ঢাকা, শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯ | ৫ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

প্রথম সাংবাদিক পরিচয় দিলাম


শাহাদত হোসেন কাবিল

প্রকাশিত: ০২:১৫ পিএম, ২৯ জুন ২০১৯, শনিবার
প্রথম সাংবাদিক পরিচয় দিলাম

লিখলেই যে খবর কিংবা ফিচার হয় না তা কিন্তু জানতাম না। তবু লিখে চলি এবং তা গণদাবী পত্রিকায় ছাপাও হয়। তাহলে ছাপা হয় কি করে? এর উত্তরটা আমি নিজেই বের করেছি। সভা, সমাবেশ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিনোদন, সমস্যা, সম্ভাবনা, দুঃখ, বেদনা, হাসি, কান্না সব বিষয়ে খবরগুলো লেখার সময় পত্রিকা নিয়ে আগে প্রকাশিত অন্যদের এ ধরনের খবর কি ভাবে প্রকাশ হয়েছে তা খুবই মনযোগ সহকারে ফলো করতাম।

এখনকার দিনে যেমন সাংবাদিকের সংখ্যা বেশি আমাদের সময় কিন্তু এমনটা ছিল না। তাই কারো কাছে গিয়ে শিখে বা পরামর্শ নেবো সে সুযোগ ছিল না।একটা কথা বলে রাখি এখন যেমন পত্রিকার সংখ্যা বেশি ১৯৭০এর দশকের প্রথম দিকে পত্র-পত্রিকার সংখ্যাধিক্য ছিল না। তখন যশোর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক গণদাবী পত্রিকায় একটা ছোটখাট খবর প্রকাশ হলেও ঢিঢি পড়ে যেত। আমার এখনো স্মরণ আছে একবার এক শ্বশুর তার পুত্রবধূর সাথে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েছিল। আমি ঘটনার ওপর একটি স্টোরি করেছিলাম। ‘কলি ঘোর কলি’ শিরোনামে ওই খবরটি ছাপা হলে সেকি হৈ-হুল্লোড় কান্ড। আমার এখনো ঘটনাটি মনে পড়লে হাসি পায়।

এখনকার মতো তখন কিন্তু কম্প্যুটার চালু হয়নি। খবর সব হাতে লেখা হতো। সে বর্ণনা অল্প কথায় দিলে এ প্রজন্মের কেউ বুঝতে পারবে বলে মনে হয় না। এ বিষয়টি সম্ভব হলে আমি অন্য লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আমি রিপোর্ট লিখে বেশিরভাগ দিন বাইসাইকেল চালিয়ে ঝিকরগাছা থেকে যশোর গণদাবী অফিসে দিয়ে আসতাম। আমার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর থেকে গণদাবী অফিস পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার পথ। ওই সময় এ পথটুকু সাইকেল চালাতে কোনো কষ্টই হতো না। আমি তখন কবি নাসিরউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ও যশোর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক গণদাবী পত্রিকার এক ক্ষুদে সংবাদদাতা। এই পত্রিকায় আমার সাংবাদিকতার হাতে খড়ি। ঝিকরগাছা কলেজে পড়ি আর এলাকার খবরাখবর সংগ্রহ করে ডাকে পাঠায় পত্রিকা অফিসে। এখনকার মতো তখন ই-মেইল কিংবা ফ্যাক্স ছিল না। সংগৃহীত খবরগুলো বেশিরভাগ সময় ডাকে পাঠাতাম। কখনো কখনো খবর লিখে নিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে পত্রিকা অফিসে দিয়ে আসতাম। গণদাবীর অফিস ছিল যশোর শহরের রেলগেটে।

ডাক যোগাযোগসহ সব কিছু বন্ধ। যানবাহন চলে না। গণদাবী হাতে পাইনে। প্রকাশ হচ্ছে কিনা তাও জানতে পারছিনে। ’৭১ এর অগ্নিঝরা এমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে ২ এপ্রিল সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলাম পত্রিকা অফিসে। কিন্তু নতুনহাটের পর আর যেতে পারলাম না। এখন যেমন মোবাইল ফোনের কল্যাণে কোথায় কি ঘটছে তা মুহূর্তের মধ্যে জানা যায় তখন এমন সুযোগ ছিল না। ওই দিন যশোর শহরতলীর চাঁচড়ায় স্বাধীনতাকামী মানুষের সাথে পাকিস্তানি সৈন্যদের তুমুল প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়।

চাঁচড়ার প্রতিরোধ যুদ্ধের বিষয়টা নতুনহাট পর্যন্ত পৌছে জেনে আমি ফিরে আসি। আর অফিসে যাওয়া হলো না এবং ওই দিন থেকে স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত আর কোনো খবর লেখা গেল না। পত্রিকাও বন্ধ ছিল। অর্থাৎ স্বাধীনতা আন্দোলনে তেঁতে উঠেছে সারা দেশ। সব ধরনের যোগাযোগ, অফিস আদালত মিল কলকারখানা বন্ধ। এক কথায় অচল বাংলাদেশ (তখন নাম পূর্ব পাকিস্তান)। এ আন্দোলনে সাপ্তাহিক গণদাবীর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। পত্রিকাটির আগুন ঝরা লেখনিতে জনতা উদীপ্ত হতো। স্বাধীনতা আন্দোলনে যারা ভূমিকা রেখেছিলেন তারা পাকিস্তানিদের রোষাণলে পড়েন। গণদাবীও এ থেকে বাদ থাকে না। এ পর্যায়ে সব কিছু ফেলে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ নিরাপদ স্থানে সরে দাঁড়ায়। সেই থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত গণদাবীর সাথে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

গ্রাহক হবার পর থেকে পত্রিকার সব কপি আমার কাছে সংরক্ষিত। সংরক্ষিত এই পত্রিকার কারণে আমি বিপদে পড়তে পারি, শহর থেকে দূরের গ্রামে বসেও এ ভয়ে ভীত থাকতাম। পাকিস্তানি সেনা বাহিনী, তাদের সমর্থিত পুলিশ ও বিহারিরা সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছিল। কোনো গ্রাম এ অবস্থা থেকে বাদ যাচ্ছিল না। আমাদের গ্রামে এসে যদি তারা আমার কাছে গণদাবী পত্রিকা পায় তাহলে ওরা আমাকে এক হাত দেখে নেবে তাতে কোনো সন্দেহহ ছিল না। এ ভয়ের কারণে পত্রিকার কপিগুলো নষ্ট করে ফেলবো তাও পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত আমার মা পত্রিকাগুলো এক সাথে করে আমাদের পুরনো ইটের পাঁজার ভেতর রেখে আসেন। এ অবস্থার ভেতর পাকিস্তানিরা সেনা আমাদের গ্রামে হামলা চালায়। তারা গ্রামের নয়জনকে ধরে ফেলে এবং আদেরকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। এতে সামজন শহীদ হন। বাকি দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। কিন্তু বেঁচে যান। ওই দিন গ্রামের সব মানুষ গ্রাম ছেড়ে সম্ভাব্য নিরাপদ স্থানে চলে যায়। তাদের সাথে আমরাও। গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার সময় পাঁজার ভেতর থেকে গণদাবী নিতে খেয়াল ছিল না। পরে বৃষ্টির পানিতে ভিজে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।

দেশ স্বাধধীনের পর ছুটে যায় যশোর শহরে। উদ্দেশ্য গণদাবী অফিসে যাওয়া। আবারো সেই বাইসাইকেল চালিয়ে যাওয়া।কিন্তু হতাশ হতে হলো। রেলগেটের সেই অফিসে তালা মারা। খোঁজ নিয়ে জানলাম দেশ স্বাধীনের পর পত্রিকার কেউ এখানে আসেননি। দুশ্চিান্তায় পড়লাম, তারা শহীদ হননি তো। তবুও হাল না ছেড়ে আমি শহরের সম্ভাব্য সব জায়গায় সাইকেল চালিয়ে ঘুরে ঘুরে খোঁজ করতে থাকলাম। শহরে আর কারো কাছে জানতে চাওয়ার আমার কোনো নির্ভরযোগ্য মানুষ ছিল না। কারণ তখন আমাকে শহরের একটি মানুষও কেউ চিনতেন না। আমিও কাউকে চিনতাম না। ওই দিন মনটা খারাপ করে বাড়ি ফিরে গেলাম। অন্য আর একদিন সাইকেলে একই উদ্দেশ্যে যশোর শহরে গেলাম। ঘুরতে লাগলাম শহর জুড়ে। মহান আল্লাহ আমার সহায় হলেন। আরএন রোডের একটি বস্তার দোকানে দেখি এক কপি গণদাবী। আমি বিনীতভাবে দোকানদারকে বললাম, আমি কি পত্রিকাটি একটু পড়তে পারি। আমার তখন লক্ষ্য পত্রিকা পড়া নয়, অফিসের ঠিকানাটা সংগ্রহ করা। দোকানদারের সম্মতি পেয়ে গণদাবী হাতে নিয়ে দেখি অফিস খুলনার গগণবাবু রোডে।

হাতাশার মাঝে কিছুটা আশার আলো পেলাম। আমি সাহস নিয়ে দোকানদারকে বললাম, আমি যদি পত্রিকার যা দাম তা দিয়ে দেই তাহলে পত্রিকাটি কি আমাকে দেয়া যাবে?

আমার এ কথায় দোকানদারের আগ্রহ বেড়ে গেল। জানতে চাইলেন, পত্রিকাটির এত কি প্রয়োজন?

আমি নিসংকোচে বললাম, মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত আমি পত্রিকায় লিখতাম। তখন যশোর থেকে প্রকাশ হতো। একন তারা খুলনায় চলে গেছেন। পত্রিকার সাথে যোগাযোগ করার জন্য দরকার।

দোকানদার বললেন, তাহলে তুমি কি এই পত্রিকার সাংবাদিক?

শুধুমাত্র পত্রিকাটি নেয়ার স্বার্থে আমি মুখ নাড়িয়ে লজ্জাবনতভাবে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলাম। অর্ধশতাব্দি কাল সাংবাদিকতা জীবনে এটাই আমার প্রথম সাংবাদিক পরিচয় দেয়া। কি জানি কি কারণে দোকানদার আমার প্রতি সহানুভুতিশীল হলেন। উৎসাহ ব্যাঞ্জক অনেক কথা বলে দোকানে গণদাবীর আরো যে দু-একটি কপি ছিল তাও আমাকে দিয়ে দিলেন।

আমি ফিরলাম বাড়িতে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস কি ভাবে কোথায় কেটেছে তার একটি ছোটখাট বর্ণনা দিয়ে পত্রিকায় একটি চিঠি লিখলাম। সেই সাথে পাঠালাম রিপোর্ট। পরের সপ্তাহে দেখি আগের মতো সেই ডাক পিওন রাস্তা দিয়ে আসছেন। ভাবলাম যদি আমার কাছে পত্রিকা নিয়ে আসতো তাহলে কতই না ভালো লাগতো। আমার খাবনার সাথে পিওনের গতি মিলে গেল। তিনি আমাদের বাড়ির দিকে আসছেন দেখে পুলকিত হলাম। তিনি তার প্যাকেট থেকে একটি পত্রিকা বের করে আমার হাতে দিলেন। সে দিন কোন সংবাদটি ছাপা হয়েছিল তা আজ আর খেয়াল নেই। এরপর খবর লেখালেখি আর পড়াশুনার মধ্য দিয়ে বেশ সময় পার হয়ে গেছে। ওই সময়ের একটি অংক আমি আজো মিলাতে পারিনে। খুলনা থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় আমি গ্রামে বসে খবর লিখি, কারো সাথে পরিচয় পরিচিতি নেই, লাজুকতার কারণে কোথাও নিজেকে প্রকাশ করিনে। ঝিকরগাছায় ওই পত্রিকা আসতো হাতে গোনা কয়েক কপি। তারপরও কি ভাবে সবাই জেনে গেল আমি পত্রিকায় লেখালেখি করি। তার মানে আমি সাংবাদিক। আর গ্রামের মানুষে বলে ‘সুম্বাদিক’।

অমৃতবাজার/আরএইচ