ঢাকা, বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৪ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

শিশুর শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালবাসার বিকৃত প্রকাশ!


মাশফাকুর রহমান

প্রকাশিত: ১১:৫৬ এএম, ২১ জুলাই ২০১৭, শুক্রবার
শিশুর শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালবাসার বিকৃত প্রকাশ!

সম্প্রতি বরিশালের উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার গাজী তারিক সালমান এর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ ও মামলার প্রেক্ষিতে পত্রিকা ও অনলাইন মাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় তৈরি হয়েছে। পত্রিকা মারফত তথ্য মতে, ২০১৭ সালের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালন উপলক্ষে ২৬ শে মার্চ জাতীয় দিবসের প্রোগ্রামের কার্ডে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিকৃতির জন্য তাঁর নামে মামলা হয়েছে।

২৬ মার্চ ২০১৭, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালন এর পুর্বে ১৭ মার্চ,২০১৭ জাতির পিতার জন্ম দিনে উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ নামে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কৃতদের উৎসাহিত করতে ছবি ব্যবহার করে ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ছাপানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী পুরস্কৃতদের হাতে আকা ছবি ব্যবহার করে ওই আমন্ত্রণপত্রটি ছাপানো হয়। কার্ডে দেয়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিটি একেছে পঞ্চম শ্রেনির একজন শিক্ষার্থী এবং কার্ডে সেটা বঙ্গবন্ধুর ছবির পাশে উল্লেখ করেও দেয়া আছে।

বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ ওবায়েদুল্লাহ সাজু আগৈলঝাড়ার ইউএনও গাজী তারেক সালমানের বিরুদ্ধে বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় ইউএনও সালমানকে কারাগারে প্রেরণ করেন বিজ্ঞ আদালত। আবার একই দিন জামিনও পেয়ে যান সালমান।

আওয়ামী লীগ নেতা সাজু মামলা বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই ছবিটিতে বঙ্গবন্ধুকে বিকৃত করা হয়েছে। এখানে বঙ্গবন্ধুর গালের উপরে একটি তিল দেওয়া হয়েছে ও চুলগুলো এলোমেলো করা। কিন্তু, মিঃ সাজু আদৌ জানেন নানা, বঙ্গবন্ধুর গালে সত্যিই তিল ছিল। অথচ, একজন কোমলমতি শিশুর হৃদয়পটে বঙ্গবন্ধুর মুখোচ্ছবি এতটা সুনিপুণ ভাবে গ্রথিত হয়েছে, যে ঐ পঞ্চমশ্রেনীর শিশুর চোখ ও এড়ায়নি। যাহোক, এই মামলা হয়েছে, জামিন যোগ্য ধারায়, অর্থাৎ আসামীর জামিন এখানে অধিকার। আদালত যদি তার অধিকার খর্ব করতে চাই, তবে সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক কারণ থাকা বাঞ্ছনীয়। যেমন : অভিযুক্ত ব্যক্তির পালিয়ে যাবার সম্ভাবনা; বাইরে থাকা বাদীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ; এবং গুরুতর অপরাধ। কিন্তু, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, এর ক্ষেত্রে কোন সম্ভাবনায় আছে বলে মনে করিনা। তাহলে, তার অপরাধ প্রমানিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে শাস্তি দেয়া হল কোন যুক্তিতে? প্রতিহিংসা, ঈর্ষাপরায়ণতা, ব্যক্তি স্বার্থ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা অন্য কিছু হয়তো।

যদি তাই হয়, তাহলে এর মধ্যে জাতির পিতার স্মৃতিতে এক অবুঝ শিশুর আকা ছবি নিয়ে রাজনীতি কতটা যৌক্তিক বা কি ইংগিত বহন করে তা ভাবা উচিত। বিচার বিভাগে বর্তমানে ৩১ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে, অসংখ্য অসহায় বিচার প্রার্থীর আর্তনাদে বিচারালয় প্রতিদিন ধুকে ধুকে কাঁদে। লক্ষ মামলার আসামীর জামিন হয়,আর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, যিনি শিশুদের মাঝে জাতির পিতাকে ছড়িয়ে দিতে; সমাজের নতুন প্রজন্মনের সামনে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নময় মুখোচ্ছবি কে ছড়িয়ে দিতে; এবং কোমলমতি শিশুদের মধ্যে জাতির পিতার স্বপ্নকে বুনে দিতে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তাকে হাজত খাটতে হল, এই ইতিবাচক কর্মের জন্য। আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সৎ সাহস ও সৃজনশীলতার জন্য সাধুবাদ জানায়। তাকে তার এই সৃজনশীল কাজের জন্য পুরস্কার দেয়া উচিত।

এর ফলে জাতির কাছে কি মেসেজ গেল সেটা ভাবা উচিত। বিচার বিভাগের ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে স্বার্থ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হল। জাতির পিতাকে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হোক; তার আদর্শ ও স্বপ্নময় প্রতিচ্ছবি অংকুরিত হোক; জাতির পিতার স্বাধীনতার সোনার বাংলা গড়বার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নতুন প্রজন্ম নব উদ্দমে শ্রদ্ধাভরে বঙ্গবন্ধুকে মানস পটে ধারণ ও লালন করুক এটা একটা হয়তো গোষ্ঠী চাইনা। একজন অবুঝ শিশুর রঙের তুলিতে অংকিত ছবি নিখুঁত নাও হতে পারে। কিন্তু, জাতির পিতার প্রতি ঐ শিশুর ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় কোন খুত নেই।

"

এখন হতে, কোন শিশু ও কিশোর স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জাতির পিতার ছবি আঁকতে শংকিত হবে; অনেক বাবা- মা অপ্রয়োজনীয় হয়রানী ও সমালোচনা এড়াতে তার সন্তানদের নিরুৎসাহিত করবে; এমন হাজতবাসের ভয়ে কোন সৃজনশীল সরকারী কর্মকর্তা হয়তো এভাবে নিজ উদ্যোগে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীন বাঙালি জাতির গর্ব ও অহংকারের নাম ‌‌‌‌‌`বঙ্গবন্ধু`র ছবি আঁকতে; গল্প লিখতে এবং বঙ্গবন্ধুর জীবনের সংগ্রামী ইতিহাস চর্চায় আগ্রহ দেখাবে না। আমরা যখন তাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় খুঁত ধরছি এবং তার বহিঃ প্রকাশ নিয়ে অযাচিত প্রশ্ন তুলছি, সেই প্রজন্মকে মূলত আমরা বঙ্গবন্ধুকে চিনতে দিতে চাইছিনা। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, রাষ্ট্রের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে যেভাবে ছোট করা হয়েছে, তার জন্য বাদী ও সংশ্লিষ্টদের বিচার হওয়া উচিত মানহানি দায়ে। পত্রিকার মাধ্যমে যতদুর জেনেছি,সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার একজন সৎ, সাহসী ও উদ্যমী কর্মকর্তা। তার অবমাননা মানে, রাষ্ট্রের অবমাননা, নির্বাহী বিভাগের অবমাননা এবং রাষ্ট্রী সিদ্ধান্তের অবমাননা।

লেখক: সহকারী কমিশনার (ভূমি), চিরিরবন্দর, দিনাজপুর


এ সম্পর্কিত আরও খবর...
Loading...