ জিতবে, টেস্টে ডোমিনেট করবে, আরো অনেক কিছুই হবে!

শুধু, রানা ফিরবেন না। ফেরার উপায় তো নেই। তবুও রানা আছেন আমাদের মাঝে। রানাদের মৃত্যু হয় না।

মাশরাফিরা রানাদের হারিয়ে যেতে দেন না। রানা ফিরে আসেন পোর্ট অব স্পেনে, রানা ফিরে আসেন ঢাকার এশিয়া কাপে। রানা না থেকেও আছেন। রানা হয়তো আজ ফিরে আসবেন নিদাহাস ট্রফিতে, কলম্বোয় শ্রীলংকার বিপক্ষে!

আচ্ছা আজকেও কি "রানার জন্যেই খেলবে" বাংলাদেশ?

ভালো থাকবেন কাজি মানজারুল ইসলাম রানা, সৃষ্টিকর্তা আপনাকে ভালো রাখুক। সেদিন আব্বাসের চুইঝাল মাংস না খেতে গেলে কি হতো না?

পুনশ্চঃ যে কথাটা সবসময় বলি এবং ভবিষ্যতে যখনই সুযোগ পাবো বলে যাবো, রানার ৯৬ নাম্বার জার্সিটা বিসিবি পরে আর ব্যবহার করেনি, অস্ট্রেলিয়া যেমন ফিলিপ হিউজের জার্সি অবসর দিয়েছে আমি চাই বিসিবি তেমনি রানার সম্মানে ৯৬ নাম্বার জার্সিটা অবসর দিক।