ঢাকা, সোমবার, ২০ নভেম্বর ২০১৭ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

প্রান্তজনেরা যেন নদীপথে আন্তর্দেশীয় বাণিজ্যের সুফল পান


ড. আতিউর রহমান

প্রকাশিত: ১২:০১ পিএম, ০৬ নভেম্বর ২০১৭, সোমবার | আপডেট: ১২:০২ পিএম, ০৬ নভেম্বর ২০১৭, সোমবার
প্রান্তজনেরা যেন নদীপথে আন্তর্দেশীয় বাণিজ্যের সুফল পান

কয়েক দিন আগে কলকাতায় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ক্ষেত্রে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর একটি নীতি সংলাপে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ছাড়াও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি ও গবেষকরা এই সংলাপে অংশগ্রহণ করেন।

ভারতের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাট্স ইন্টারন্যাশনাল আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ ও জাপানি কূটনীতিকরাও অংশগ্রহণ করেন। ডিএফআইডি ও এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদের এই অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে উন্নয়ন সমন্বয়ের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি সভাপতিত্ব করি। অনুষ্ঠানের শুরুতেই কাটেসর নির্বাহী পরিচালক বিপুল চ্যাটার্জি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেন। তিনি বলেন, এত দিন আমরা শুধু পানির ব্যবহার নিয়ে আন্তর্দেশীয় আলাপ করেছি। এখন সময় এসেছে এ অঞ্চলের নদীগুলোর মাধ্যমে কী করে ‘কানেকটিভিটি’ বা সংযোগ বাড়ানো যায়। সে জন্য কূটনীতির ধারায়ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার সময় এসেছে। ওপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে পাশাপাশি বসে অংশীজনদের মধ্যে উপযুক্ত নীতি সংলাপই হতে পারে এই সময়ের সফল পানি-কূটনীতি। ডিএফআইডির সিনিয়র জলবায়ু উপদেষ্টা শান্তনু মৈত্র বললেন, নদীগুলো এই উপ-অঞ্চলের যৌথ সম্পদ। এগুলোর সুষ্ঠু ব্যবহার করা গেলে আমাদের সবারই মঙ্গল। তবে সে কাজটির জন্যই সবার আগে নদীবিষয়ক নানা তথ্য (যেমন—নদীব্যবস্থা, নদীর প্রতিবেশ, নদীর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী) সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার ঐকমত্য গড়ে তোলা খুবই জরুরি। বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র পরিবহন বিষেশজ্ঞ জানালেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নদীর পাশের দেশগুলো নদী ব্যবহার করে পরিবহনব্যবস্থাকে অনেক সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তুলেছে। ইউরোপে রাইন ও দানিয়ুব নদী ছাড়াও আরো অনেক নদী অববাহিকা, চীনের ইয়াংজি নদী, লাতিন আমেরিকার পারানা নদী দিয়ে সস্তায় পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব হয়েছে। নাইকের ৯৬ শতাংশ পণ্য নদীপথেই পরিবহন করা হয়। তা ছাড়া হেইনজ্, মারস, বাভারিয়ার মতো বড় বড় কম্পানি নদীপথেই তাদের পণ্যগুলো ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্যে পরিবহন করছে। কম খরচে পণ্য পরিবহন করে এই কম্পানিগুলো সহজেই আরো বেশি প্রতিযোগী হয়ে উঠছে।

সে কারণেই তিনি ভারত-বাংলাদেশ-ভুটান-নেপাল (বিবিআইএন) উপ-অঞ্চলে এমন পরিবহনের সুযোগ কিভাবে সৃষ্টি করা যায় সে বিষয়ে বাজার গবেষণার তাগিদ দেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে এই উপ-অঞ্চলে বাজার একমুখী। যেমন—বাংলাদেশ থেকে খুব সামান্য পরিমাণ পণ্য নিয়ে যে জাহাজ কলকাতায় যায়, তা মূলত ফ্লাই-অ্যাশ বোঝাই করে বাংলাদেশে ফেরে। এর ফলে প্রতি ইউনিট নৌপরিবহন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যায়। অথচ ভারতের বাজারে যদি আরো বেশি পণ্য বাংলাদেশ রপ্তানি করতে পারত, তাহলে এই খরচ অনেক কমে যেত। জাহাজের ব্যবসাও তখন আরো লাভজনক হতো। সেই কারণে ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিতে সব বাধা (যেমন—অ্যান্টি-ডাম্পিং, অশুল্ক বাধা ইত্যাদি) দ্রুত অপসারণ করার প্রয়োজন রয়েছে। ভারতের আমদানি বাণিজ্য এখন দক্ষিণ এশিয়ামুখী নয়। তার আমদানির আরো ১ শতাংশ যদি বাংলাদেশ সরবরাহ করতে পারত, তাহলে আমাদের অতিরিক্ত চার বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হতো। একই সঙ্গে তিনি নদীর পর শেষ মাইলের সংযোগের জন্য রেল ও সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করে পুরো পরিবহনব্যবস্থাটিকে মাল্টি-মোডাল করার কথা বলেন। তবে আমাদের নদীগুলো যেহেতু খরস্রোতা, আঁকাবাঁকা, সে জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব প্রতিকূলতা দূর করা সম্ভব বলে তিনি অংশীজনদের আশ্বস্ত করেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের যুগ্ম পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, হালে আমাদের নদীবন্দর ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোর উন্নয়নকাজ দ্রুতগতিতেই এগোচ্ছে। ছয়টি নদীবন্দরে ভারতীয় জাহাজ ভিড়তে পারছে। নদীগুলোর নাব্যতা বাড়াতে ভারত-বাংলা যৌথ ড্রেজিং কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের  এই কাজে বিনিয়োগে দুই দেশ রাজি হয়েছে। বাংলাদেশে ড্রেজিং কার্যক্রম একটি সুপরিকল্পিত মাস্টার প্ল্যানের অধীনে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।

ভারতের নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ভাইস চেয়ারম্যান প্রবীর পাণ্ডে হালে নদী পরিবহনব্যবস্থায় ভারত সরকারের গভীর আগ্রহ ও বাড়তি বিনিয়োগের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, এরই মধ্যে ভারত সরকার নয়া পানি আইন পাস করেছে। ১১১টি জাতীয় পানিপথ উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জাতীয় পানিপথ-১ ও জাতীয় পানিপথ-২ নামের দুটি উন্নয়ন কর্মসূচি এখন বাস্তবায়নাধীন। প্রথমটির দৈর্ঘ্য এক হাজার ৬২০ কিলোমিটার। হালদিয়া-এলাহাবাদ অংশে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দ্বিতীয়টির দৈর্ঘ্য ৮৯১ কিলোমিটার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নৌপথগুলোর সঙ্গে সংযোগ ঘটানো হবে। এসব কর্মসূচির অধীনে হালদিয়া, শিবগঞ্জ ও বানারসিতে মাল্টি-মোডাল টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। কালুরঘাট ও গাজীপুরে ইন্টার-মোডাল টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। গাজীপুর ও শিবগঞ্জে এলএনজি পরিবহনব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধে নয়া প্রশস্ত নেভিগেশনাল লক তৈরি করা ছাড়াও রোল-অন-রোল-অফ (রো-রো) টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধের এই লক দিয়ে তিন মিটার পানি ডিঙিয়ে পারাপার করার মতো জাহাজ ব্যবহার করার কথা ভাবা হচ্ছে। একটি জার্মান কম্পানি ১.২ থেকে ১.৮ মিটার গভীর পানি দিয়ে বয়ে যেতে পারে, তেমন জাহাজ তৈরির চেষ্টা করছে। মি. পাণ্ডে জানালেন, এই নদীপথ সম্পর্কিত প্রকল্পগুলোর অভ্যন্তরীণ লাভের হার ২৪ শতাংশ হবে। ভারতীয় বিনিয়োগ শর্ত হচ্ছে ন্যূনতম ১২ শতাংশ। তাই সহজেই এসব প্রকল্পের জন্য অর্থ মিলছে। তা ছাড়া এখন কেন্দ্রীয় সড়ক তহবিলের ২.৫ শতাংশ নৌপরিবহনব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে। এ বছর সে জন্য দুই হাজার কোটি টাকা মিলেছে। আগে ৬০ থেকে ৮০ কোটির বেশি পাওয়া যেত না। এ থেকেই বোঝা যায় নৌপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে ভারত সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। নদী প্রশিক্ষণ, পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক প্রভাব, পণ্য পরিবহন চাহিদা ও প্রকৌশলগত নানা দিক নিয়ে নানা মাত্রিক জরিপ ও গবেষণার কাজ পুরোদমে চলছে। ভারতের নদীপথগুলোর উন্নয়নের সময় বাংলাদেশের নৌপরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরী সংযোগ স্থাপনেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ওপরের আলোচনা থেকেই বোঝা যায়, বিবিআইএন উপ-অঞ্চলে নৌপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে ভারত সরকার কতটা আগ্রহী। ভুটান ও নেপালের প্রতিনিধিরাও ভারতীয় নদীব্যবস্থার এই উন্নয়ন পরিকল্পনায় বেশ খুশিই মনে হলো। বিশেষ করে নেপালের সাবেক সচিব মি. ওঝা বেশ স্পষ্ট করেই বললেন যে বর্তমানে কলকাতা বন্দর খুবই অদক্ষ। তাই তাদের পণ্য খালাসে প্রচুর সময় লাগে। মি. পাণ্ডে জানালেন, হালদিয়া মাল্টি-মোডাল টার্মিনালটি নির্মাণ হয়ে গেলে এ সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে। একই সঙ্গে মি. ওঝা বাংলাদেশের সমুদ্র ও নদীবন্দরগুলো ব্যবহারের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ভুটানের প্রতিনিধিও অনুরূপ আশাবাদ ব্যক্ত করলেন। উভয় দেশের জন্যই মাল্টি-মোডাল পরিবহনব্যবস্থাই যুক্তিযুক্ত হবে বলে সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা জানালেন।

প্রথম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আমি বলেছি যে বিশ্ববাণিজ্যের ধারার তুলনায় বিবিআইএন উপ-অঞ্চলের বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই সামান্য। তবে হালে এই উপ-অঞ্চলের সরকারগুলো ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মাঝে নতুন করে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। স্থলবন্দরগুলোর পাশাপাশি নৌবন্দর ও নৌপথের উন্নয়নে সবাই বাড়তি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের মধ্যে ২৭ শতাংশ বাণিজ্য হয়। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় এর পরিমাণ ৬ শতাংশ। আর এই উপ-অঞ্চলের আন্ত বাণিজ্যের পরিমাণ তো আরো কম। তবে যেমনটি বলছিলাম, এই উপ-অঞ্চলের নীতিনির্ধারক ও ব্যক্তি খাতের অংশীজনদের মাঝে আন্ত বাণিজ্যের প্রসারে আগ্রহ বাড়ছে। যেহেতু নৌপরিবহনে খরচ কম, তাই এ ব্যবস্থার উন্নয়নে এ উপ-অঞ্চলের সবাই উৎসাহী। ২০১৫ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ-ভারত নৌপরিবহন প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যেও অনুরূপ একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এ দুটি প্রটোকল স্বাক্ষর হওয়ার কারণে এই উপ-অঞ্চলের মানুষের মনে যথেষ্ট আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছে। তবে বেশি হারে বাণিজ্য বাড়াতে হলে এ অঞ্চলের সরকারগুলোকে নদী সম্পর্কিত অবকাঠামো উন্নয়নে বিরাট অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হবে। ভারত যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, বাংলাদেশও একই পথে হাঁটছে। আশা করছি, সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও এগিয়ে আসবে। আগেই বলেছি, বাংলাদেশকে দেওয়া ভারতীয় ঋণের একটি অংশ নদীর অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছে উভয় দেশ। এই ঋণের অংশ আরো বাড়ানো যেতে পারে। রেলের উন্নয়নে যথার্থ কারণেই এই ঋণ বেশি করে যাচ্ছে। তবে নৌপরিবহনের উন্নয়নও বাণিজ্য প্রসারে সম্পূরক ভূমিকা রাখবে।

বাড়তি এই বিনিয়োগের বড় অংশ নদীর নাব্যতা বাড়ানো ও তা সংরক্ষণে ব্যবহৃত হওয়া উচিত। আমাদের দু-দেশীয় প্রটোকল ছাড়াও বাংলাদেশ সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। তবে এ জন্য যে ড্রেজিং করা হচ্ছে একে ঘিরে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথম ড্রেজিং প্রযুক্তি কী রকম হওয়া উচিত সে বিষয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কত গভীরতার জন্য ড্রেজিং করা হবে, ড্রেজিং করা মাটির একটা অংশ কি মূল চ্যানেলের বাইরে পানিতেই রাখা হবে, নাকি সব মাটিই ডাঙায় তোলা হবে—এসব প্রশ্নের যথার্থ উত্তর খুঁজতে হবে। আমাদের নদীগুলো খুবই চঞ্চল। যে পাড়ে মাটি ফেলা হবে সেই পাড় কত উঁচু করা হবে? সেই মাটির পাহাড় দিয়ে কী হবে? নাকি এই মাটি রাস্তা করার মতো উন্নয়ন কর্মসূচিতে নেওয়া হবে? অথবা নদীর দুই পাড়ে মাটি ফেলে মজবুত করে নদীশাসনের ব্যবস্থা করা হবে? তা ছাড়া ভারত জার্মান প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেমন অপেক্ষাকৃত কম গভীর চ্যানেলে চলার মতো নয়া ধাঁচের জাহাজ তৈরির চেষ্টা করছে, আমরাও কি সে রকম উদ্যোগ নিতে পারি না? এ সবই প্রযুক্তি সম্পর্কিত কারিগরি প্রশ্ন। এই উপ-অঞ্চলের সরকারগুলো চাইলে কারিগরি তথ্য আদান-প্রদান করে টেকসই নাব্যতা ও উপযুক্ত জাহাজ তৈরির কাজটি করতে পারে। আশা করছি পারস্পরিক সহযোগিতায় যে নয়া পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমরা সবাই উপকৃত হই, এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তবে টেকসই পরিবেশ ভাবনাকে অবশ্য অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারলে নিঃসন্দেহে নদীপথে পণ্য পরিবহন খুবই সস্তা হতে বাধ্য। এর সুফল সব মানুষের জন্যই কাম্য। নদীর ওপর জীবন-জীবিকার জন্য নির্ভরশীল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাতে বিঘ্নিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অবশ্য নদীর নাব্যতা টেকসই হলে, নৌপরিহন সচল থাকলে নদীর আশপাশে অনেক ল্যান্ডিং স্টেশন গড়ে উঠবে। এর আশপাশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আয়-রোজগার বাড়বে। ছোট-বড় শিল্পও গড়ে উঠবে। খেয়াল রাখতে হবে, এসব শিল্প যেন পরিবেশদূষণ বাড়িয়ে না ফেলে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত উদ্যোগ যেন তারা নেয় সেদিকটা খেয়াল রাখতে হবে। এরই মধ্যে নদীর পারে অনেক শিল্প-কারখানা বর্জ্য শোধনাগার ছাড়াই গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনা থেকে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। পরিবেশগত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণকে সমানভাবে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার করার জন্য উদ্যোক্তাদের ওপর সামাজিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

যখন বড় বড় জাহাজ টেকসই চ্যানেলে চলবে, তখন নদীতে চলাচল করা ছোট ছোট নৌকার চাহিদা কমে যাবে। তারা যাতে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালে চলতে পারে সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে। এরা যদি পেশা বদলাতে চায়, তাহলে সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল অথবা স্বল্পসুদে এসএমই ঋণ দিয়ে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি গতিময় পরিবহনের কারণে জেলেদের মাছ ধরা ব্যাহত হয়, তাহলে তাদেরও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা লক্ষ করেছি, মা ইলিশের পোনা ছাড়ার সময় জেলেদের সামাজিক সংরক্ষণের কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ সরকার। সেই আদলে এদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা যায় কি না সে কথাও নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।

নদীগুলো সচল থাকলে এই উপ-অঞ্চলে  র্জাতিক ও দেশীয় ক্রুজসহ পর্যটন পরিবহনের নানা সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভাবের সুযোগ বাড়বে। কর্মসংস্থানও বাড়বে। পাশাপাশি স্বদেশের ঐতিহ্য বিদেশিদের দেখানোও সম্ভব হবে। পর্যটন বাণিজ্যেও সহযোগিতা বাড়বে। অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আশার কথা, এই উপ-অঞ্চলের দেশগুলোর ব্যক্তি খাত এদিকে এগোচ্ছে।

সবশেষে আমি বলেছি যে এ ধরনের নীতি-সংলাপ এই উপ-অঞ্চলের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। একদিকে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যক্তি খাতও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে যেসব বাধাবিপত্তির মুখে পড়ে, তা সবার সামনে তুলে ধরতে পারবে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরদের মন বদলাবে এবং সহায়ক নীতিমালা তৈরির পথ সুগম হবে। বিবিআইএনকে আরো সম্প্রসারণ করে শ্রীলঙ্কাকেও যুক্ত করতে পারলে এই উপ-অঞ্চলের বাণিজ্যের আকার নিঃসন্দেহে বাড়বে। তখন নৌপরিবহনের চাহিদাও বাড়বে।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমাদের নগর সভ্যতা নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে। নদী সরে গেলে নগর-বন্দর মরে যায়। এমনকি সেখানকার বৃক্ষে পাখিও বসে না। সেদিক থেকে ভাবলে নদীর আরেক নাম জীবন। আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথি। ’ তাই আসুন, আমরা আমাদের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে, ভালোভাবে বাঁচার জন্যই নদীগুলোর সংস্কার করি। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে আসুন আমরা সবাই মিলে নদী বাঁচাই, তার নাব্যতা বাড়াই এবং প্রযুক্তির প্রয়োগে উপযুক্ত নৌপরিবহন গড়ে তুলি। আর তা করা গেলে এই উপ-অঞ্চলের সবারই জীবনের মান উন্নত হবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক
ইমেইল : dratiur@gmail.com

Loading...