ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১১ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

‘শূন্যতা মনে হচ্ছে’


মিজানুর রহমান মুন

প্রকাশিত: ০৮:২৩ পিএম, ১১ আগস্ট ২০১৮, শনিবার
‘শূন্যতা মনে হচ্ছে’ প্রেসক্লাব যশোরের ক্রীড়া ও সমাজ সেবা সম্পাদক ও দৈনিক স্পন্দনের চিফ রিপোর্টার মিজানুর রহমান মুন

কয়েকদিন ধরে বুকের মধ্যে হঠাৎ কেমন যেন হচ্ছে। কি যেন চিন্তা ভর করছে মনে। চারিদিকে ঘুরছি ফিরছি মনে হচ্ছে কি যেন নেই। ‘শূন্যতা মনে হচ্ছে’। নানা ক্রান্তিকালে আমাদের মাঝে যাকে পাওয়া যেত স্বতস্ফূর্ত। তিনি আজ রয়েছেন আড়ালে। মাঝে মধ্যে বের হলেও তিনি এখন একপ্রকার বাড়ির চার দেয়ালের মাঝে অন্তরীণ। দুরারোগ্য ক্যান্সারের কারণে চোখের দৃষ্টি লোপ পেয়েছে। প্রতিনিয়ত অন্ধকরাচ্ছন্ন পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে তাকে। কেউ তার বাড়িতে গেলে চিনতে পারছেন না। তবে অনুভুতি শক্তি রয়েছে প্রবল। কথা বললেই তিনি বুঝতে পারছেন কে।

বলছিলাম আমাদের অগ্রজ সিনিয়র সাংবাদিক দৈনিক কালের কন্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি প্রেসক্লাব যশোরের সদস্য কবি ফখরে আলমের কথা। যশোর জেলা ব্র্যান্ডিং এর স্লোগান ‘নকশী কাঁথা ফুলের মেলা, খেজুর গুড়ের যশোর জেলা’ ও যশোর আন্দোলনের ইতিহাস বইয়ের লেখক তিনি। ঘুরে ফিরে শহরে দেখা হতো সৃজনশীল মানুষটির সাথে। আমার দ্বিতীয় হোম প্রেসক্লাব যশোরে মাঝে মধ্যে তার সাথে দেখা হতো। দেখা হলেই সালাম দেয়ার সাথে সাথে উত্তর দিয়ে বলতেন কি খবর মুন? কিন্তু আগের মতো তার আর দেখা মিলছে না।

সর্বশেষ গত ১৩ জুলাই বিএফইউজের নির্বাচনে ভোট দেয়ার প্রাক্কালে ও ৫ আগস্ট সাংবাদিক রেবা রহমান ভাবির মরদেহে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণের সময় তার সাথে দেখা হয়েছে। আগের মতো দেখা না হওয়ার কারনে মনটা খুবই খারাপ।

দেখা না হওয়ার কারণ শ্রদ্ধেয় ফখরে আলম খুবই অসুস্থ। মাঝে যশোরে ছিলেন না। তিনি চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিন ভারতে ছিলেন। আবার ফিরে এসেছেন যশোরে। অবস্থান এখন নিজ বাড়িতে। তিনি কয়েক বছর ধরে শরীরে মরণব্যাধি ক্যান্সার বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। মাঝে মধ্যে ভাল থাকেন আবার অসুস্থ হয়ে যান। ভারতে চিকিৎসা নিয়ে বছরখানেক তার ভালই কাটছিল। ফলে প্রাণবন্ত মানুষটির আগের মতো দেখা মিলত যশোরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। এরই মাঝে আবারো হঠাৎ একদিন খবর আসে তিনি চোখে মোটেই দেখতে পারছেন না। দ্রুত তাকে যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানকার চিকিৎসকরা আশার বাণী শোনাতে না পারায় তড়িঘড়ি করে তাকে পরিবারের পক্ষ থেকে পাসপোর্টের মাধ্যমে ভারতে নেয়া হয়। সেখানে তার দীর্ঘ চিকিৎসা চলে। মাঝে মধ্যে তার অফিসের ফটো সাংবাদিক ফিরোজ গাজীর কাছ থেকে শুনতাম ভাইয়ের অবস্থা। কোন সময় ভাল আবার কোন সময় খারাপ শুনতাম। কলকাতার এ্যাপোলো হসপিটালে তার কেমো থেরাপী দেয়া হয়েছে কয়েক দফা। সেখানে মাসাধিকাল চিকিৎসা নেন। এরপর বাড়ি ফেরেন। এখন তিনি শহরের রেলগেট তেঁতুলতলার বাড়িতে অবস্থান করছেন অসুস্থ অবস্থায়।

অসুস্থ হওয়ার আগে গুণী মানুষটিকে সাংবাদিকদের দুটি বোনভোজনে পেয়েছিলাম। সেখানে তার সাথে অনেক আড্ডা গল্প করার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রেসক্লাব যশোরের আয়োজনে চলতি ২০১৮ সালের ১০ মার্চ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের নলডাঙ্গা রাজবাড়ী রিসোর্টে বনভোজনে তিনি সাংবাদিকদের নামে একটি কবিতা পাঠ করেছিলেন। কবিতায় এক একজনকে নানা বিশেষনে লাইনে লাইনে বিশেষায়িত করেছিলেন। কবিতাটি সবার ভাল লেগেছিল। অবশ্য তিনি এধরনের কবিতা লেখায় দক্ষ। পরে ২৩ মার্চ যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের আয়োজনে শহরতলীর বাহাদুরপুর জেস গার্ডেনের পিকনিকে তার প্রাণবন্ত উপস্থিতি পেয়েছি। এদিন তিনি গার্ডেনের একটি গাছতলায় সাংবাদিকদের স্ত্রী আর সন্তানের সাথে নানা গল্প আর আড্ডায় মাতেন। এখানে আমার স্ত্রী ও সন্তানের সাথেও বিভিন্ন গল্প করেন। একপর্যায়ে স্ত্রীর কাছে আমার মেয়ে ও ছেলের ব্যাপারে জানতে চান। তখন আমার স্ত্রী জানায় মেয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে ও ছেলে যশোর জিলা স্কুলে সেভেনে পড়ে। একথা শুনে তিনি অনেক খুশি হয়েছিলেন। তিনি বনভোজনের পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন ‘আমাদের ছেলে মেয়েরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে,ভাল স্কুলে পড়ে। সাংবাদিকদের ছেলে মেয়েরা একদিন অনেক নাম করবে তারা দেশের নাম উজ্জল করবে’।

তিনি হয়তো আমার ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার ব্যাপারে বা আমার পরিবার সম্পর্কে জানতেন না। ওইদিন জানার পর হয়তো আমার সম্পর্কে তার ধারণা পাল্টে যায়। এজন্য তিনি মাঝে মধ্যে লোক মাধ্যমে খবর দিয়ে দেখা করতে বলতেন। তিনি কি যেন আমাকে বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি তার সাথে ওই সময় দেখা করতে পারিনি। এই যাচ্ছি এই যাবো করে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। এরমাঝেই হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুনি চোখে দেখতে পারছেন না। যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সেখানে দেখতে যাওয়ার আগেই উন্নত চিকিৎসার্থে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভারতে। ফলে তার সাথে ওই সময় আর দেখা বা কথা বলার সুযোগ হয়নি। এখন তিনি বাড়িতে আছেন। শ্রদ্ধেয় ফখরে ভাই অপেক্ষায় আছি আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুন। প্রাণবন্ত করে তুলুন নানা অনুষ্ঠান। কারণ আপনার শূন্যতায় আমরা যেন অভিভাবকহীন। আমাদের আর অভিভাবকহীন করবেন না।

আমরা ইতোমধ্যে হারিয়ে ফেলেছি দৈনিক জনকন্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি শামছুর রহমান কেবল, দৈনিক রানারের সম্পাদক আরএম সাইফুল আলম মুকুল, বেতারের জমির আহমেদ টুন, দৈনিক প্রথম আলোর অশোক সেন, দৈনিক যুগান্তরের সাহা কিরণ কচির মতো প্রথিতযশা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সংগঠকদের। আমরা হারিয়েছি দৈনিক পূরবীর সম্পাদক মহি উদ্দিন আহমেদ ও দৈনিক রানারের পরবর্তী সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম টুটুলকে। যারা সব সময় সংকটময় মূহুর্তে অভিভাবকের মতো পাশে থাকতেন। আমরা দৈনিক ইনকিলাবের বিশেষ সংবাদদাতা মিজানুর রহমান তোতাকে ফিরে পেয়েছি। তিনি কঠিন অসুস্থতা থেকে অনেক কষ্টে আমাদের মাঝে ফিরেছেন। কিন্তু এরমাঝে গত ৪ আগস্ট আরেকটি শোক তাকে আচ্ছন্ন করেছে। জীবন সঙ্গিনী সাংবাদিক রেবা রহমানকে হারিয়ে তিনি এখন চরম সংকটে। দুমড়ে মুচড়ে পড়েছেন। আমরা একে একে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের হারিয়ে ফেলছি।

আবার অনেকে অসুস্থ জীবন যাপন করছেন। এরমধ্যে দৈনিক স্ফুলিঙ্গ পত্রিকার সম্পাদক মিয়া আব্দুস সাত্তার এখন অসুস্থ অবস্থায় ঘরবন্দী। ইংরেজি দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট ও ইউএনবি’র প্রতিনিধি এমএ মান্নান, এটিএন বাংলার শাহানারা বেগম, দৈনিক লোকসমাজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আনোয়ারুল কবীর নান্টু, সাংবাদিক নেতা মহিদুল ইসলাম মন্টু, জাহিদুল কবির মিল্টন, অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিকী মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

আমরা আপনাদের মতো জ্যেষ্ঠদের এমন অবস্থায় খুবই শংকিত। সামনে আপনাদের মতো অভিভাবক সংকট অনুভব করছি। যারা আপনাদের মতো আগলে ধরে রাখবেন আমাদের। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যে ফখরে ভাইসহ অসুস্থ আপনারা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুন। সৃষ্টিকর্তার কাছে এই দোয়া করি। যেন আপনাদের দ্রুত সুস্থ করে তুলুন।

লেখক: ক্রীড়া ও সমাজ সেবা সম্পাদক, প্রেসক্লাব যশোর এবং চিফ রিপোর্টার, দৈনিক স্পন্দন

অমৃতবাজার/রেজওয়ান