ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সাম্প্রদায়িকতার অবসান কোথায়?


মল্লিক কুমার বিশ্বাস

প্রকাশিত: ০৯:২৪ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | আপডেট: ০৯:২৫ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
সাম্প্রদায়িকতার অবসান কোথায়?

সাম্প্রদায়িকতা শব্দটির সাথে কারো বিরোধ নেই। সম্প্রদায়ের লোকজন অতি আপন করেই কিছু শব্দকে অতিরিক্ত মাত্রা দেয়। অনুভূতির মাত্রা অনুযায়ী সরাসরি কেউ কেউ শক্ত বা নরম ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে । আমরা কেউই জন্মগত ভাবে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে জন্ম নেই না। তাহলে সাম্প্রদায়িক অলাদা কোন জাতি বা গোষ্ঠী রয়েছে কি? ধর্মনিরপেক্ষ জাতির সাংবিধানিক আইনকে রক্ষার দায়িত্ব কে দেখভাল করবে?

সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, কক্সবাজারের রামু এবং রংপুরের সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ঘটনা উদ্বেগের জন্ম দেয়। এধরনের বারবার হামলা একই সূত্রে গাঁথা এবং একই মাধ্যমে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখছে সচেতন মহল। রংপুরের ঠাকুরপাড়া গ্রামের খগেন রায়ের ছেলে টিটু রায়ের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ তুলে গত ১০ নভেম্বর ওই গ্রামে কয়েক হাজার মানুষের মিছিল থেকে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও আগুন দেওয়া হয়। তাতে অভিযুক্ত টিটু রায়ের বাড়িসহ ১০ পরিবারের ঘরবাড়ি পুড়ে।

সাম্প্রতি রংপুরের হামলার ঘটনাস্থলে এসে সরকার দলীয় একজন মন্ত্রী বলেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচানকে সামনে রেখে একটি অশুভ সাম্প্রদায়িক শক্তি রংপুরের ঠাকুরপাড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলা করেছে। এ ধরনের অপকর্ম যারা করছে তারা দেশকে শুধু অস্থতিশীল করতে চাইছে না, তারা ভারতের সঙ্গে আমাদের বিরাজমান সুসস্পর্কও বিনষ্ট করতে চায় (কালের কন্ঠ,২০ নভেম্বর)। আক্রান্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সহ সকলেই নিরাপদে থাকুক তাই চায় রাষ্ট্র । এব্যাপারে রাষ্ট্রকে সংখ্যালঘু সংকট মোকাবেলায় আরো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি সচেতন সামাজিক, রাজনৈতিক মাধ্যমকে পাশ কাটিয়ে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহারণ সৃষ্টি করতে হবে সমাজের প্রতিটি স্তরে।

আমার বাবা,কাকা আর জেঠুদের মিলে ১০-১২টি পরিবার । পুরো গ্রামের একমাত্র হিন্দু পাড়া। বাড়ীর সামনেই প্রধান সড়ক। অন্য পাশেই গ্রামের বড় মসজিদটি থাকায় শিশুকালে অবচেতনমনে আযান দেওয়াই আগে শিখেছি। এখনো ছোট্ট ভাতিজাগুলো সন্ধ্যার মাগরিবের আযান শুরু হলে মাঝে মধ্যে আযানের স্বর মিলায়। গোধূলীতে উলু-ধ্বনি আর আযানের মিশানো এমন মধুর ধ্বনি আর কোথাও নজরে আসেন নি।

বিশ্বাস বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত মন্দির না থাকলেও সাপ্তাহিক হরি কীর্তন সহ সকল পূজা-পার্বন নিয়মিতই হয়। বাড়ির একমাত্র বয়োজেষ্ঠ দাদা বলেছে- সংগ্রামের আগে গ্রামে অনেক হিন্দু পাড়া ছিল এখন আমরা ছাড়া প্রায় সবাই ইন্ডিয়াতে আর কিছু সংখ্যক লোকজন আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম-শহর এলাকায় রয়েছে। এ বাড়িতে খুব প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব না থাকলেও সরকারি চাকুরীজীবি,মুক্তিযোদ্ধা,ব্যবসা ,কৃষি, মজুর ও পরিবহণ সেবার সাথে যুক্ত অনেকেই তাই নিয়েই আমাদের বাড়ির অর্থনীতির উত্থান- পতন ।

সবচেয়ে ভাল লাগার বিষয় হচ্ছে গ্রামের সাথে আমাদের সম্পর্ক্ । সব বয়সী আদর্শ লোকজন ও পাড়াগুলোর সাথে একটু বেশিই উঠা-বসা হয় বাবা,কাকাদের । এভাবেই সামাজিক সু-সম্পর্কের মধ্য যুগের পর যুগ চলে যাচ্ছে । বেড়ে উঠছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।

আমাদের দেশে কিংবা এলাকার আশেপাশের যখনই কোন সংকট দেখা দেয় তখন আমরা কোন ধরনের শংকিত হইনা । অন্য লোকজনের কূটিল জিঞ্জাসা “তোমরা কেমনে থাক গো ? “ প্রশ্নেই যত শংকিত হতে হয় আমাদের অভিভাবকদের। আমরা বিশ্বাস করি বিশুদ্ধ সম্প্রদায় থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির সৃষ্টি হয়। আর ধর্মীয় পার্থক্যের চেয়ে একই দেশে বসবাস করার সুচিন্তাই সবসময় গুরুত্বপূর্ণ মনোভাব গড়ে তোলে। সেজন্য সচেতন বোধ থাকা অবশ্যই জরুরী।

এটা স্পষ্ট যে, ১৯৪৭ সালে জাতীয়তা চেতনা এবং ১৯৭৫ সাল থেকে পরবর্তী বিশ(২০) বছর রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্যে ধর্ম কে নানাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যা এখনো নানা ভাবে হচ্ছে ।

সাম্প্রতি ফেইসবুকে বাংলাদেশে টানা কয়েক বছর ধরে যেসব ধরে যেসব ধর্মীয় সহিংসতা চলছে তার মূলেও রয়েছে রাজনীতির কালো হাত। মিথ্যা গুজব, দাঙ্গা, হামলা , নির্যাতন এসবের ভয়ে পালিয়ে গিয়ে সম্প্রদায় টিকালেও সাম্প্রদায়িকতা এড়ানো বা প্রতিহত করা যাবে না। সাম্প্রদায়িকতা রোখা প্রত্যেকটি সচেতন ব্যক্তির দায়িত্ব।

সমাজবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড শিলস্ মনে করেন, সপ্তদশ শতাব্দী থেকে প্রত্যেক ভাবাদর্শেরই রাজনীতি সম্পর্কে একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, কিন্তু উনিশ শতক থেকে বেশি ভাগ মতাদর্শই রাজনীতি প্রধান হয়ে উঠেছে। এই রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য দেশ গুলোর বেলায়ও প্রযোজ্য হয়ে উঠছে। যা ছিল ধর্মীয় কিংবা সম্প্রদায়গত পরিচয় ভিত্তিক বিষয় তা এখন ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে কিংবা সমপ্রদায়ের রক্ষার নামে রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে। ধর্মীয় নৃ-তত্ত্বভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন উগ্র মতবাদ সৃষ্টি হচ্ছে । ধর্মের সাথে রাজনীতির সংযুক্ততার প্রবণতা ফান্ডামেন্টালিজম বা মৌলবাদ রুপ ধারণ করছে ।

আমাদের দেশে ফেইসবুককে অপব্যবহার করে যেসব সাম্প্রদায়িক সহিংতার জন্ম দিচ্ছে তার পেছনে অপরাজনৈতিক শক্তির হাত রয়েছে। সহিংসতার মাত্রা অনুযায়ী দায়িত্বশীল গোষ্ঠীগুলো প্রতিবাদ করছে খুবই সামান্য। বরঞ্চ নীতিগত ভাবে যাঁরা ধর্মকে রাজনীতিক্ষেত্রে টেনে আনার বিরোধী তাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে না সে , ধর্ম ও রাজনীতিকে তারা পৃথকরাখতে পারবেন। সামপ্রদায়িক ভাবাদর্শ প্রতিহত করতে যাদের অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন, তারা মনে হয় অনেক খানি দ্বিধাগ্রস্ত। এমন দ্বিধার পরিণাম আমাদের সকলের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অজিত গুহ , দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, আবুল কালাম আজাদ, মওলানা আকরাম খাঁর মতো মানুষ যে ঝুকিঁ নিয়েছিলেন আমরা কি নিজেদের কালে সাহস করে সে ঝুকিঁ নিতে পারব না ?

লেখক: শিক্ষার্থী-সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Loading...