ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

চলে গেলেন ঋত্বিক ঘটকের বোন প্রতীতি দত্ত


অমৃতবাজার রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০২:৫৪ পিএম, ১৩ জানুয়ারি ২০২০, সোমবার
চলে গেলেন ঋত্বিক ঘটকের বোন প্রতীতি দত্ত ছবি- প্রতীতি দত্ত

প্রতীতি দত্ত। চলে গেলেন গতকাল রাতে। না, শেষ পর্যন্ত নিজের বাংলাদেশ ছাড়েননি তিনি। ৯৫ বছর বয়সে, ঢাকার একটি হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হল ঘটক পরিবারের একটি প্রজন্মের যাত্রাও।

দেশভাগের পর ঘটক পরিবারের ওপার বাংলা থেকে অনেকেই চলে আসেন এপারে। সাহিত্যিক মণীশ ঘটক, তাঁর মেয়ে মহাশ্বেতা দেবী, ঋত্বিক ও তাঁর বোন প্রতীতি – যথেষ্ট পরিচিত নাম। বাকিরা এপারে থেকে গেলেও, প্রতীতি কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরে গিয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। বিয়ে হয়েছিল সঞ্জীব দত্তের সঙ্গে। সঞ্জীব দত্তের বাবা ছিলেন আরেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি ছিলেন একজন ভাষা সংগ্রামী এবং পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী। ফলে, শ্বশুরবাড়ি এবং বাপের বাড়ি – দু’দিকেই অনেক কৃতবিদ্য মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন প্রতীতি।

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ। ততদিনে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। সেদিন রাতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। আর ফেরেননি তিনি। মেরে ফেলা হয় সেখানেই। অবশ্য তারপরেও বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসেনি প্রতীতির পরিবার। বরং স্বাধীন বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আর সামাজিক বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে। মেয়ে আরমা দত্ত বর্তমানে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমার গল্প করছিলেন প্রতীতি। ১৯৭২ সাল। ঋত্বিক এসেছেন বাংলাদেশে। তখনও নাম ঠিক হয়নি সিনেমার। ভাই-বোন দুজনে মিলে গেছেন কুমিল্লায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত কুমিল্লার একটা জলার ধার থেকে প্রতীতি কুড়িয়ে পান ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বইটি। তা দেখেই ঋত্বিক এই কাহিনি নিয়ে সিনেমা তৈরির কথা মনস্থির করেন। স্ক্রিপ্ট লেখার সময়, হাতের কাছে ছিল না কাগজ। প্রতীতির কাছ থেকে চেয়ে নেন তাঁর ইস্ত্রি করা শাড়ি। সেই শাড়ির ওপরই পেন দিয়ে লিখতে শুরু করেন সিনেমাটির স্ক্রিপ্ট।

ততদিনে তৈরি হয়ে গেছে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমাটি। মুক্তিও পেয়েছে। শেষবার বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ঋত্বিক। ঢাকা থেকে কলকাতা ফেরার জন্য, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশেষ বিমানের আয়োজন করে দিয়েছিলেন। খবর পেয়ে দৌড়ে হাজির হলেন প্রতীতি দত্ত। তাঁকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরলেন ঋত্বিক, কেঁদে উঠলেন হাউমাউ করে।

একটি সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছিলেন প্রতীতি দেবী। বলেছিলেন, ‘সারা জীবন দাদা শুধু কেঁদেই গেল, কিছুই পেল না!’ একদিক দিয়ে দেখলে, সত্যিই তাই। কেউ বলেন, নিজের অসামান্য প্রতিভার প্রতি যথার্থ সুবিচার করেননি ঋত্বিক। বলেন, নিজেকে নষ্ট করেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর যমজ বোন প্রতীতি যখন দাদার সম্পর্কে বলেন, মানুষ ঋত্বিককে চেনা যায় আরও গভীরভাবে। সেদিন বিমানবন্দরে বোনকে কিছুতেই ছাড়তে চাইছিলেন না ঋত্বিক। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে আসতে চাইছিলেন কলকাতায়। প্লেন থেকে বারবার তাড়া দেওয়া হলে, ঋত্বিক দিল্লিতে ফোন করতে বলেন। দিল্লি থেকে নির্দেশ দেওয়া হল, ঋত্বিক যতক্ষণ না যেতে চাইছেন, যেন অপেক্ষা করা হয়। প্লেনের দরজায় দাঁড়িয়েও কাঁদছিলেন ঋত্বিক। প্রতীতি জোর করে ভেতরে পাঠান তাঁকে। প্রতীতি বলছেন – ‘আবারও তাকে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে, তার চোখ দিয়ে পানি ঝরেই যাচ্ছে… ঢাকায় ওকে শেষবার ওভাবেই দেখেছি, কাঁদতে কাঁদতে চলে যেতে দেখেছি।’

এমনই জানা-অজানা নানা গল্পের ভাণ্ডার ছিলেন প্রতীতি দত্ত।

অমৃতবাজার/এমআর