ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১১ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ইউজিসি ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়


মৌলি আজাদ

প্রকাশিত: ০৪:২৪ পিএম, ২৮ জানুয়ারি ২০১৮, রোববার | আপডেট: ০৫:৪০ পিএম, ২৮ জানুয়ারি ২০১৮, রোববার
ইউজিসি ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন তথা ইউজিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। সেসময় ইউজিসির মূল কাজ ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্থিক সংস্থান করা। কিন্তু বর্তমানে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৩৯টি ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ৯৫টি অর্থাৎ ১৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়। স্বভাবতই এখন ইউজিসির কাজের পরিধি আগের মত শুধুমাত্র আর্থিক সংস্থানেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউজিসির কাজের কলেবর বেড়ে গেছে এখন বহুগুণে।

প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠিত দেশের ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাকা, বুয়েট, রাজশাহী,চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও বাংলাদেশ কৃষি) পরিচালিত হয় তাদের অধ্যাদেশ দ্বারা। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটিতে রয়েছে বাংলায় প্রণীত আইন (ইউজিসি আইনের খসড়া তৈরিকরণে কাজ করে থাকে)। এ আইনের মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন দ্বারা। ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সবরকম সাপোর্ট দিয়ে থাকে।

বলতে দ্বিধা নেই যে, কালের প্রয়োজনে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না হয়ে উপায় ছিল না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশে প্রতিবছর এইচএসসি পাসকৃত শিক্ষার্থীদের ভর্তির সংস্থান করছে। পূর্বে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়তে পেরে হয়ে যেতো ফ্রাসট্রেটেড। কিস্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক শিক্ষার্থীর ভেতরে জমে থাকা এ হতাশা দূর করতে সক্ষম হয়েছে। দেখা গেছে বর্তমানে মাঝারি মানের শিক্ষার্থীও ভালো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ভালো শিক্ষক ও পরিবেশের কারণে ভালো ফলাফল করছে। যার ফলে চাকুরির বাজারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর চেয়েও অনেক সময় তাদের এগিয়ে থাকাও অস্বাভাবিক নয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ায় দেশের ধনী পরিবারের অনেক সন্তানরাও আগের মত বিদেশে যেতে ততটা আগ্রহী নন। রাজনীতিমুক্ত-শৃঙ্খলার মধ্যে থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ অনেক অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চলে এসেছে।

আলোর নিচে অন্ধকার থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাই দেখা যায় সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একই রকম শিক্ষার মান বজায় রাখতে পারছে না। শিক্ষার মান বজায় রাখতে সক্ষম হয়না মূলত সেইসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যারা আইনের ব্যত্যয় ঘটায়। যেমন:- ২০১০ এর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৯ ধারার (১) ও (২) উপধারায় বলা আছে,

‘ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার ক্ষেত্রে, প্রস্তাবিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে অন্যূন ১ (এক) একর পরিমাণ এবং অন্যান্য এলাকার জন্য অন্যূন ২ (দুই) একর পরিমাণ নিষ্কন্টক, অখণ্ড ও দায়মুক্ত জমি থাকিতে হইবে; উল্লিখিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জমিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ক্যাম্পাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনাদির প্ল্যান অনুমোদন করাইয়া, সাময়িক অনুমতিপত্রে প্রদত্ত মেয়াদের মধ্যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করিতে হইবে।’

কিন্তু দেখা যায়, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই সুদীর্ঘ বছরেও আইনে উল্লেখিত সনদপত্র পাবার শর্তাবলী পূরণ করতে পারে না। কখনও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়াও বছরের পর বছর ভাড়াকৃত ভবনে চলতে পারেনা। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এক নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ১৩ ধারায় বলা আছে যে, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনার নিমিত্ত প্রদত্ত সাময়িক অনুমতিপত্রে বা, ক্ষেত্রমত, সনদপত্রে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত ক্যাম্পাস যে শহর বা স্থানে স্থাপিত ও পরিচালিত হইবে উহার সুনির্দিষ্ট উল্লেখ থাকিবে; উল্লিখিত শহর বা স্থানে সংশ্লিষ্ট বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত ক্যাম্পাস সীমিত রাখিতে হইবে এবং অন্য কোন স্থানে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কার্যক্রম পরিচালনা বা কোন ক্যাম্পাস বা শাখা স্থাপন ও পরিচালনা করা যাইবে না।’

কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যত্রতত্র তাদের আউটার ক্যাম্পাস গড়ে তোলে যা আইনে গ্রহণযোগ্য নয়। দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়- এর প্রধান উদাহরণ।

দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে দেশের যত্রতত্র আউটার ক্যাম্পাস খুলে সনদ বিক্রির বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। ইউজিসি তখন শক্ত হাতে এ ধরণের সার্টিফিকেট বিক্রি করা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য হাল ধরে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরবর্তীতে মহামান্য আদালতের রায়ে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করে রায় প্রদান করা হয়। প্রশ্ন হল- এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হল কারা? একশ্রেণীর শিক্ষা নিয়ে ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি হয়ে হাজার হাজার তরুণের অভিভাবকদের অর্থ জলে গেলো।

সার্টিফিকেট নিয়েও রইলো সংশয়। তাই ইউজিসি প্রতিবছর এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হবার সাথে সাথেই বহুল প্রচারিত বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ইউজিসি অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করে। এর অন্যতম কারণই হলো- শিক্ষার্থীদের বর্তমানে দেশে অনুমোদিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে অবগত করানো। অযথা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শ্রম ও অর্থ অপচয় কাম্য নয়। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা ভর্তির আগে ইউজিসির বিজ্ঞপ্তি/ওয়েবসাইট/প্রয়োজনে ইউজিসিতে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। আউটার ক্যাম্পাস ছাড়াও বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে- ট্রাস্টি বোর্ডের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায় যা মামলা পর্যন্ত গড়ায়। এর প্রভাব উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর উপরে পরেই।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৯ ধারার ৪ উপধারায় বলা আছে, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃত পূর্ণকালীন শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম শতকরা ছয় ভাগ তন্মধ্যে শতকরা তিনভাগ আসন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং শতকরা তিন ভাগ আসন প্রত্যন্ত অনুন্নত অঞ্চলের মেধাবী অথচ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য সংরক্ষণপূর্বক এই সকল শিক্ষার্থীকে টিউশন ফি ও অন্যান্য ফি ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ প্রদান করিতে হইবে এবং প্রতি শিক্ষা বৎসরে অধ্যয়নরত এইরূপ শিক্ষার্থীর তালিকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে দাখিল করিতে হইবে।”- এধারাটি প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেমন পালন করা উচিত তেমনি মেধাবী অথচ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের এ সুযোগ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা উচিত। অনেক দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী/অভিভাবকেরা হয়তো আইনের এ ধারাটির বিষয়ে অবগত নয়। সেক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী/তাদের অভিভাবকেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সম্পর্কে জানার জন্য ইউজিসি ওয়েবসাইট (http://www.ugc.gov.bd/) দেখতে পারেন।

বর্তমানে সরকার দেশের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা যাতে না গড়ে ওঠে ইত্যাদি নানা বিষয়ে বিবেচনা করেই সারা দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিচ্ছেন। নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্ষেত্রে) দেশের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংযোজন। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও শিক্ষার মান বজায় তথা মধ্যম আয়ের এদেশের শিক্ষার্থীদের আর্থিক দিকটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে বিশ্ববিদ্যালয়কে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে আইনের গন্ডির বাইরে গেলেই যেকোন ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

ইউজিসি তার স্বল্প জনবল নিয়ে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সুষ্ঠু পথে পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ-মানসম্মত শিক্ষা বজায় রাখার বিষয়ে দায়িত্ব সম্পাদন করে যাচ্ছে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আজ ইউজিসিকে আরো বেশি ক্ষমতা প্রদান করা জরুরি। মাথায় রাখতে হবে যে, দেশের শিক্ষায় পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় দুইটি প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। বরং দিনে দিনে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এরা হবে সহযোগী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

লেখক: সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি (লিগ্যাল), বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

অমৃতবাজার/মাসুদ