ঢাকা, রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সৃজনশীল সাংবাদিকতায় ২৫ বছর পার করলেন সনম


পাবনা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৯:১৪ পিএম, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, শুক্রবার | আপডেট: ০৯:১৮ পিএম, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, শুক্রবার
সৃজনশীল সাংবাদিকতায় ২৫ বছর পার করলেন সনম

পাবনার সাংবাদিক অঙ্গনের এক পরিচিত মুখ দৈনিক ইছামতির প্রধান প্রতিবেদক ও যমুনা টিভির পাবনা জেলা প্রতিনিধি ছিফাত রহমান সনম। সাংবাদিকতা জীবনের ২৫ বছর পার করলেন চির তরুণ এই সৃজনশীল সাংবাদিক। গত ৩০ জানুয়ারি ছিল তার সাংবাদিক জীবনের ২৫ বছর পূর্তি।

গণমাধ্যম জগতে তার হাতে খড়ি সাপ্তাহিক আরশীর মাধ্যমে ১৯৯৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। প্রয়াত সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম শিবলী তাকে ¯েœহের জায়গা থেকে ডেকে এনে বসতে দিয়েছিলেন তার প্রতিষ্ঠানে। এ সময় ছড়া, কবিতা ও ছোট ছোট কিছু নিউজের কাজ দিয়ে যাত্রা শুরু তার। সনমের দাদা মরহুম রহিম উদ্দিন আহমেদ ছিলেন এক সময়ের প্রখ্যাত আইনজীবী ও পাবনা পৌরসভার নির্বাচিত কমিশনার (১৯৩৮-১৯৪৩)।

আর সাপ্তাহিক আরশীর সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিবলীর পিতা মরহুম রজব আলী ছিলেন পাবনা পৌরসভার চেয়ারম্যান। এ কারনে পারিবারিকভাবে একটা ঘনিষ্ট সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে সাংবাদিক শিবলী দেখেছিলেন, তারই সামনে ভবঘুরে ও ডানপিটে জীবনে জড়িয়ে পড়ছে সনম। এমনই এক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি নিজেকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন তার জীবনচরিত। তিনি নিজেই বলেছিলেন, এক বছর শেষ হয়েছে আরশীতে। চলো তোমাকে নিয়ে যাবো শফি ভাইয়ের কাছে। ১৯৯৪ সালে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন দৈনিক ইছামতি কার্যালয়ে। ওই দিনটা ছিলো ৩০ জানুয়ারি। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এক অসাধারন মানুষ সদালাপী ও হাস্যোজ্জল শফিউর রহমান খানের সাথে।

শফিউর রহমান খান ছিলেন দৈনিক ইছামতির প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক ও সম্পাদক। তার মুখের হাসি দিয়ে এমন এক যাদু করেছিলেন তিনি। যে কারনে বাকিটা ২৪ বছর একটানা তারই প্রতিষ্ঠিত বৃহত্তর পাবনা থেকে প্রকাশিত প্রথম দৈনিক পত্রিকা দৈনিক ইছামতির সাথে সংশ্লিষ্ট থাকেন সনম। এখনও ঘুরে বেড়ান তার ভালবাসার জায়গায়। বসা শুরু করেছিলেন চার পা বিশিষ্ট কাঠের একটা ছোট টুলে। এরপর এক বছর পর তাকে শহর প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয় কর্তৃপক্ষ।

এরপর সময়ের হাত ঘুরে নিজস্ব প্রতিনিধি, তারপর স্টাফ রিপোর্টার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন। এখন দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে। ২০১৪ সালে যোগ দেন যমুনা টিভির জেলা প্রতিনিধি হিসেবে। ২৫ বছরের সাংবাদিকতার জীবনে করেছেন নানামুখী খবর। বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত হয়েছে তার প্রতিবেদন। বেশ কয়েকবার উঠে এসেছেন আলোচনায়। সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন বিভিন্ন সময়ে। একজন সৎ ও সাহসী গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে সমাজের অসহায়দের পাশে থেকে লেখনির মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়েছেন সহায়তা দেওয়ার।

বিভিন্ন সময়ে খবরকে কেন্দ্র করে সামাজিক অনেক দুর্জনের আক্রোশের শিকার হয়েও পিছপা হননি তিনি। বরং যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা চালিয়েছেন তার পেশাগত অবস্থান। এভাবেই কেটে গেছে অনেক সময়। তার লেখা বেশ কিছু প্রতিবেদন পেয়েছে পাঠকপ্রিয়তা। খবর ঘিরে অনেক সময়ে ভুল বোঝাবুঝিও হয়েছে অনেকের সাথে। যৌক্তিকতার কাছে হেরে গেছে দুর্জনেরা। পেশাগত জীবনে বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবেলাসহ দেশের সর্বোচ্চ আদালতও ঘুরে এসেছেন হাসিমুখে। বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকা অফিস থেকে তাকে কাজ করার জন্য অনুরোধ করা হলেও তিনি যাননি। থেকে গেছেন দৈনিক ইছামতি ঘিরে।

এই পত্রিকা অফিসে প্রথম আসার সময়ের লেটার প্রেসের খটখট শব্দ থেকে আজ অফসেট মেশিনের থেকে কাজ করা, পুরো সময়টা অনেক সুখ আর দুঃখের স্মৃতি দিয়ে সাজানো রয়েছে তার স্তরে স্তরে। আজো নাকি সেই লেটার প্রেসের খটখটানি শব্দ কানে বেজে ওঠে তার। মাঝে মাঝেই ছোটদের বলে থাকেন, ‘অল্প সময়ের জীবন- খাই বা না খাই ছ্যামায় থাকি।’

সব সময়ে যেন চেষ্টা তার কোন খারাপ আঁচর যেন না লাগে, এভাবেই অনেক কষ্টে যুদ্ধে করে চালিয়ে যান কাজ। একটানা দুই যুগ একই পত্রিকা অফিসে সুনামের সাথে কাজ করে যাওয়া তার দায়িত্বশীলতা, সততা ও নিষ্ঠাকে প্রকাশ করেছে সমাজের কাছে। শুধু তাই নয়, তার কাছে দৈনিক ইছামতি পত্রিকা অফিসকে মনে হয়েছে একটা বিষয় ভিত্তিক শিক্ষালয়। যেখানে শিখতে শিখতে পাশ করে আগানো। এজন্যই নামহীন ছোট কাঠের চার পায়ে টুল থেকে স্তর থেকে স্তর পেরিয়ে উঠে এসেছেন প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে। পত্রিকাতে কাজ করার পাশাপাশি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শফিউর রহমান খানের সাথে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম পাবনা শাখা গঠনের সময়ে সবচেয়ে ছোটকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। গিয়েছেন তার সাথে বিভিন্ন দপ্তরে ও সুশীল সমাজের মানুষদের কাছে। প্রতিষ্ঠার সময়ে তাকে করা হয়েছিলো আঞ্জুমান যুব কমান্ডের সাধারন সম্পাদক। এছাড়াও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থায় কাজ করেন পত্রিকার সম্পাদক শফিউর রহমান খানের সাথে সবচেয়ে কনিষ্ট সদস্য হিসেবে। অংশ নিয়েছেন বেশ কয়েকটি তদন্ত টিমে।

সাংবাদিকতার জীবনে পরপর দুইবার লাভ করেন এফপিএবির জাতীয় পুরস্কার। পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে মানব সেবায় অগ্রণী ভূমিকা রাখায় লাভ করেছেন রোটারী অ্যাওয়ার্ড। যমুনা টিভির ইভেন্ট ভিত্তিক সেরা প্রতিবেদকের পুরস্কার লাভ করেছেন। আবৃত্তিতে রাজশাহী বিভাগের মাঝে প্রথম পুরস্কার লাভ করে পরবর্তিতে সারাদেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। পাবনাতে আয়োজিত বই মেলায় দুইবার লাভ করেন সেরা লেখক পুরস্কার। জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকেও পুরস্কৃত করা হয় তাকে ভালো রিপোর্টের জন্য। সর্বাধিক সংবাদ প্রকাশ করায় তাকে শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান করে নাট্য সংগঠন পাবনা ড্রামা সার্কেল।

এফপিএবি, বনমালী ইনষ্টিটিউট, আমরাই পারি জোট, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান সুপ্র, গণশিল্পী সংস্থা, সন্ধানী ডোনার ক্লাব, উত্তরণ লাইব্রেরী, মহীয়সী প্রকাশ, বাংলাদেশ কবিতা সংসদ, বাঁচতে চাই সমাজ উন্নয়ন সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা গ্রহন করেছেন। পেশাগত জীবনের বাইরে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা হিসেবে অসহায় মুমুর্ষ মানুষদের জীবন বাঁচানোর সহযোগী হিসেবে ৫৬ বার স্বেচ্ছায় রক্তদান করায় তাকে সম্মাননা প্রদান করা হয় সন্ধানী ডোনার ক্লাব থেকে। স্বেচ্ছায় রক্তদাতা হিসেবে মানব সেবায় দৃষ্টান্তে এস এ টিভির পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয় সম্মাননা। অসহায়, অসুস্থ্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো আর সাধ্যমতো সহযোগিতা করা তার সবচেয়ে বড় একটি উল্লেখযোগ্য গুণ। মানুষকে ভালবাসার এই উদাহরণ তাকে পরিচিতি করেছে একজন মানবিক সাংবাদিক হিসেবে।

দক্ষ সংগঠনক হিসেবেও কম যান না এই সাংবাদিক। পাবনা প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী পরিষদে তিনবার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশ প্রেস ইনষ্টিটিউটের বুনিয়াদি সাংবাদিক কোর্স, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন টেলিভিশন সাংবাদিকতায়। সেভ দ্যা চিলড্রেন অষ্ট্রেলিয়া ঢাকা অফিস থেকে নিউজ লেটার পাবলিকেশনের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণ দিয়েছেন পাবনাসহ কয়েকটি জেলার স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের।

ছিফাত রহমান সনম পাবনা প্রেসক্লাব, বনমালী ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, সন্ধানী ডোনার ক্লাব, গণশিল্পী সংস্থা,স্বপ্নের বাক্শ ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জড়িয়ে আছেন। জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন কলকাকলী কচিকাঁচার মেলা পাবনা শাখার সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। গণশিল্পী সংস্থার শিল্পী হিসেবে বেশ কয়েকটি পথ নাটকে অভিনয় করেন। আবৃত্তিকার ও উপস্থাপক হিসেবে জেলা জুড়ে পরিচিতি রয়েছে তার। পাবনা থেকে প্রথম প্রকাশিত কম্পিউটার ও বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা প্রযুক্তির সূর্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালন করেন পাবনা রোটার‌্যাক্ট ক্লাবের এডিটর হিসেবে। সন্ধানী ডোনার ক্লাবের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এখন সন্ধানীর উপদেষ্টা কমিটিতে রয়েছেন। ইতোমধ্যেই অপরাজিতার চোখ, হৃদয়ের চৌকাঠে মর্মর শব্দ, মন মানুষ, সখি, সুখপাখি দুখপাখি, নন্দিনী, পিরীতি, পড়শী ও আঁচল নামে তার নয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এবারের বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার দশম কাব্যগ্রন্থ মনবাঁশি।

তিনি জানান, সাংবাদিকতার জীবনে দৈনিক ইছামতির প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক ও সম্পাদক মরহুম শফিউর রহমান খান, সাপ্তাহিক আরশীর সম্পাদক মরহুম শফিকুল ইসলাম শিবলী, দৈনিক ইছামতির কার্যনির্বাহী সম্পাদক মোসতাফা সতেজ ও দৈনিক ইছামতির সাবেক বার্তা সম্পাদক এড. রনধীশ ভট্রাচার্যের কাছে চিরঋণী তিনি। বলেন, আজকে যে কিছু করে খাচ্ছি, এসবই তাদের শেখানো ধারাকে পুঁজি করে। আর দৈনিক ইছামতি হলো আমার প্রাণের স্পন্দন ও ঠিকানা। যতোখন বেঁচে আছি, এটাই আমার একমাত্র ঠিকানা।

ছিফাত রহমান সনম পাবনা শহরের টাউন হল পাড়ার বাসিন্দা মরহুম আজিজুর রহমান খোকা ও রাশিদা রহমান মিনার ছেলে। তার স্ত্রী সুবর্না অলিফ তাকে পেশাগত কাজে অনেক উৎসাহের যোগান  দেন বলে জানান তিনি। সাংবাদিকতার জীবনে কখন কোথায় থাকতে হয় ঠিক নেই। অনেক সময়ে ভোরে, কোন সময়ে ভরদুপুরে আবার অনেক সময়ে রাতের আঁধারেও বের হয়ে পড়তে হয় খবরের পেছনে। পরিবারকে দেওয়ার সময় নেই যেন একটুকুও। তারপরেও স্ত্রীর উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় এগিয়ে যান নতুন উদ্যোমে, ফিরে যান মাঠে ঘাটে গ্রামে গঞ্জে সাধারন মানুষের ভীড়ে। আর সেখান থেকে খবর বয়ে এনে তুলে ধরেন পত্রিকাকে আর টিভিতে। ছেলে আফ্রিদি আনাফ রহমান ও মেয়ে আয়াত আরিয়া রহমান আর মা রাশিদা রহমানকে ঘিরে তার এই জীবনের পথচলা। তিনি তার মায়ের জন্য ও সন্তানদের জন্য সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা এবং আগামী সময়ে যেন জনকল্যাণে কাজ করে যেতে পারেন এজন্য দোয়া প্রার্থনা করেছেন তিনি।
লেখক : সাংবাদিক, পাবনা।

অমৃতবাজার/শাহীন/সুজন