ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আমার কফিয়ৎ


আনিস আলমগীর

প্রকাশিত: ০৭:০৯ পিএম, ২৬ জানুয়ারি ২০১৮, শুক্রবার
আমার কফিয়ৎ

সকাল বেলা ফেইসবুক চেক করতে গিয়ে ইনবক্সে দেখলাম ‘কল্যাণ রায় রানা’ নামের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের এক যুবনেতার স্ট্যাটাস লিংক। পড়ে বুঝলাম তিনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবেও চেনেন এবং আমার এলাকার। সে আমার এলাকার সন্তান বলেই তার বেদনা আমাকে আরও স্পর্শ করেছে, ব্যাথা দিচ্ছে। লিখেছেন:

“অত্যন্ত সুশ্রী, সুঠাম দেহের অধিকারী, ব্যাক্তিত্ববান অবয়বের কারনে বাল্য কাল হতেই উনি আমার শ্রদ্ধার ও পছন্দনীয় ব্যাক্তির তালিকায় ছিলেন। আনিস আলমগির আমার এলাকার এক সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। ঐতিহ্যগত ভাবেই উনার পরিবার এলাকায় বহু হিন্দু পরি- বারের সাথে আত্নিক সম্পর্কে আবদ্ধ। তাছাড়া আমাদের এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির দৃষ্টান্ত উজ্জল। বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে ৯০ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে উনার পরিবারের সদস্য ও এলাকার মুসলমাম জনগোষ্টি যেভাবে হিন্দু জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়েছেন,তাহা আমার স্মৃতিতে চির অম্লান হয়ে থাকবে। একজন প্রতিযশা গুনী সাংবাদিক এবং আমার এলাকার সন্তান হিসেবে উনার জন্য আমার মনের ভিতর সবসময় ছোট্ট একটা অবস্থান ছিলো। কিন্তু আজ দেশের লক্ষ লক্ষ সনাতনী জনগোষ্ঠী র মতো আমার মনেও উনার প্রতি তীব্র ঘৃনা ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে ।” (বানান অপরিবর্তিত)।

কল্যাণ রায়ের শেষ কথা হচ্ছে, আমাকে বিচারের আওতায় আনা হোক। নাসির নগরের নিরীহ রসরাজ জলদাস, রংপুরে দরিদ্র টিটু রায় মামলার শিকার হলে আমি নই কেন?

কল্যাণ রায়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি অন্তত সোশ্যাল মিডিয়ার মিথ্যচারের এই যুগে সে কোনো মিথ্যার আশ্রয় নেননি। নিজের মনের ক্ষোভটা জানিয়েছেন, আইনগত সাজা চেয়েছেন। কিন্তু সে শুধু এটা জানে না যে, যাকে তারা জেলে দিতে চায় সে আনিস আলমগীর নিজে এ দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য কী করেছে। মানবতার পক্ষে তার কাজ কী।

১৯৮৯ সাল। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় পড়ি, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিদারাবাদ গ্রামে তখন ঘটে চরম নৃশংস ঘটনা। জমি বাড়ি দখলের জন্য নিদারাবাদের শশাঙ্ক দেবনাথকে প্রথমে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। দুই বছর পর তার স্ত্রী বিরজাবালা ও সন্তানসহ ছয়জনকে হত্যা করে ড্রামে চুন মিশিয়ে তাতে লাশ ভরে বিলে ফেলে দেওয়া হয়। যেদিন ঘটনাটি পত্রিকায় আসে সেদিনই আমি চলে গিয়েছিলাম নিদারাবাদ সে কাহিনী তুলে আনার জন্য। সঙ্গে ছিল বন্ধু নোটন। দিন ভর জার্নি, হাওর পেরিয়ে ২ দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তুলে এনেছিলাম সে কাহিনী। ঢাকার কোনও সাংবাদিক যায়নি সেখানে তখনও। আজকের সেলফি যুগ ছিল না সেটি। কবি সালেম সুলেরি ভাই তখন সাপ্তাহিক সন্ধীপের দায়িত্বে। তিনি আমার নিদারাবাদ কাহিনী কাভার স্টোরি করেন। তাকে ছাপানোর জন্য লেখাটা দিয়েছিলেন তখনকার নিউজব্যুরো নামের এজেন্সির প্রধান মতিউর রহমান চৌধুরী।

১৯৯০ সালে বাবরী মসজিদ নিয়ে উত্তেজনায় পরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ঢাকেশ্বরী মন্দির। মন্দিরের পাশে বাসা ছিল, ঘটনা দেখে মিছিল ফলো করে জীবনবাজি রেখে একমাত্র আমিই তুলতে পেরেছিলাম ঘটনার নানা ছবি। ছবি তুলছি কেন সে কারণে স্থানীয় এমপি ব্যারিস্টার আবুল হাসনাতের এক ক্যাডার একটি ধামা আমার ঘাড়ে রেখেছিল। আরেকজন পাড়ায় দেখে চিনতো বলে থামিয়েছিল। রাতে যোগাযোগ হয় রয়টার্সের সঙ্গে। এরশাদ কার্ফু জারি করে রেখেছিলেন। রয়টার্সের প্রধান আতিকুল আলম আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠান সাংবাদিক শিহাবুদ্দিন নাফা ভাইকে। প্রেসক্লাব থেকে উনি আমাকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যান হোটেল শেরাটনে তাদের অফিসে। রয়টার্সের মাধ্যমে ছবিটি ছড়িয়েছিল বিশ্বে। এতো ব্যাপক সাড়া পাওয়ার আমাকে ধন্যবাদ জানাতেও ডেকেছিলেন আতিকুল আলম। আনিস আহমেদ তখন সেখানে দ্বিতীয় ব্যক্তি, তার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেন।

আর নাইমুল ইসলাম খানে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, মোজ্জাম্মেল বাবুর পূর্বাভাসে কাভার হয়েছে সে ছবিগুলো, আমার স্টোরি গেছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের একজন ছবিগুলো আমার কাছ থেকে নিয়েছিলেন তাদের ম্যাগাজিনের জন্য। ওই সময়ের সাম্প্রদায়িক ঘটনার রিপোর্ট করতে আমি ছুটে গিয়েছি চট্টগ্রামের কৈবল্যধামে, মিরসরাইতে-- যেখানে নারীরা নির্যাতিত হয়েছেন, মন্দির পুড়েছে। তখন সরেজমিনে দেখা রিপোর্টগুলো ব্যাপক আলোচিতও হয়েছিল।

এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর রংপুরের ঘটনার ক্ষোভ আর অতীতের এমন ঘটনাবলীতে জমে থাকা ক্ষোভ আমার উপর ঝেড়ে আমাকে রসরাজ-টিটোর মতো সাজা দেওয়ার কথা বলাটা কি নির্মম ঘটনা হিসেবে আমি দেখতে পারি না! কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যা ঘটেছে, রংপুরে যা হয়েছে আমিইতো তার বিরুদ্ধে কলাম লিখেছি। টানা তিন দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৃশংসতা দিয়ে টক শো হোস্ট করেছি এশিয়ান টিভিতে। কেউতো টানা তিনদিন করেনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘পাকিস্তানী ছিটমহল’ বলায় প্রচুর নিন্দা পেয়েছি এবং একজনের কাছ থেকে জীবননাশের হুমকি পেয়েছি। যেখানে যত নির্যাতন তার বিরুদ্ধে আমিতো লিখেই যাচ্ছি। কে কোন ধর্মের তাতো দেখি না। আফগানিস্তানে-ইরাকে যখন মুসলমানরা নির্যাতিত আমিইতো একমাত্র জীবনবাজি রেখে এই দেশ থেকে যুদ্ধ কাভার করতে গিয়েছিলাম। আজকের কাগজ, চ্যানেল আই, বিবিসি বাংলা, ডয়েসে ভ্যালের মাধ্যমে অনেকেইতো তা জানেন, আমি যে মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। রামুর ঘটনাতেও আমি কলাম লিখেছি ‘ক্ষমা কর হে বুদ্ধ!’

এখন আপনাদের দেবীকে নিয়ে বলা আমার শব্দচয়ন আপনাদের পছন্দ হয়নি, আঘাত পেয়েছেন অনেকে। সেই ভুলবুঝাবুঝির জন্য আমিতো ক্ষমা চেয়েছি। আবারও চাচ্ছি। যা আমি মীন করিনি তার জন্য ১০০ বার চাইতেও সমস্যা নেই। এটা নিয়ে প্লিজ ইস্যু বানানো বন্ধ রাখেন। এমনিতে দেশটা সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে অস্থির। আমাকে বিপক্ষদলে ঠেলে যারা ইস্যু বানিয়ে মাঠ গরম করতে চান, সরকারকে বিব্রত করতে চান, মৌলবাদে উস্কানি দিতে চান- তারা কোন সম্প্রদায়, কোন সম্প্রীতি আর মানবতার পক্ষে কাজ করছেন! কে কি করেছেন?

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক