ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৯ | ৯ মাঘ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

অামি ‘মা’ চাই সবার সাপোর্ট


মৌলি আজাদ

প্রকাশিত: ০৩:০৭ পিএম, ০৭ মে ২০১৭, রোববার | আপডেট: ০৯:১৪ এএম, ৩০ আগস্ট ২০১৭, বুধবার
অামি ‘মা’ চাই সবার সাপোর্ট

‘মা’ শব্দটি খুবই ছোট কিন্তু এ শব্দের যে সীমা- গভীরতা এবং ব্যাপকতা তা সন্তান মাত্রই হাড়েহাড়ে উপলব্ধি করেন। অবশ্য একজন নারীর জীবনে মা হওয়ার ঘটনা জীবনের অন্যতম সুখের ঘটনা। ধনী গরীব নির্বিশেষে বিভিন্ন সর্ম্পকের মধ্যে নানা ওঠানামা কাজে করে। কিন্তু মা-সন্তান এর সর্ম্পকের ক্ষেত্রে এই দুই শ্রেণির মধ্যে কোন ফাড়াক নেই। আপন মায়ের জায়গা শত আদর উপঢৌকন দিয়েও কেউ কোনদিন পূরণ করতে পারে না। একজন মা সন্তানের সুখ, সুস্থতার জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবনটাকেও দিতে কুণ্ঠা বোধ করেন না। যুগেযুগে সন্তানের জন্যে মায়ের যে এত ত্যাগ প্রশ্ন হল সে মায়ের জন্যে সমাজ বা পরিবার কতটা করছে বা তাকে কতটা সার্পোট দেয়া হচ্ছে?

যে মা গৃহিনী সে তার সবটাই দিচ্ছে তার সন্তানকে কোনকিছুর প্রত্যাশা না করে। অনেক সময় পরিবার ভাবছে একজন হাউসওয়াইফের বাচ্চা লালন-পালন ছাড়া আর কাজটাই বা কি? আসলেই কি তাই? কখনও কি সেই গৃহিনীর ইচ্ছা হয় না নিজের হাতের উপার্জিত অর্থের যা দিয়ে সে তার সন্তানের বায়না মেটাবে? সে গৃহিনীর মধ্যে শুধুমাত্র হাউসওয়াইফ হওয়ার জন্যে অনেক সময় ইনসিকিউরিটি কাজ করে না কি? করে নিশ্চয়। কিন্তু পরিবার গৃহিনীর মনোজগতের ধার ধারে না। গৃহিনীর ভিতরে নানা না পাওয়া ইচ্ছাগুলো ডালপালা গজিয়ে একপর্যায়ে তার ভালমন্দ বোঝার ক্ষমতা লোপ পায়। ফলশ্রতিতে ঘটায় নানা অনাকাঙ্খিত ঘটনা। আবার অনেক মা আছেন যারা অতি মেধাবী–জীবনের সকল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনী পেয়ে ভাল জব করছিলেন। কিন্তু মা হওয়ার ফলে একঝটকায় চাকরি ছেড়ে সংসারি হয়ে যান। কারণ সংসার ছোট হতে হতে এমন জায়গায় অাজ পৌঁছেছে যে সন্তান মানুষ করার জন্য সার্পোটিভ কেউ তার পাশে নেই। ফলে এতদিন যে মেয়েটি তার কাজের জন্যে বাইরে প্রশংসিত হচ্ছিলেন হঠাৎ করেই ঘর সংসার সন্তান লালন-পালনে অনেক সময় তার মধ্যেও চলে আসে একাকিত্ব ও ইনসিকিইরিটি বোধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের মায়েরা অার কতকাল এই রকমভাবে জীবনযাপন করে যাবেন? কেন আমাদের মেধাবী মায়েদের কোনভাবেই যেন চাকরি ছাড়তে না হয় তার জন্যে পরিবার সর্বাংশে এগিয়ে আসেন না? কারণ সন্তান হওয়া একটি বিবাহিত মেযের জন্য যেমন একটা পার্ট ঠিক তেমনি তার জবটি তার এতদিনের ভাল ফলাফলেরই প্রকাশ। একজন বাবার যদি সন্তানের জন্যে চাকরি ছাড়তে না হয় তবে মায়ের কেন হবে? সন্তান বাবার নাড়ি ছেড়া ধন নয় বলে কি?

অাজও কেন আমাদের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলো পরিপূর্ণ সুবিধাযুক্ত ডে কেয়ার সেন্টার তৈরি করছে না তার উত্তর জানা নেই। কেন স্বল্পমেধাবী মায়েদের জন্য পর্যাপ্ত পার্টটাইম জব/ক্ষুদ্রশিল্পের কাজের মাধ্যমে নিজেকে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার মত ব্যবস্থা এখনও এতটা জোড়দারভাবে গড়ে উঠেনি তাও একটা প্রশ্ন। যেসব মায়েরা সরকারি চাকরি করেন তারা মার্তৃত্বকালীন ছয়মাস ছুটি পান সত্যি। কিন্তু এই ছয় মাস পর অফিসে আসায় অফিসের সাথে মায়ের সর্ম্পকের যে একটা গ্যাপ হয় দেখা যায় তার পুনরুদ্ধারের দ্বায় কেবলই মায়ের?

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আজও ঠিকমত মেটারনিটি লিভ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমাদের যে মায়েরা দিনরাত খেটে বস্ত্র তৈরি করে দেশের রপ্তানিখাতকে উন্নত করে চলছেন সে মায়েদের সন্তান হওয়ার আগে পরে শারীরিক/মানসিক অবস্থা দেখার বা বোঝার মত ইচ্ছে পরিবার বা কার্যক্ষেত্রের আদৌ আছে কি?

সন্তান বড় হবার পর সন্তানের লেখাপড়ার ভাড় স্বভাবতই পরে মায়েদের উপর। আর তার জন্যে মায়েদের সেই সকাল বেলায় সন্তানের ব্যাগের বোঝা কাঁধে নিয়ে ছুটতে হয়। এ শহরে কয়জন মা পারেন প্রতিদিন গাড়ি-রিক্সা-সিএনজির ভাড়া  গুনতে? মায়েদের জন্যে কোন ভাল পাবলিক পরিবহনের ব্যবস্থা আছে কি?

এরপর যখন স্কুলে পৌঁছান সন্তানটি হয়তো এসি করা ক্লাসে পৌঁছে যায়। কিন্তু সেই মা সন্তান ও তার নিজের আর্থিক অবস্থা ও বর্তমানে যানজটের কথা চিন্তা করে সেই স্কুলের সামনের রাস্তায় বসে থাকেন। হোক রোদ বা বৃষ্টি। স্কুলগুলো প্রতিমাসে  অভিভাবকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিলেও মায়েদের বসার জন্য কোন ব্যবস্থা করার প্রয়োজন বোধ করে না।
 
অর্থাৎ যে মা মানুষ সৃষ্টি থেকে শুরু করে তার সন্তানের চোখধাঁধানো সাফল্য দেখার জন্য নানা কষ্ট সহ্য করে দিনযাপন করে চলছেন সেই মায়ের নিজের জন্য কোথাও কোন সাপোর্ট নেই। শুধু গাল ভরা গদগদ কিছু বুলিই তাদের জন্যে রাখা আছে। মা হলেও সেতো মানূষ। কেনো আমরা তা ভুলে যাই? একজন মানুষকে কোন রকম সাপোর্ট না দিয়ে শুধুমাত্র মা বলেই তার কাছ থেকে আমরা আর কতকাল কেবল নিয়েই যাব? সমাজ পরিবেশ সংসার আজ অনেক বেশি চেঞ্জড।

এখন মানুষের (নারী-পুরুষের)  চিন্তাভাবনায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আগে আমাদের নানী-দাদী বা মায়েরা যেভাবে জীবনযাপন করে গেছেন সেভাবে এখনকার মায়েরা ভাববেন তা  চিন্তা করার আর অবকাশ নেই। মানুষের মনোজগতের ভিতরে ভিতরে পরিবর্তন হচ্ছে যা অনেক সময় বাইরে থেকে দেখা যায় না। যখন সমাজে  দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ পায় (মা কর্তৃক সন্তান হত্যা, যা অকল্পনীয়) তখন আমরা কেবল নড়েচড়ে বসি। দৌড়াই মনোবিদদের কাছে ঘটনার পিছনের কারণ জানতে। ভাবি এ কি করে সম্ভব? অনেক কিছু হতে বঞ্চিত হতে হতে একসময় যে মানুষটির মধ্যে ইনস্যানিটি গ্রো করেছে তা হয়ত তার কাছের মানুষরাও বুঝে উঠতে পারেনি।

নেপোলিয়ন বলেছিলেন আমাকে একজন ভাল মা দাও অামি তোমাকে ভাল জাতি দিব। অার আজ সময়ের পরিবর্তনে বলতে চাই মাকে পরিবার সমাজ এবং সন্তানদের দিতে হবে নানা রকমের সার্পোট যাতে মা নিজে হতে পারে অাত্মনির্ভরশীল। একজন আত্মনির্ভরশীল মাই পারবেন একজন বিবেচক সন্তানের জন্ম দিতে। যে সন্তান সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য করবে না জড়াবেনা কোন সমাজবিরোধী কাজে। কারণ সে যে নারিশড হয়েছে একজন দক্ষ সুবিধাপ্রাপ্ত মায়ের হাতে। একবিংশ শতাব্দীতে অামরা যে চাই দেখতে মায়ের মুখের সবপাওয়ার ঝিলিক। আমরা চাই না লেখক হুমায়ুন আজাদের মা কবিতায় বর্ণিত সেই মাকে দেখতে।

‘আমরা বড় হতে থাকি…আমাদের মা দিনদিন ছোট হতে থাকে….আমাদের মা দিনদিন ভয় পেতে থাকে……….আমাদের মা আর ফুলের পাপড়ি নয়…….আমাদের মা আর সারাদিন ঝরে পরে না’…।

লেখক: মৌলি আজাদ