ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৭ | ২ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

‘মানুষরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না’


ড. আতিউর রহমান

প্রকাশিত: ০১:৫৯ পিএম, ১১ আগস্ট ২০১৭, শুক্রবার | আপডেট: ০২:১৩ পিএম, ১১ আগস্ট ২০১৭, শুক্রবার
‘মানুষরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না’

শোকাবহ আগস্ট
আবার এসেছে আগস্ট। আমাদের শোকের ও দুঃখের মাস। এ মাসেই আমরা হারিয়েছি আমাদের জাতির পিতাকে। সকল অর্থেই তিনি ছিলেন গরিবের বন্ধু। ছিলেন সাধারণের ভরসার প্রতীক। একেবারে ছোটবেলা থেকেই তার ভীষণ ঝোক ছিল গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কম বয়সেই বাংলার প্রধান প্রধান রাজনীতিকদের সঙ্গে ঘটে তাঁর নিবিড় পরিচয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি সাধারণের দুঃখমোচনের দীক্ষা নেন। তাঁর লেখা ডায়েরিভিত্তিক দুটো বই `অসমাপ্ত আত্মজীবনী` ও `কারাগারের রোজনামচা`র পাতায় পাতায় তাঁর এই গরিব-হিতৈষী মন-মানসিকতার প্রতিফলন চোখে পড়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চমৎকার সম্পাদনায় বই দুটো প্রকাশিত হয়েছে। `অসমাপ্ত আত্মজীবনী`র শুরুতেই দেখতে পাই, তিনি কত কম বয়সেই গরিব ছাত্রদের লেখাপড়ার জন্য বই কেনা ও অন্যান্য সাহায্যের ব্যবস্থা করতে তার গৃহশিক্ষকের হাত ধরে প্রয়োজনীয় মুষ্টি চাল সংগ্রহের কাজে নেমে পড়েছেন। ১৯৩৭ সাল। ক্লাস সেভেনের ছাত্র মুজিব কী করে এই মানবিক কাজে নেমে পড়েছিলেন, সে কথা তাঁর মুখ থেকেই শোনা যাক।

"এই সময় আব্বা কাজী আব্দুল হামিদ এমএসসি মাস্টার সাহেবকে আমাকে পড়াবার জন্য বাসায় রাখলেন। তাঁর জন্য একটা আলাদা ঘরও করে দিলেন। ... মাস্টার সাহেব গোপালগঞ্জে একটা `মুসলিম সেবা সমিতি` গঠন করেন, যার দ্বারা গরিব ছেলেদের সাহায্য করতেন। মুষ্টিভিক্ষা চাল উঠাতেন সকল মুসলমান বাড়ি থেকে। প্রত্যেক রবিবার আমরা থলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে চাউল উঠিয়ে আনতাম এবং এই চাল বিক্রি করে তিনি গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার ও অন্যান্য খরচ দিতেন। ঘুরে ঘুরে জায়গিরও ঠিক করে দিতেন। আমাকেই অনেক কাজ করতে হত তাঁর সাথে। হঠাৎ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তখন আমি ঐ সেবা সমিতির ভার নেই এবং অনেকদিন পরিচালনা করি।" (`অসমাপ্ত আত্মজীবনী`, পৃ. ৯)

১৯৪৩ সাল। সারাবাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। সেই দুঃসময়ে তরুণ শেখ মুজিব কী ভাবছেন, কী করছেন তা জানতে পারি তাঁর লেখা ডায়েরির পাতা থেকে। "সেই বাংলাদেশের এই দুরবস্থা চোখে দেখেছি যে, মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মার দুধ চাটছে। কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবার জন্য কাড়াকাড়ি করছে। ছেলেমেয়েদের রাস্তায় ফেলে দিয়ে মা কোথায় পালিয়ে গেছে। পেটের দায়ে নিজের ছেলেমেয়েকে বিক্রি করতে চেষ্টা করছে। কেউ কিনতেও রাজি হয় নাই। বাড়ির দুয়ারে এসে চিৎকার করছে, `মা বাঁচাও, কিছু খেতে দাও, মরে তো গেলাম, আর পারি না, একটু ফেন দাও।` এই কথা বলতে বলতে ঐ বাড়ির দুয়ারের কাছেই পড়ে মরে গেছে। আমরা কি করব? হোস্টেলে যা বাঁচে দুপুরে ও রাতে বুভুক্ষুদের বসিয়ে ভাগ করে দেই, কিন্তু কি হবে এতে?" (ঐ, পৃ. ১৮)। দুর্ভিক্ষকবলিত মানুষগুলোর জন্য এই যে দরদ তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে, তা সত্যি লক্ষ্য করার মতো।

ওই পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর সহযোগী ছাত্রদের নিয়ে অভুক্ত মানুষদের বাঁচানোর কাজে নেমে পড়লেন। লঙ্গরখানা খুলে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, "এই সময় শহীদ সাহেব লঙ্গরখানা খোলার হুকুম দিলেন। আমিও লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনেকগুলো লঙ্গরখানা খুললাম। দিনে একবার করে খাবার দিতাম।... দিনভর কাজ করতাম, আর রাতে কোনোদিন বেকার হোস্টেলে ফিরে আসতাম, কোনোদিন লীগ অফিসের টেবিলে শুয়ে থাকতাম।" (ঐ, পৃ. ১৮)। দুর্ভিক্ষের ঐ দিনগুলোতে তিনি আর্তমানবতার যে সেবা করেছেন, তার মাধ্যমেই এক বিরাট হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার শিক্ষা তিনি পেয়েছেন। ক্লাসের শিক্ষার চেয়ে জীবনের শিক্ষা যে চিরস্থায়ী হয়, সে বিষয়টি তাঁর পরবর্তী জীবনে আমরা দেখতে পাই।

তিনিও পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ কর্রেিছলেন। মুসলিম লীগের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি লক্ষ্য করলেন, "স্বাধীন দেশের স্বাধীন জনগণকে গড়তে হলে এবং তাদের আস্থা অর্জন করতে হলে যে নতুন মনোভাবের প্রয়োজন ছিল তা এই নেতৃবৃন্দ গ্রহণ করতে পারলেন না।" (ঐ পৃ. ৯০)। তদ্দিনে মুসলিম লীগ নেতৃত্বে নওয়াব-জমিদার-আমলারা এসে গেছেন। সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা অবাঞ্ছিত। সাধারণ মানুষের স্বার্থ দেখার কেউ নেই।

শেখ মুজিব কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে এলেন। প্রথমে ছাত্রদের মাঝে এবং পরে আরও বৃহত্তর পরিবেশে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ার কাজে মনোযোগী হলেন। এই পর্যায়ে কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গে তাঁর মনের মিল হচ্ছিল না। তিনি মনে করতেন তাদের উদ্দেশ্য মহৎ। কিন্তু তাদের কৌশল তাঁর মনের মতো ছিল না। তাই তাদের তিনি বলতেন, "জনসাধারণ চলেছে পায়ে হেঁটে, আর আপনারা আদর্শ নিয়ে উড়োজাহাজে চলছেন। জনসাধারণ আপনাদের কথা বুঝতেও পারবে না, আর সাথেও চলবে না। যতটুকু হজম করতে পারে এতটুকু জনসাধারণের কাছে পেশ করা উচিত।" (ঐ, পৃ. ১০৯)। জনগণের মনোভাব বোঝা, তাদের ভাষায় কথা বলা, তাদের মাঝে বিচরণ করায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। আর এই বিশ্বাসই তাঁকে গণমানুষের নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। এই সময়টায় তিনি বুঝতে পারলেন যে, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার চাহিদা ব্যাপক। ছাত্র-ছাত্রীদের বাইরেও সাধারণ মানুষ এই প্রশ্নে খুবই উদ্বেলিত। তারই এক খণ্ডচিত্র তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর ডায়েরির পাতায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার নবীনগর থানার কৃষ্ণনগর হাই স্কুলের দ্বারোদ্ঘাটন করার জন্য এক সভার আয়োজন করেন জনাব রফিকুল হোসেন। ওই সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। বক্তৃতাও করেছিলেন। ঢাকা থেকে গানের শিল্পী আব্বাসউদ্দীন, বেদারউদ্দীন ও সোহরাব হোসেনও গিয়েছিলেন। তারা আশুগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন ধরতে নৌকায় করে ফেরার পথে গান করছিলেন। আব্বাসউদ্দীন তাঁকে বলেছিলেন, "মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে। আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখার চেষ্টা করেছিলাম।" (ঐ, পৃ. ১১১)।

আর কে না জানেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা আন্দোলন চাঙ্গা করার জন্য তিনি কতটা সক্রিয় ছিলেন। এ জন্য জেলও খেটেছেন। জেলে বসেই বন্ধু ছাত্র নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন এবং ভাষা আন্দোলনকে সাফল্যের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন।

ভাষা আন্দোলন শেষে তিনি মূলধারার রাজনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নেন। বাঙালির দুঃখমোচনে প্রথমে `আওয়ামী মুসলিম লীগ` এবং পরে অসাম্প্রদায়িক `আওয়ামী লীগ`-এর ব্যানারে বিক্ষুব্ধ বাঙালিদের সংগঠিত করার কাজে নেমে পড়েন। ফলে জেলই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। আর জেলে বসেও তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ নিরসনে উদ্যোগী হতেন। ফরিদপুর জেলের জেলারকে তিনি সাধারণ কয়েদিদের ঘানি টানার মতো অমানবিক কাজ বন্ধ করার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর নিজের ভাষায়, "ফরিদপুর জেলে তখনও ঘানি ঘুরিয়ে তেল করা হচ্ছিল। আমি জেলার সাহেবকে বললাম, `এখনও আপনার জেলে মানুষ দিয়ে ঘানি ঘুরান?` তিনি বললেন, কয়েকদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে। গরু কিনতে দিয়েছি।` কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন।" (ঐ, পৃ. ১৮২)। এভাবেই তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করতেন। মানুষের দুঃখমোচনে সচেষ্ট হতেন।

জেল থেকে বের হয়ে তিনি অন্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করে ১৯৫৪-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গড়ার কাজে মনোনিবেশ করলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান এই যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্বে থাকলেও শেখ মুজিবের সাংগঠনিক সক্রিয়তা দারুণ কাজে লেগেছিল। ওই নির্বাচনে তিনিও প্রার্থী ছিলেন। গ্রামে-গঞ্জে হেঁটে হেঁটে নির্বাচনী প্রচার চালাতেন। সেই সময়ের একটি ঘটনা তাঁর ডায়েরিতে ধরা পড়েছে। এই ঘটনাই বলে দেয় তিনি গরিবের কতটা কাছের মানুষ ছিলেন। "আমার মনে আছে খুবই গরিব এক বৃদ্ধ মহিলা কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, শুনেছে এই পথে আমি যাব, আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বলল, "বাবা আমার এই কুঁড়েঘরে তোমায় একটু বসতে হবে।" আমি তার হাত ধরেই তার বাড়িতে যাই। অনেক লোক আমার সাথে, আমাকে মাটিতে একটা পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা এনে আমার সামনে ধরে বলল, "খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছুই নাই।" আমার চোখে পানি এল। আমি দুধ একটু মুখে নিয়ে, সেই পয়সার সাথে আরও কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম, "তোমার দোয়া আমার জন্য যথেষ্ট। তোমার দোয়ার মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না।" টাকা সে নিল না; আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল, "গরিবের দোয়া তোমার জন্য আছে বাবা।" নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল, যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। সেই দিনই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, `মানুষরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না।` (ঐ, পৃ. ২৫৫-৫৬)।

এ রকম অসংখ্য ঘটনা তখন ঘটেছিল। সাধারণ মানুষের খুব কাছে তিনি যেতে পেরেছিলেন। এ দেশের মানুষ যে তাঁকে কত ভালবাসেন সেটা তিনি নির্বাচনী প্রচারে নেমে টের পেয়েছিলেন। এর ফলে তাঁর মনে এক বিরাট পরিবর্তন আসে। সর্বক্ষণ সাধারণ মানুষের দুঃখ নিরসনের কথা ভাবতেন। নির্বাচন যুক্তফ্রন্ট ব্যাপক ভোটে জয়ী হলো। শেরেবাংলার নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হলো। তিনিও মন্ত্রী হলেন। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রে ওই সরকার বেশিদিন টিকল না। ফের তিনি কারাগারের অধিবাসী হলেন। কখনও রাজবন্দি কখনও-বা সাধারণ বন্দি হিসেবে তিনি জেল খেটেছেন। জেল খাটার সময় কত সাধারণ মানুষের দুঃখের কথা যে তিনি জেনেছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আর সেসব কথাই স্থান পেয়েছে তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ `কারাগারের রোজনামচা`য়। এ বইয়ের পাতা থেকে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরতে চাই। এ থেকেই বোঝা যাবে তিনি কতটা গরিব-হিতৈষী ছিলেন। তাছাড়া তিনি নিজেও জেলে কী পরিমাণ কষ্টের দিন কাটিয়েছেন, তাও ধরা পড়েছে তাঁর লেখা এই বইতে। তাঁকে ফরিদপুর জেলে আনা হয়েছিল সাধারণ কয়েদি হিসেবে। তাই তিনি লিখেছেন, "ফরিপুর জেলে এসে একলা পড়লাম। রাজবন্দিরা আছে। তাদের আলাদা জায়গায় রাখা হয়েছে। আর আমাকে রাখা হয়েছে একলা এক জায়গায়। হাসপাতালের একটা রুম ছেড়ে দিল, সেখানেই থাকলাম। ... আমাকে ফরিদপুর জেলায় আনার পর কাজ দেওয়া হলো, সুতা কাটা, কারণ এখন আর আমি রাজবন্দি নই, কয়েদি। আর কয়েদির কাপড় পরতে হতো। তিন মাস খেটে ফেললাম, আমারও সাজাও খাটা হয়ে গেল। আবার রাজনৈতিক বন্দি হয়ে গেলাম।" (`কারাগারের রোজনামচা`, পৃ. ৪১)। কল্পনা করতে পারেন এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কী অনায়াসে তিন মাস ধরে কয়েদির পোশাক পরে সুতা কাটার কাজ করে গেলেন। এভাবেই কষ্টে কষ্টে তিনি খাঁটি মানুষ হতে পেরেছিলেন। সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বোঝার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন।

জেল ছিল তাঁর প্রায় স্থায়ী ঠিকানা। তাই তিনি জেলের সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে খুব বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রাখতেন। তাদের জীবনের দুঃখের দিকগুলো বোঝার চেষ্টা করতেন। এমনি এক কয়েদির নাম লুদু। যাকে তিনি বারে বারে ঢাকা জেলে পেয়েছেন। কী কারণে লুদু প্রথমে পকেটমার, পরে চোরের পেশায় জড়িয়ে পড়লেন, তার পারিবারিক জীবনের দুঃখের কথা- প্রায় ছয় পৃষ্ঠা (৪৮-৫৪) ব্যাপী তিনি বর্ণনা করেছেন। একইভাবে তাঁর লেখায় স্থান পেয়েছে জমাদার. মেট, পাহারাসহ নানাজনের কথা। স্থান পেয়েছে ৬-দফা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-যুবক-সাধারণ মানুষের কথা। ৭ জুন ১৯৬৬ সালে সারা বাংলায় ৬-দফার দাবিতে হরতাল হয়। সে দিন অনেকেই শহীদ হন। শত শত কর্মীকে জেলে আনা হয়। তাদের জন্য কি তাঁর উৎকণ্ঠা। একটু খাবার, চিকিৎসার জন্য জেলারকে বারে বারে অনুরোধ করা, রাতে ঘুমাতে না পারা_ এসব থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তিনি এ দেশের মানুষকে কত গভীরভাবেই না ভালোবাসতেন। আর এ দেশের মানুষও তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। সে কারণেই তিনি এত কষ্ট করে জেলের মধ্যেও আশাবাদী এক জীবন কাটাতেন। ভাবতেন, একদিন এই দুঃখের দিন শেষ হবে। এ দেশের মানুষের মুক্তির দিন আসবে।

তিনি তাঁর সেই প্রতীজ্ঞা বাস্তবায়ন করেছিলেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাঙালির মুক্তির কথা বলেছেন। ফলে তাঁরই নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হলো। সেই স্বাধীন দেশের পুনর্গঠনে যখন তিনি পুরোপুরি নিবেদিত তখনই পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট ষড়যন্ত্রকারীরা অতর্কিতে আক্রমণ করে তাঁকে শারীরিকভাবে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু তাঁর কথা, তাঁর স্মৃতি, তাঁর দেশপ্রেম আজও সতেজ তাঁরই অর্জিত বাংলাদেশে। তাঁর দীঘল দেহ পড়ে আছে বাংলাজুড়ে, তিনি চিরঞ্জীব। তাঁর কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা গড়ার কাজে এখন ব্যস্ত তাঁরই সুকন্যা। আসুন, আমরা সকলে মিলেই বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য সোনার বাংলা বিনির্মাণের কাজে ব্রতী হই। তবেই না তাঁর বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক

অমৃতবাজার/জয়

Loading...