ঢাকা, শুক্রবার, ২০ এপ্রিল ২০১৮ | ৭ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

নতুন বছর হোক আত্মজিজ্ঞাসা আর আত্মসমালোচনার বছর


ইভান চৌধুরী

প্রকাশিত: ১০:২৪ এএম, ০১ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার
নতুন বছর হোক আত্মজিজ্ঞাসা আর আত্মসমালোচনার বছর

আজ ২০১৮ সালের প্রথম দিন। প্রতিদিনের মত আজও পূর্বদিগন্তে সূর্য উঠেছে। শীতের কুয়াশা সরিয়ে উঁঁকি দিয়েছে উজ্জ্বল রোদ। কিন্তু অন্য যে কোন দিনের চাইতে আজকের ভোরের আলোতে যেন বেশি আবেগ ও মায়া মাখানো। যেন অনেক স্বপ্ন আর ভালোবাসার কথা বলছে সে। শুধু শীতের কুয়াশা নয়, সরিয়ে দিয়েছে যেন না পাওয়ার বেদনা, দুঃখের সমস্ত গ্লানি। আগামীর দিনগুলোতে সকল অনিশ্চয়তা কেটে গিয়ে শুভময়তা ছড়িয়ে যাবে আশাজাগানিয়া কিরণ যেন সে দ্যুতিই ছড়িয়ে দিয়েছে প্রত্যেকের মনে-প্রাণে।

আমরা দেখেছি রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। সড়ক দুর্ঘটনায় ছিল মৃত্যুর মহামিছিল। ছিল গুম খুনের মহোৎসব। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছিল মারামারি-টেন্ডারবাজির মত অনেক পীড়াদায়ক ঘটনা। তবে এসব সামান্য কিছু হতাশার কথা ছেড়ে আমাদের সবচেয়ে বড় আশা এবং অনুপ্রেরণার দিক হলো গতবছরেই নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের অদৃশ্যমান পদ্মা সেতু আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়েছে। নির্যাতিত, নিপীড়িত নিজ ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়ে সরকারও প্রমাণ করেছে নিজের মানবিকতার শক্ত অবস্থান। পেয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খেতাব।

নতুন বছর হোক আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মসমালোচনা আর গঠনমূলক সমালোচনার বছর। আমাদের ভাবতে হবে, বিজয়ের এত বছর পরও কি আমাদের এ ক্রান্তিলগ্নে বাস করার কথা ছিল? কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক অবস্থার যদি পরিবর্তন ঘটানোর মতো মানবিক উদার মূল্যবোধ গড়ে তুলতে না পারি, তবে পুরনো ক্যালেন্ডারের জায়গায় হয়তো আজ থেকে নতুন ক্যালেন্ডার শোভা পাবে, কিন্তু ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আসবে না। নতুন বছর অর্থবহ হয়ে উঠবে তখনই যদি বিগত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অপূর্ণতাগুলো পূর্ণ করার প্রয়াস নেওয়া যায়।
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে / তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্তজাগে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এ কথার মতই দুঃখ, কষ্ট সবকিছু কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে যাত্রার প্রেরণা নেবে মানুষ। নতুন বছরটি যেন সমাজ জীবন থেকে, প্রতিটি মানুষের মন থেকে সকল গ্লানি, অনিশ্চয়তা, হিংসা, লোভ ও পাপ দূর করে। রাজনৈতিক হানাহানি থেমে গিয়ে আমাদের প্রিয় স্বদেশ যেন সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

গত বছরের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাব খুঁজতে খুঁজতে নতুন বছরকে সামনে রেখে আবর্তিত হবে নতুন নতুন স্বপ্নের। বাংলাদেশে ইংরেজি নববর্ষ পালনের ধরন বাংলা নববর্ষ পালনের মত ব্যাপক না হলেও এ উৎসবের আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া থেকে বাংলাদেশের মানুষও বিচ্ছিন্ন নয়।

সাল বিদায়ী দিনের শেষ মুহূর্তগুলো পানপাত্রের তলানীতে শেষ চুমুকের মতোই জ্বালাচ্ছে স্মৃতির দাহনে। একটা বছর দেখতে দেখতেই চলে গেল। সাথে নিয়ে গেল ভালোলাগা কিছু মুহূর্ত আর কিছু গোপন অশ্রুর ফোঁটা।

আসা-যাওয়ার বিরামহীন স্রোতেই চলমান জীবন। সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা-দিন-মাস পেরিয়ে বছর চলে যায়। আসে নতুন বছর। জাগতিক এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাবে এমন সাধ্য কার? ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার বারতা নিয়ে যে নতুন বছরটির আগমন ঘটেছে, অমিত সম্ভাবনার আশায় নতুন বছরকে বরণ করছি গভীর আবেগে, পরম মমতায়। বিগত বছরের যাপিত জীবনের তাবৎ সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, পাওয়া না পাওয়াকে বিদায় জানিয়ে আবার আশার মিনারে দাঁড়াবো আজ থেকে।

নানা কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে বিদায়ী বছরটি। বিগত দিনে পাওয়া না পাওয়ার যত আনন্দ-বেদনা, যত জঞ্জাল, যত গ্লানি সব পেছনে ফেলে এবার শুরু হলো নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার পালা। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে পাথেয় করে ভবিষ্যতের সোনালি রোদ্দুর দেখার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পাক সকলের জীবনে। আজ থেকে উদ্ভাসিত হোক সজীব সবুজ নতুনতর সেই দিনের, যা মুছে দেবে সকল গ্লানি। জাগাবে নতুন প্রত্যয়ে সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাবার প্রেরণা। কী হারিয়েছি, প্রত্যাশার কতটা পূরণ হয়নি, তা নয় বরং যা পেয়েছি সেটিই হোক প্রেরণার উৎস।

আমাদের জানতে হবে মৃত্যুপুরীর ধ্বংসস্তুপেও প্রস্ফুটিত হয় নব-জীবনের ফুল। মহাপ্রলয়ের কাছেও হার মানে না বাঙালি। সকল বৈরিতাকে পায়ে দলে গেয়ে যায় জীবনের জয়গান। স্বপ্ন দেখবো মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুখী-সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। সে স্বপ্নপূরনের প্রত্যাশায় স্বাগতম ইংরেজি নববর্ষ।

সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। নতুন বছরে উন্মোচিত হোক সম্ভাবনার দিগন্ত। নতুন বছরটি আনন্দে, শান্তিতে ভরে উঠুক এই প্রত্যাশায় সবার জন্য শুভ কামনা।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী লোক-প্রশাসন বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

অমৃতবাজার/মাসুদ