ঢাকা, রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

অসাধু চক্র প্রশ্নপত্র ফাঁস করার সাহস পায় কোথায়?


অধ্যাপক ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি

প্রকাশিত: ০১:৩০ পিএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, রোববার
অসাধু চক্র প্রশ্নপত্র ফাঁস করার সাহস পায় কোথায়?

প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা আজকাল হরহামেশাই ঘটছে। প্রশ্ন হচ্ছে কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়? এমনটি হওয়ার কি কথা? হওয়ার কথা না। তাহলে গলদটা কোথায়? অনেক জায়গায়। যারা দায়িত্বশীল তারা কি সঠিক দায়িত্বটি পালন করছেন? করছেন না। অথচ সঠিকভাবে, দায়িত্বের সঙ্গে দায়িত্ব প্রতিপালন করাটাই তাদের দায়িত্ব। কারণ লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখানে জড়িত। কার কাছে, কী ধরনের মানুষের কাছে এ ধরনের দায়িত্ব থাকা উচিত? এমন মানুষদের কাছে থাকা দরকার যারা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্বটি পালন করবেন। যারা আগামীতে একটি সুন্দর দেশ গড়ে তুলবে, দেশকে নেতৃত্বে দিবে তাদের মস্তিষ্কে প্রশ্ন সৃষ্টি হয় এমন অসাধু কাজ কেন হবে। এমনটি হওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। ফলে সে ধরনের দায়িত্বশীলদের কাছেই কাজটি দিতে হবে। কারণ এটা বিবেক, আদর্শ, নীতির ও দেশপ্রেমের প্রশ্ন।

আমাদের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিব। তাদের বিবেক, শিক্ষা, প্রতিভা, দক্ষতা বিচার করব। সৎ ও নীতির প্রশ্নে আপোসহীন থাকার শিক্ষা দিব। কিন্তু সমাজের কীট হিসেবে যারা পরিচিত, তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অনৈতিক পথ অবলম্বন করবে শিক্ষার্থীরা এমনটি কারও প্রত্যাশা নয়। অনেক প্রষ্ঠিান আছে যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় না। কেন হচ্ছে না? কারণ তাদের ওই ধরনের আন্তরিক নিবেদন, ত্যাগ, সুশিক্ষা, মানবিকতা বোধ, সততার প্রতি শ্রদ্ধা আছে বলেই এমনটি হয় না।

পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি) পরীক্ষা হচ্ছে কোথায় সেখানে তো প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েও (বুয়েট) তো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় না। তাহলে প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে? পিএসসি ও বুয়েটে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হলে অন্যত্র হবে কেন? কাদের কারণে, কী উদ্দেশ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। এবং দায়িত্বগুলো কাদের হাতে আছে তা ক্ষতিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষকসহ প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যারাই জড়িত, যাচাইবাছাই সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংকট নিরসণের উপায় বের করা দরকার।

শর্টকাটে চূড়ায় পৌঁছানোর প্রবণতা সমাজে চিরকালই ছিল। যদি শর্টকাটে এ ধরনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর সুযোগ বা সম্ভাবনা না থাকে তাহলে শিক্ষার্থী, বা অসাধু, অস্বচ্ছ, অনৈতিক উপায়ে সন্তানদের সহযোগিতা করার মানসিকতা সম্পন্ন অভিভাবকেরা, যারা প্রকৃত অর্থে সন্তানদের সঠিকভাবে গড়তে চান না তারা এমনটি করে থাকেন, যা কোনোভাবে সঠিক পন্থা নয়। যারা দায়িত্বে আছেন তারা কেন মেবাধী শিক্ষার্থীদের কষ্টের কারণ হয়ে যারা শর্টকাট, অনৈতিক উপায়ে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় তাদের হাতের পুতুল হয়ে কাজ করবেন? সমাজে কিছু মানুষ আছেন যারা সব সময় স্বল্প সময়ে সবকিছু করতে চান। তারা তাদের সন্তানদেরও শর্টকাটে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে চান। এতে করে কী তারা তাদের সন্তানদের কোনো উপকার করেন? করেন না। প্রশ্নপত্র ফাঁস করার সঙ্গে জড়িত থেকে আমি আমার একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে পাস করালাম, একটা চাকরি দিলাম তাতে কি সে তার লক্ষ্যে পৌঁছে গেল? না। বরং তার ভবিষ্যৎ নষ্ট হলো।

জীবন মানে সংগ্রাম। জীবন মানে আমাকে জানতে হবে, বুঝতে হবে। সততা ও নিষ্ঠার মধ্যেই আমার জীবন তৈরি করতে হবে। এই পথ অবলম্বন না করে যদি আমি শর্টকাটে প্রশ্নপত্র পাই, শর্টকাটে পরীক্ষায় পাস করে কি কোনো দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারব? অর্পিত দায়িত্বটি কি সুনিপুন, সুচারুভাবে করতে পারব? কখনোই তা পারা যায় না। একজন মেধাহীন শিক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্র দিয়ে পাস করালে সে তো শিক্ষাজীবনই সমাপ্ত করতে পারবে না। পরবর্তীতে জীবন সংগ্রামে তো সে পিছিয়ে থাকবে। লক্ষ্যে কখনো সে পৌঁছাতে পারবে না। ব্যক্তি, রাষ্ট্র বা সমাজ কেউ অনৈতিক উপায়ে পাসকৃত ব্যক্তির কাছ থেকে ভালো কোনো সেবা পাবে না। এবং যিনি এই অসাধু কাজটির সঙ্গে জড়িত তিনিও একসময় নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে বাধ্য হবেন।

সরকার অত্যন্ত শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের উপর কোনো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নেই। দেশ ও জনগণের একটি আস্থা, নির্ভর করার জায়গা। সেই জায়গা থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয় যদি দেখা যায় তাহলে এমন কোনো শক্তি নেই যারা পার পেতে পারে। আমার মনে হয় সরকারকে এ বিষয়ে অত্যন্ত শক্ত হওয়া দরকার। জাতি ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এ জায়গাটিতে ছাড় বা আপস করার কোনো সুযোগ নেই। যে সমস্ত জায়গা ফাঁকফোঁকড় রয়েছে তা সিল করা দরকার। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়েও এ নিয়ে কিছু ভাবা দরকার। কারণ দেশ ও জাতিকে এভাবে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন আপসহীন মানুষ। আমি বিশ্বাস করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে শিক্ষা ব্যবস্থার এ অনাচার বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। কোনো ছাড় দিবেন না। তার হস্তক্ষেপে বা সকল বিবেকবান মানুষের সচেতনায় এ সমস্যার একটা সুরাহা হওয়া জরুরি।

পরিচিতি: সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)

অমৃতবাজার/মিঠু