ঢাকা, সোমবার, ২০ নভেম্বর ২০১৭ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

‘পেপালের বিতর্কিত অধ্যায়টি একটি বড় সংকটের বহি:প্রকাশ’


ফাহিম মাসরুর

প্রকাশিত: ০৮:০৮ এএম, ১৯ অক্টোবর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৮:০৮ এএম, ১৯ অক্টোবর ২০১৭, বৃহস্পতিবার
‘পেপালের বিতর্কিত অধ্যায়টি একটি বড় সংকটের বহি:প্রকাশ’

কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশে PayPal উন্মোচন করা নিয়ে সরব রয়েছে ফেসবুক দুনিয়া। কেউ বলছেন PayPal। আবার কেই বলছেন এটি PayPal নয়। এবার এ বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলেন সাবেক বেসিস সভাপতি ও বিডিজবসের সিইও ফাহিম মাসরুর।

এক ফেসবুকে পোস্টে তিনি লিখেছেন, গত কয়েকদিনে PayPal নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেই ব্যাপক তোলপাড় হচ্ছে দেশের আইটি খাত নিয়ে অন্য যেকোনো সময়ে সেরকম হয়েছে বলে মনে হয় নাI এই বিষয়ে তেমন কিছু বলার ইচ্ছা ছিল না কেননা ব্যাপারটা একটু বেশিই `তিতা` হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে এবং বরাবরের মতো এক্ষেত্রেও যতটা না তথ্য-যুক্তি দিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার থেকে বেশি কাদা ছোড়াছুড়ি বেশি হচ্ছেI

তারপরেও কিছু বলা দরকার বলে মনে করছি যেহেতু PayPal-এর ব্যাপারে ব্যক্তিগত ভাবে অতীতে একটি সময় `এনগেজড` ছিলামI ২০১২ সালে আমি যখন বেসিস-এর সহ-সভাপতি ছিলাম, তখন বাংলাদেশ ও বেসিস-এর পক্ষ থেকে প্রথম PayPal - এর সাথে যোগাযোগ করিI PayPal -এর আমন্ত্রণে আমি ২০১২ সালের মার্চ মাসে তাদের প্রধান কার্যালয়ে যাইI এর ফলোআপ হিসাবে PayPal -এর একটি প্রতিনিধি দল সেই বছর ঢাকায় আসেI বেসিস তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ডঃ আতিউর রহমানের সাথে এবং তিনটি ব্যাংক (ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ বাংলা ও ব্যাংক এশিয়া) সাথে মিটিং আয়োজন করে দেয় I তারা কয়েকজন ফ্রি-ল্যান্সার ও আউটসোর্সিং কোম্পানির সাথেও বেসিস অফিসে মিটিং করেI সেই সময় PayPal বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কিছু সুপারিশ করে (ভারতে যেভাবে পেপাল কাজ করছে তার ভিত্তিতে) এবং তৎকালীন গভর্নর এক মাসের মধ্যেই নতুন সার্কুলার (https://www.bb.org.bd/fnansys/paymentsys/onlinepay.php) ইস্যু করে PayPal ও একই ধরণের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে যাতে বাংলাদেশে কাজ করতে পারে I সেই সময়ে PayPal আমাদের জানিয়েছিল যে যেহেতু PayPal একটি অনেক বড় সিস্টেম, কোনো একটি দেশের জন্য `কাস্টোমাইস` করাটা অনেক খরচসাপেক্ষI কিন্তু তারা কয়েকটি দেশকে নিয়ে নতুন একটি সিস্টেম চালু করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেI

বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্য যে ২০১৩ সালে PayPal-এর সিনিয়র ম্যানেজমেন্টে একটি বড় ধরণের পরিবর্তন আসে এবং নতুন কিছু দেশে PayPal সার্ভিস চালু হবার সেই পক্রিয়া থেমে যায়I আমার জানা মতে এর পরে সরকারি পর্যায়ে কয়েকবার যোগাযোগ করা হয়েছে PayPal-এর সাথেI কিন্তু PayPal থেকে নির্দিষ্ট করে কখনো বলা হয় নি যে কবে তারা বাংলাদেশে তাদের সার্ভিস চালু করবে I ২০১৫ সালে PayPal আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার কোম্পানি Xoom কে অধিগ্রহণ করেI এই পর্যায়ে জানানো হয় যে PayPal নিজের সার্ভিস নিয়ে না আসলেও Xoom-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে টাকা বাংলাদেশ সহ অনেক দেশে পাঠানোর সুযোগ আছে এবং তারই পরবর্তী পর্যায় হিসাবে সোনামি ব্যাংকের সাথে Xoom- এর চুক্তি হয় ২০১৬ সালেI

একথা ঠিক যে Xoom এর মাধ্যমে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে টাকা পাঠানো যায়, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যেই কারণে আউটসোর্সিং কোম্পানি বা ফ্রি-ল্যান্সাররা PayPal সার্ভিস চাচ্ছে , তে Xoom দিয়ে এখনই হবার কথা না I আমি ওয়ালেট বা outbound -এর কথা বলছি না (ব্যক্তিগত ভাবে আমি এই দুটিকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না)I  প্রধান সমস্যা হচ্ছে অনেক ছোট আউটসোর্সিং ক্লায়েন্ট যারা নিয়মিত ভাবে PayPal ওয়ালেট ব্যবহার করে অভ্যস্ত, বর্তমান Xoom-এর সিস্টেম দিয়ে সে বাংলাদেশের কাউকে সরাসরি টাকা পাঠাতে পারবে নাI ক্লায়েন্টকে তার ব্যাংক একাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে হবে যা অনেক ক্ষেত্রেই ক্লায়েন্ট করতে চায় নাI প্রধান সমস্যাটা এখানেইI

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, PayPal এবং Xoom -এর ব্যাপারগুলো তো সরকারি পর্যায়ে অজানা নাI তাহলে কেন এতো বিতর্ক তৈরী করার সুযোগ তৈরী হোলো?

আমি মনে করে PayPal এর বিতর্কিত অধ্যায়টা একটি বড় সংকটের বহিঃপ্রকাশI এটি নিয়ে আমি আগেও লিখেছিI গত কয়েক বছর আমরা আইটি ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে `অতিরঞ্জিত` তথ্য আর `অবাস্তব` স্বপ্ন তৈরী করছিI আউটসোর্সিং নিয়ে আমরা যে খবরগুলো গর্বের সাথে প্রচার করি তার ভিত্তি কত দুর্বল তা যারা আসলে কষ্ট করে আউটসোর্সিং করে তারাই জানেI আমরা বলে বেড়াচ্ছি আমরা ১ বিলিয়ন দলের এক্সপোর্ট করছি, প্রকৃতভাবে যা এর তিন ভাগের এক ভাগ! আমরা বলছি আউটসোর্সিং-এ আমরা পৃথিবীতে দ্বিতীয়! কিন্তু বলছি না, এটি আসলে ফ্রি-ল্যানসিং মার্কেটপ্লেস গুলোতে রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যায় (যাদের বেশির ভাগ কোনো কাজ পায় নি কখনো), কাজের ভ্যালুতে আমরা অনেক পিছিয়েI আমাদের দেশে এখনো কোনো বড় কর্পোরেট আউটসোর্সিং কোম্পানি তৈরী হয় নি, অনেকে বন্ধই হয়ে গেছেI মোবাইল এপ নিয়ে আমরা কোটি কোটি টাকা খরচ করছি , কিন্তু এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে সফল কোনো দেশে তৈরী হয় নিI কয়েকশো আইটি কোম্পানি গত কয়েক বছরে বন্ধ হয়ে গেছে, তার খবর কেউ রাখে নি, কিন্তু এদিকে জেলায় জেলায় আই টি পার্ক হচ্ছে! স্টার্ট-আপ দেড় কথা নাই বললাম! দেশে নাকি ৭-৮ কোটি লোক (অর্ধেক জনসংখ্যা) ইন্টারনেট ব্যবহার করে, কিন্তু ব্যান্ডউইডথ অব্যবহৃত পরে আছে!

আসলে আমরা বেলুন ফোলাতে, আর নিজেরাই নিজেদের বোকা বানাতে এতো ব্যস্ত যে কোনটা ঠিক, আর কোনটা বেঠিক তাই গুলিয়ে ফেলিI

আমি মনে করি PayPal সার্ভিস বাংলাদেশে আনা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে (মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক) কোনো কমিটমেন্টের বা চেষ্টার ঘাটতি ছিল নাI PayPal তার `কোর` সার্ভিস নিয়ে আসছে না তার নিজস্ব কারণেI হয়তো ভবিষ্যতে আসবেI কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে `অতিরঞ্জন` আর `সস্তা বাহবা` (যেটি গত কয়েক বছর আমরা দেখছি আই টি ইন্ডাস্ট্রিতে) নেবার প্রক্রিয়ায় এই অনাহুত বিতর্ক তৈরী হয়েছেI

আশা করছি যাদের এখন থেকে শিক্ষা নেবার দরকার, তারা কিছুটা শিক্ষা নিবেI আসুন এইবার ‘কথা কম বলে, মধ্যে নেমে আসল কাজ শুরু করি’।

অমৃতবাজার/রেজওয়ান

Loading...