ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

‘সন্ত্রাস দমনে চাই সচেষ্ট সমাজ ও সজাগ আর্থিক খাত’


ড. আতিউর রহমান

প্রকাশিত: ০৩:৩৬ পিএম, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, শুক্রবার
‘সন্ত্রাস দমনে চাই সচেষ্ট সমাজ ও সজাগ আর্থিক খাত’

গুলশানের একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী আক্রমণের পর দেড় বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সেই সময়টার কথা ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়।

সে রাতে যারা এই আক্রমণে নিহত হন তাদের মধ্যে দেশি-বিদেশি, নারী-পুরুষ, প্রবীণ-নবীনসহ নানা ধরনের মানুষ ছিলেন। ছিলেন একদল বিদেশি বিশেষজ্ঞ যারা আমাদের মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। জাপানি এই দলে সত্তরোর্ধ্ব এক প্রবীণও ছিলেন। অনেক দেশের মেট্রোরেল প্রতিষ্ঠার কাজে অভিজ্ঞ এই জাপানি শুধু বাংলাদেশের মানুষের কষ্ট লাঘবের আশায় এই কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। সারা দিনের কাজ শেষে রাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও খেতে গিয়েছিলেন ওই নিরিবিলি রেস্তোরাঁতে।

জাপানি ছাড়াও সেখানে ইতালির একদল ব্যবসায়ীও ছিলেন। তারা আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসারে কাজ করছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন দেশি-বিদেশি ছাত্র-ছাত্রী যারা পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত এবং গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবা-মার কাছে বেড়াতে এসেছিল। শ্রেফ আড্ডা ও রাতের ডিনার খেতে তাদের সেখানে যাওয়া। এলাকাটি বরাবরই নিরাপদ ও নিরিবিলি বলে তারা সবাই এখানে জড়ো হয়েছিলেন। তখন পর্যন্ত কারও মনেই এই আশঙ্কা ছিল না যে এমন পরিবেশে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে পারে।

অথচ যা কেউ কল্পনা করেনি তাই সে রাতে ঘটল। বিদেশি অতিথিদের সাদরে গ্রহণ করার যে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য আমরা গড়ে তুলেছিলাম হঠাৎ করেই তা যেন চুরমার হয়ে গেল। যে জাপান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ দিনগুলোতেও আমাদের পাশে ছিল, পরবর্তী সময়ে আমাদের উন্নয়ন সংগ্রামে নিরন্তর সহযোগিতা দিয়ে এসেছে তার নাগরিকরা জীবন হারালেন বাংলাদেশে এসে।

ইতালির সঙ্গেও রয়েছে আমাদের গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক। উভয় দেশেই আমাদের দেশের হাজার হাজার মানুষ বাস করেন। ওই রাতের সন্ত্রাসী আক্রমণে উভয় দেশের মানুষ ও সরকার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও মানুষও বাংলাদেশের ওপর এমন আক্রমণে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। আমরাও শোকে-দুঃখে মুষড়ে পড়েছিলাম।

কিন্তু সাময়িক ওই বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশের সরকার ও মানুষ যেভাবে দ্রুত এই নির্লজ্জ সন্ত্রাসী আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম হয় তা সত্যি বিস্ময়কর। কালবিলম্ব না করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিজেদের সুদৃঢ় নৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করেন। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সচেষ্ট সমাজ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফুল হাতে আবালবৃদ্ধবনিতা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাদের মৌন প্রতিবাদ প্রকাশ করেন।

সমাজে আস্থার পরিবেশ পুনঃনির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ অঙ্গীকার প্রকাশ করেন। বিশেষ করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো নিজেদের ভেতর দ্রুত সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে অসামান্য ক্ষিপ্রতা প্রদর্শন করে।

পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা কার্যক্রমে উপস্থিতি, ভাবনা-চিন্তা নিয়ে পর্যাপ্ত মনিটরিং ও ‘মটিভেশনাল’ তথ্যাভিযানে নেমে পড়ে। গণমাধ্যমে, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ এমনভাবে এগিয়ে আসে যে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের অভিভাবকরাও পুলিশের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে নিহত তাদের বিপথগামী সন্তানের লাশ পর্যন্ত বুঝে নিতে অস্বীকার করেন।

এসবের ইতিবাচক প্রভাব তরুণদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে পড়ে। বিপথগামী তরুণদের অনেকেই স্ব-গৃহে ফিরে আসে। যারা আসেনি তাদের বিরাট অংশই পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে হয় ধরা পড়েছে বা নিহত হয়েছে। এখনও যারা সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সব মহল থেকেই তীব্র সামাজিক ও নৈতিক চাপের সৃষ্টি করা হচ্ছে।

আর সে কারণেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এক সুদৃঢ় সামাজিক ও জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ আবার গুলশানের ওই সন্ত্রাসী আক্রমণের আগের অবস্থায় আসতে পেরেছে। বিদেশিরা ফের বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ আগের মতোই করতে শুরু করেছেন। কোনো কোনো দূতাবাসের সতর্কতা নোটিশ সত্ত্বেও বিদেশিরা বাংলাদেশে আসছে এবং ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

এই পরিপ্রেক্ষিত মনে রেখেই আমরা সন্ত্রাসের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্র্থনৈতিক ভিত্তি উপড়ে ফেলার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

শুরুতেই সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন নিয়ে কিছু বলা যাক। একথা বললে ভুল হবে না যে যারা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশে বাংলাদেশকে বাড়তে দেখতে চায় না তারাই এই অপকর্মের পেছনে অর্থ জোগাচ্ছে।

বস্তুত সন্ত্রাসের অর্থায়ন করছে যারা তারা বাংলাদেশকেই চাইনি। এরা একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানিদের পাশে থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে লড়েছে। বাংলাদেশ হৃদয়কে খাবলে খাবলে রক্তাক্ত করেছে। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক চেতনার বিপক্ষের এই মানুষগুলো একাত্তরে পরাজিত হলেও পঁচাত্তরের পর ফের বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় রূপান্তরের চেষ্টা করে।

সেই হীন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম করে বাঙালি তার কাক্সিক্ষত বাংলাদেশকে ফিরে পেলেও ওই অপশক্তি নিঃশেষ কিন্তু হয়ে যায়নি। তারা বরং এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িক ও মধ্যযুগীয় অমানবিক ধ্যান ধারণা বুনে দিতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনে তারা তাদের সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করতে পেরেছে। তাদের হাতে যে প্রচুর অর্থ জমেছে সে কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বর্তমানে ঘাপটি মেরে বসে থাকা এই অপশক্তি দশের ভেতরে অশান্তি করার অভিপ্রায় নিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সম্প্রসারণে অঢেল অর্থ কড়ির জোগান দিয়ে যাচ্ছে। এদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের যোগাযোগ থাকাটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

বিশেষ করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী বিদেশি একটি বিশেষ দেশের গোয়েন্দা সংস্থা এই অপকর্মের অর্থায়নে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। এদের টার্গেট হচ্ছে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ প্রিয় তরুণ প্রজন্ম। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় উপযুক্ত দেশপ্রেম ও সাংস্কৃতিক শুভশক্তি বিকাশের সুযোগ কম থাকায় তারা সহজেই তরুণদের একাংশের মনে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে সন্ত্রাস ও জঙ্গিপনার বীজ ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছে।

আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে যে আধুনিক আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা কাজ করছিল তা ঠিক মতো জানাতে পারছি না। আর সন্ত্রাসের মদদদাতা অপশক্তি এই শূন্যতার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করছে। তারা এই অপকর্মে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালছে।

এখনও সময় আছে আমাদের সন্তানদের গুণমানের লেখাপড়ার পাশাপাশি স্বদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমৃদ্ধ সঠিক ইতিহাস, অর্জন এবং মহৎ মানবিক গুণাবলীর সঙ্গে পরিচিত করে তোলার। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চলমান সামাজিক আন্দোলনকে আরও শক্ত পাটাতনের ওপর দাঁড় করানোর স্বার্থেই শিক্ষার প্রতিটি স্তরে এই শুভশক্তির উত্থান ঘটানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

কেননা সন্ত্রাস আমাদের তরুণদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। প্রযুক্তির প্রসারে সহজেই তাদের মনোজগতে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দিচ্ছে। পরিবার ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্রিয়তা ও সমর্থনের অভাবে খুব সহজেই তরুণরা অজানা এক ভয়ঙ্কর কালো গহ্বরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গুলশানের মর্মান্তিক ঘটনার পর আমরা ধীরে ধীরে ওই কালো গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য তরুণের কথা জানতে পেরেছি।

এসব তরুণের বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের বুকফাটা আর্র্তনাদ কিংবা নিশ্চুপ মানসিক রক্তক্ষরণ একটি সমাজ বা জাতির জন্য কতটা দুর্ভাগ্যের সে কথা আর ব্যাখ্যা করে নাই বা বল্লাম। একই সঙ্গে যেসব অপশক্তি সন্ত্রাস করার জন্য অর্থ জোগান দিচ্ছে তাদের চিহ্নিত করে উপড়ে ফেলাও একই ধরনের জরুরি কাজ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে আশার কথা যে সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিরুদ্ধে আমাদের আর্থিক খাত যথেষ্ট সজাগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) এখন বেশ শক্তিশালী। তাদের প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের সক্ষমতা অনেকটাই বেড়েছে। সম্প্রতি রেমিটেন্সের আড়ালে বেআইনি লেনদেনের চিত্র উন্মোচনে বিএফআইইউ ও সিআইডি বেশ ভালো সমন্বয় সক্ষমতা দেখিয়েছে।

একই সঙ্গে রেমিটেন্স প্রবাহে যেন কোনো ভাটা না পড়ে সে দিকটাও কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেয়াল রেখেছে। উদাহরণ হিসেবে, বাংলাদেশ ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও বিকাশ আন্তর্জাতিক লেনদেন সংস্থাগুলোর সাহায্যে দ্রুত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স গ্রাহকের আত্মীয়স্বজনদের কাছে পাঠানোর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা যায়। এভাবেই প্রযুক্তিকে আমাদের কল্যাণে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই ‘ডিজিটাল হুন্ডি’র সুযোগ কমে আসবে।

আর কে না জানেন, এই হুন্ডির অর্থই যায় সন্ত্রাস ও মাদকাশক্তি সম্প্রসারণে। তবে এ কথাও মনে রাখা চাই যে প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ সহজেই এখন সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ অনুসরণ করতে পারছে এবং তাদের গোপন আড্ডা ও পরিকল্পনা চিহ্নিত করতে পারছে। আগাম সতর্কতার কারণে তারা অনেক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ভুণ্ডল করে দিতে পারছে।

তাই প্রযুক্তির ভালো এবং মন্দ উভয় দিক সম্বন্ধেই আমাদের সচেতন থাকতে হবে। খারাপ দিক নিয়ন্ত্রণে রেখে ভালো দিকগুলোর সম্প্রসারণ করতে হবে। অবশ্যি, আমাদের সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একই পর্যায়ে কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে উঠতে পারেনি। র‌্যাব এক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। পুলিশের ‘কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট’ও দ্রুতই প্রযুক্তির আহরণ ও ব্যবহারে দক্ষতা দেখাতে শুরু করেছে।

তবে সন্ত্রাসে অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে বিএফআইইউ’র সঙ্গে এসব বাহিনীর সমন্বয়ের মাত্রা আরও গভীরতর করতে হবে। এজন্য তাদের দেশে ও বিদেশে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে, বিভিন্ন বন্ধুদেশসহ আমাদের কাছে প্রতিনিধি দেশের গোয়েন্দা সহযোগিতা নিতে হবে। প্রয়োজনে এসব সংস্থায় মেধাবী তরুণ-তরুণীকে নিয়োগ দিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার ও আর্থিক লেনদেনের নানা দিক সম্বন্ধে প্রশিক্ষিত করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য বিদেশি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হলে তাও তাদের দিতে হবে।

এ ক্ষেত্র বিএফআইইউ’কে আলাদা বাজেট দেয়া যেতে পারে। অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণের জন্য যে জাতীয় টাস্কফোর্স রয়েছে সেখানে এ বিষয়টি নিয়ে নীতি-নির্ধারণী আলাপ হতে পারে। ওই টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্ত পেলে বিএফআইইউ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে তহবিল চাইতে পারে। এভাবেই আমরা সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে পারি। আর বাড়লেই সন্ত্রাসে অর্থায়নের গতিমুখগুলো বন্ধ করা সহজতর হবে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে গুলশান বা কিশোরগঞ্জে যে সন্ত্রাসী আক্রমণ হয়েছিল তা কিন্তু একদিনে ঘটেনি। এর পেছনে অনেক দিনের প্রস্তুতি ছিল এবং অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক জোগান ছিল। আর্থিক উৎস বন্ধ না করা গেলে সন্ত্রাসের এই ঝর্ণাধারা বন্ধ করা সহজ হবে না। এখানে কাদের হাত ছিল তাও কিন্তু এদ্দিনে শনাক্ত করা গেছে।

তবে আর্থিক জোগানের উৎসগুলো এখনও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই আর্থিক খাতকে আর স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিবান্ধব করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে এই খাতের হাত ধরে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের সব ফাঁক ফোকর বন্ধ করার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যাপক উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।

তা সত্ত্বেও, বিএফইইউসহ আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাদের সন্ত্রাস মোকাবেলায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর যে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। গুলশান আক্রমণের পর হতাশার যে কালো ছায়া সারা দেশের শুভ জনের ও আমাদের বিদেশি বন্ধুদের মনের ওপর ফেলেছিল তা তাদের ক্ষিপ্র তৎপরতার কারণে অনেকটাই কেটে গেছে।

তাছাড়া, একথাও মানতে হবে যে, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মীদের অভাবনীয় সক্রিয়তা ও ঘুরে দাঁড়ানোর কারণে এত তাড়াতাড়ি বাংলাদেশে এমন করে আস্থার পরিবেশ ফিরে এসেছে। সরকারের দৃঢ় চেতা নীতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা, গণমাধ্যমের ইতিবাচক তথ্যাভিযান এবং সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষগুলোর সাহস ও কর্মকাণ্ডের কারণেই যে এই অর্জন সম্ভব তা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।

নিঃসন্দেহে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ বিচক্ষণ নীতির কারণেই যে অভাবনীয় এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে সে কথাটিও আমাদের স্বীকার করতে হবে। বিশেষ করে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে যেভাবে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা সফল হয়েছেন তা সত্যি বিস্ময়কর। আমাদের জাপানি বিনিয়োগকারীরা ফের বাংলাদেশে তাদের কাজ শুরু করেছেন।

ঢাকায় মেট্রোরেলের কাজ এখন পুরোদমে চলছে। ইতালির গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। বরং তারা আরও বেশি করে আমাদের তৈরি পণ্য কিনছেন। সন্ত্রাসীদের আক্রমণের এটিই হচ্ছে উপযুক্ত জবাব। আরও বেশি করে কাজ করেই সন্ত্রাসীদের হীন প্রচেষ্টার জবাব আমাদের দিয়ে যেতে হবে।

তবে একথাও ঠিক মধ্য-প্রাচ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের যে সক্রিয় উৎস থেকে এসব অপকর্মের অনুপ্রেরণা ও প্রযুক্তিসম্পৃক্ত সহযোগিতা আসছিল তাও বন্ধ হয়েছে অনেকটাই। দেশের ভেতরে বড় বড় সন্ত্রাসী দলকেও কাবু করে ফেলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের অর্থ জোগানের উৎসও সংকোচিত হয়ে এসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে আমরা যেন আত্মতুষ্টিতে না ভোগী। বরং যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থাদির কারণে এত অল্প সময়ে যে সাফল্য আমরা এ ক্ষেত্রে অর্জন করতে পেরেছি সেসব যেন টেকসই হয়। প্রতিটি সংস্থা ও বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্নে আমরা যেন সর্বদাই আপোষহীন থাকি সেই প্রত্যাশাই করছি। হালে পুলিশ বাহিনীর কাছে অভিযোগ করার ‘৯৯৯’ ডিজিটাল পরিষেবার যে প্রচলন ঘটেছে তাতেও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণের গতি বেড়েছে। তবে স্বল্পমেয়াদি এ সাফল্যকে দীর্ঘ-মেয়াদে টেকসই করতে হলে অবশ্যি সমাজের ভেতর যে ময়লা-আবর্জনা রয়েছে তা দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি সম্প্রতি বাংলা একাডেমিতে যথার্থই বলেছেন পরিবেশ দূষণের চেয়েও মানুষের মনের দূষণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আর মনের এই দূষণ দূর করতে হলে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ওপর জোর দিতে হবে। আমরা হালে শিক্ষার কল্যাণী রূপটাকে যেন ভুলেই বসে আছি। আর শিক্ষার গুণমানে যে ব্যাপক বৈষম্য রয়ে গেছে তাও যেন নীতিনির্ধারকদের সেভাবে চোখে পড়ছে না।

যে দেশের জাতীয়তাবাদ ভাষা-ভিত্তিক, যার সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির ডাক এবং যার আবির্ভাব নিশ্চিত করেছে আধুনিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা সেই দেশের শিক্ষার বর্তমান অবক্ষয় সত্যি বেদনাদায়ক।

শিক্ষাক্ষেত্রে এখনও আমাদের মোট বাজেট জিডিপির দুই শতাংশের মতো। এই বাজেট দ্বিগুণ করলেও শিক্ষার জন্য যে মানের অবকাঠামো ও শিক্ষকের প্রয়োজন তা হয়তো মিটবে না। একই সঙ্গে শিক্ষার যে নৈতিক জোর সে দিকেও নজর দেয়ার সময় এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিক্ষার বাজেট আমাদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। ওই অঞ্চলে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত সব শ্রেণীর জন্য প্রায় একই মানের। সেখানে সবাইকেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত না করে কারিগরি শিক্ষার দিকে বড় অংশের ছাত্র-ছাত্রীদের ধাবিত করা হয়। তারা সবাই কাজ খুঁজে পান অল্প বয়সেই।

আর বেকারত্ব না থাকায় তাদের মনে হতাশাও কম। তাই শুধু পরীক্ষা পাসের দিকে নজর না দিয়ে গুণমানের শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, মানুষ গড়ার শিক্ষার দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। দেশজ সংস্কৃতির উজ্জ্বল দিকগুলোর সঙ্গেও তাদের শিক্ষালয়েই পরিচিত করে দিতে হবে। মনে রাখা চাই যে আগামী দিনের বাংলাদেশের চেহারা কেমন হবে তা কিন্তু আজই নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষালয়ের শ্রেণী কক্ষে।

এমন সুশিক্ষা পেলে তরুণরা সন্ত্রাস ও মাদকাসক্তের মতো জীবন-বিনাশি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সহজেই সম্পৃক্ত হতে উৎসাহী হবে না। অবশ্যি, শিক্ষালয়ের পাশাপাশি পরিবারকেও এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করতে হবে। সামাজিক নেটওয়ার্কে বুদ হওয়া থাকা ছেলেমেয়েদের দিকে না তাকালে মা-বাবাকেও একসময় তাদের সন্তানদের অপকর্মের খবর পেয়ে ভীষণ মনোকষ্টে পড়তে হয়। পুরোপরিবারটি তখন বিষণ্ণতায় ডুবে মরে। তাই সমাজের অংশ হিসেবে পরিবারকেও তার সজাগ কল্যাণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

তবে আমাদের সন্তানরা কিন্তু চারপাশের সামাজিক ও প্রশাসনিক পরিবেশও লক্ষ্য করে। চারদিকে সামাজিক অনাচার, অন্যায়, দুর্নীতি, সুশাসনের ঘাটতি দেখতে দেখতে তারাও কল্যাণ ভাবনার ওপর আর পুরোপুরি বিশ্বাস রাখতে পারে না।

তাই আমাদের জাতীয় পর্যায় থেকে একেবারে প্রশাসনের নিচের স্তর পর্যন্ত দুর্নীতি, সুশাসনের ঘাটতি ও বৈষম্য রোধে পর্যাপ্ত নীতি-নির্ধারণী ও পরিপালন উদ্যোগ না নেয়া হলে তরুণ সমাজকে সঠিক পথে ধরে রাখা বেশ কষ্টকর হবে।

সামাজিক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য তাই দলমত নির্বিশেষে পুরো জাতিকেই সুশাসন, সুবিচার, শুভ আয়োজনের কথা ভাবতে হবে। উল্লেখ্য, সামাজিক শান্তি নিশ্চিত না করতে পারলে আখেরে চলমান উন্নয়নকেও আমরা টেকসই করতে পারব না। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। সরকার আসবে আবার যাবেও। কিন্তু সমাজ সচল থাকবে নিরবধি।

সেই সমাজকে কল্যাণধর্মী, সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখা গেলেই সন্ত্রাসের মতো নেতিবাচক উপসর্গ দূর করা কঠিন হবে না। একই সঙ্গে আমাদের উন্নয়ন কৌশলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক খাতকেও সদা সতর্ক থাকতে হবে সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিরুদ্ধে। এই খাতের সামাজিক দায়বদ্ধ কর্মসূচিকে আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ড প্রসারে আরও লক্ষ্যভেদি হতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলে নিশ্চয় আমরা সন্ত্রাসের মতো সামাজিক এই ব্যাধি দমন করতে সক্ষম হব।

লেখক : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

অমৃতবাজার/মিঠু