ঢাকা, রোববার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

‘রিপনচন্দ্র মল্লিক’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একজন দায়িত্বশীল গল্পকার


রবীন্দ্রনাথ অধিকারী

প্রকাশিত: ০৫:৩৬ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০১৯, শনিবার
‘রিপনচন্দ্র মল্লিক’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একজন দায়িত্বশীল গল্পকার

 

সাহিত্য শিল্পকীর্তির অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে ছোটগল্প। বাংলা ভাষাতেই নয়, এখন পুরো বিশ্বের অধিকাংশ ভাষাতেই ছোটগল্প লেখা হচ্ছে। বাংলা সাহিত্যেও দিন দিন ছোটগল্পের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। পটুয়া ছবি আঁকিয়েদের মতো গল্পকাররাও নিপুন তুলির আঁচড়ে ছবি আঁকেন সমাজের জীবন ও জনপদের।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের যাত্রা শুরুর পরে এখন পর্যন্ত ছোটগল্পের নানা বাঁক বদল ঘটেছে। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, আল মাহমুদ, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদুল জহির, নাসরীন জাহান, শাহাদুজ্জামান হয়ে এখন অবধি অনেক গল্পকারদের হাতে বাংলা ছোটগল্পের নানা রকমের নিরীক্ষা কিংবা প্রথাগত ভঙ্গিমায় বাঁকবদল ঘটেছে।

কোন কোন গল্পকারের গল্পগুলো অতি সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে। আবার কারো কারো গল্প বেশি দুর্বোধ্য। তবুও গল্পের পাঠক বাড়ছে। রিপনচন্দ্র মল্লিক বাংলা সাহিত্যের একজন ছোটগল্প লেখক। তিনি গল্পকে নিয়ে এসেছেন একেবারেই নান্দনিক উপস্থাপনার ভেতর দিয়ে একদম সুখপাঠ্য করে।

যে কোন গল্প পিপাসু পাঠক রিপনচন্দ্র মল্লিকের ছোটগল্প পাঠ করলেই তিনি তার গল্পের চরিত্রের ভেতর দিয়ে নিজের ভেতরেই কখন যে হারিয়ে যাবেন, সেটা গল্পপাঠ শেষ না হওয়া পর্যন্ত টেরই পাবে না। রিপনচন্দ্র মল্লিক খুব কম ছোটগল্প লিখছেন। কিন্তু সে যে গল্পগুলো লিখেছেন তা পাঠ করলে মনের ভিতরে এক অন্যরকমের পরিতৃপ্তির দোলা দেয়।রিপনচন্দ্র মল্লিকের গল্পগ্রন্থ ‘কাঠপরানের দ্রোহ’ গ্রন্থটির পরিমার্জিত ও বর্ধিত সংস্করণের গল্পগুলো পাঠ শেষে বলাই যায় যে, তার বেশ কিছু গল্পই তার বিষয় নির্বাচনের কারণেই সমাদৃত হবে।

রিপনচন্দ্র মল্লিকের গল্প ‘জ্যোস্নার ঘরে কান্নার স্বর’, কাঠপরানের দ্রোহ, লুকানোমায়া, মা টাকি এবং একটি ঢোঁড়া সাপের গল্প, আত্মপরিচয়, শহর জুড়ে বিষাদের বৃষ্টি, সড়কে নেভানো লুলা পেট্রোল, নীলজমিন, ফসলের ফল, রক্তে পোষা নীল পাখি, অন্ধপাখির চোখে, স্বর্ণসন্তান, রঙিলা পুতুলের গন্ধ এবং সুখনগরে। গল্পকার রিপনচন্দ্র মল্লিক এরকম প্রায় ২৫ টি সুখপাঠ্য ও সিরিয়াস ধারার গল্প লিখেছেন।

নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্র পরিবারের সুখ দুঃখের আখ্যানগুলো গল্পকার খুব যত্নের সাথে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। আবার মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার বিনির্মাণেও তিনি দেখিয়েছেন গল্পলেখার শক্তিমত্তার পরিচয়। শহর জুড়ে বিষাদের বৃষ্টি গল্পে তিনি এঁকেছেন শত বছরের গড়ে ওঠা বেশ্যালয়ের পতনের গল্প।

আবার তিনি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে মা টাকি এবং একটি ঢোঁড়া সাপের গল্পে দেখিয়ে দিয়েছেন শ্রেণী সংগ্রাম এক অনন্য উপস্থাপন। আর ‘কাঠপরানের দ্রোহ’ নাম গল্পটিতে উঠে এসেছে যুদ্ধাপরাধী নাদের উল্লাহ ফাঁসির প্রতিবাদের নামে দেশজুড়ে যে নৃসংশতা, সেই নৃসংশতায় শুধু রাষ্ট্র নয়, ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষতি ও স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প। কাঠপরানের দ্রোহ গল্পটি সমকালকে ছুঁয়ে ইতিহাস হয়ে ওঠার দাবী রাখে।

পুরো গল্পটি মুক্তিযদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত।এই গ্রন্থের বেশ কয়েকটি গল্পই রিপনচন্দ্র মল্লিক কে বাংলা সাহিত্যের মনোযোগী পাঠকরা মনে রাখবেন। এখানে আমি উল্লেখ করেই বলতে পারি যে, কাঠপরানের দ্রোহ, জ্যোস্নার ঘরে কান্নার স্বর, মা টাকি এবং একটি ঢোড়া সাপের গল্প, সুখনগরে, শহর জুড়ে বিষাদের বৃষ্টি, লুকানোমায়া, আত্মপরিচয়, কালোদাগ, রঙিলা পুতুলের গন্ধ, স্বর্ণ সন্তান গল্পগুলো পাঠকের মনে গেঁথে থাকবে।

প্রতিটি গল্পই পাঠ শেষে পাঠকের মনে এক ধরনের হাহাকার তৈরী করে। যা পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধের মতো গল্পের চরিত্রগুলো মোহবিষ্ট করে রাখে। উপন্যাসের আদলে লেখা প্রতিটি গল্পই পাঠ শেষে মনে হয় যেন একটি একটি উপন্যাস পড়ে শেষ করলাম।

এদিকে তার লেখা অন্ধপাখির চোখে গল্পটি আমাদের জীবনবোধকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। প্রতিটি জীবনই খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটি পাখি, গুই সাপ কিংবা কুকুরেরই হোক। প্রতিটি জীবনই সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্ধপাখির চোখে গল্পটি বাংলা সাহিত্যের একটি জীবন বোধের অন্যতম গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এবং স্বর্ণসন্তান গল্পটি একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানুষের মননে ছড়িয়ে দেওয়ার মত একটি শক্তিশালী গল্প।গল্পটিতে উঠে এসেছে, বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণে বাংলার মানুষ কতটা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধে একটি সড়কও কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠেছে।

সত্যিকার অর্থে স্বর্ণসন্তান গল্পটিও যে কোন ব্যক্তি পাঠ করে সারা জীবনই মনে রাখর মত একটি উন্নত ছোটগল্প। সর্বোপরি বলা যায় যে, রিপনচন্দ্র মল্লিকের ছোটগল্পে পাঠ করলে নিম্নবর্গের মানুষের যাপিত সময়ের চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবোধ মানুষের মনে ছড়িয়ে পড়বে।আলোকিত মানুষ হওয়ার সমস্ত উপকরণ রিপনচন্দ্র মল্লিকের ছোটগল্পে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। পরিশেষে নির্ধিদায় বলতে পারি, রিপনচন্দ্র মল্লিক একজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একজন সফল দায়িত্বশীল গল্পকার। যার গল্পে শুধু দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধই নয় উঠে এসেছে নিম্নবর্গের মানুষের যাপিত চিত্রও।

রিপনচন্দ্র মল্লিক। মূলত ছোটগল্পই লেখেন বেশি। পেশা : সাংবাদিকতা। পিতা : রবীন্দ্রনাথ মল্লিক : মাতা: রিনা মল্লিক। জন্ম তারিখ ১ জুন ১৯৮৬। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার রামশীল ইউনিয়নের খাগবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করে মাদারীপুরের আলো, বাতাস আর জল মাটি গায়ে মেখে বেড়ে উঠেছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাব বিজ্ঞান শাস্ত্রে  স্নাতকোত্তর করেছেন।

দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাংবাদিকতা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। দি বাংলাদেশ টুডে, দৈনিক মানবজমিন, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক মানবকন্ঠ, স্বদেশ প্রতিদিন, আমাদের অর্থনীতি, রেডিও আমার, ডেইলি ইন্ডাষ্ট্রি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন। শখ : ঘুরে বেড়ানো। কাজের ভেতরে সময় পেলেই দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ান। একুশে বইমেলা ২০১৫-তে প্রথম গল্প গ্রন্থ ‘কাঠপরাণের দ্রোহ’ প্রকাশিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যেই ২০০৭ সালে ছোটগল্প লিখে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়ের নামে প্রবর্তিত ‘সুনীল সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ‘কাঠপরানের দ্রোহ’ গল্পগ্রন্থের পান্ডুলিপির জন্য পেয়েছেন দেশ পান্ডুলিপি পুরস্কার ২০১৪।

অমৃতবাজার/এএস