ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৪ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কবি আবদুল হাই মাশরেকীর ৯৯তম জন্মজয়ন্তী রোববার


ময়মনসিংহ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০৮:২৮ পিএম, ৩১ মার্চ ২০১৮, শনিবার
কবি আবদুল হাই মাশরেকীর ৯৯তম জন্মজয়ন্তী রোববার

‘আল্লাাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই’- যুগ যুগ ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থানে থাকা এ পল্লীগীতির লেখক কবি আব্দুল হাই মাশরেকী। শুধু গান নয়, গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় পালাগান-রাখাল বন্ধু, জরিনা সুন্দরী, মাঠের গান,  ঝিঙে ফুলের লতা, দুখু মিয়ার জারি, হযরত আবু বকর (রাঃ) পুঁথি সাহিত্যেরও লেখক ছিলেন এ কবি। ১ এপ্রিল রোববার এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের জীবন জাগরণের রূপকার, মাটি ও মানুষের কবি আবদুল হাই মাশরেকীর ৯৯ তম জন্মজয়ন্তী।

১৯০৯ সালে ১ এপ্রিল কবি ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জে মাতুতালয়ে কাঁকন হাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৮৮ সালে ৪ ডিসেম্বর কবি নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।

কবি’র ৯৯ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে রোববার ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় কবির জন্মশতবার্ষিকী উৎযাপন কমিটি কবির মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ-মাহফিল ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে।

এছাড়া আগামী ২১ এপ্রিল থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় কবি আবদুল হাই মাশরেকী ওপর জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা, কবির লেখা নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ ‘মাশরেকী লোকজ মেলা ও কবি সম্মেলন’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে উৎযাপন কমিটি।

কবি আবদুল হাই মাশরেকী জন্মশতবার্ষিকী উৎযাপনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, কবির কাব্যগ্রন্থ, গল্পগ্রন্থ, সঙ্গীতগ্রন্থ, ও সিডি।

এই তিনদিনের অনুষ্ঠানে কবি আবদুল হাই মাশরেকীর সাহিত্যকর্ম, জীবন-দর্শন নিয়ে আলোচনা করবেন দেশের কবি -সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীগণ।

তিনদিনব্যাপী ‘মাশরেকী লোকজ মেলা’য় অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হবে কবির রচিত কবিতা আবৃত্তি, কাব্যনৃত্য, পালানৃত্য, আধুনিক ও পল্লীগীতি, ও ‘স্বাধীনতার জারী’।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আইসিটি বিভাগের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী।

বক্তব্য রাখবেন, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি নূরুল হুদা, প্রাবন্ধিক ও গবেষক যতীন সরকার, কবি মুশাররাফ করিম, শংকর সাঁওজাল, কবি আমিনুর রহমান সুলতান, কবি আসলাম সানি, কবি সোহরাব পাশা, কবি মাহবুব আলম, ছড়াকার এম আর মঞ্জু প্রমূখ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পীবৃন্দ।

কবি আবদুল হাই মাশরেকীর জন্মশতবর্ষ উৎসব পালনের জন্য গত ২১ মার্চ ১০১ সদস্য বিশিষ্ট উদযাপন কমিটি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় গঠন করা হয়েছে।

কবি সোহরাব পাশার সভাপতিত্বে কবি মাহবুব আলমকে জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক ও আয়কর আইনজীবি আজিজুল হাই সোহাগকে সদস্য সচিব করে ২১ এপ্রিল থেকে ২৩ এপ্রিল তিনদিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনাসভাসহ ‘মাশরেকী লোকজ মেলা ও কবি সম্মেলন’ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এলিশ শারমিন।

এসময় বক্তব্য রাখেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহফুজুল আলম, কবি আশিক সালাম, অধ্যক্ষ নূরুল হক, কবি নাজমা মোমতাজ, সাংবাদিক আবুল কালাম, সাংবাদিক সেলিম মন্ডল, প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা, অধ্যক্ষ মেসবাহ উদ্দিন, শিক্ষক ওমর ফারুক, কবি রামু সাহা, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কাদের ভুঁইয়া, কণ্ঠশিল্পী মিন্টু দেবনাথ, শফিকুল হক মিন্টু, মেম্বার মুজিবুর রহমান, মোশাররাফ হোসেন রতন প্রমূখ।

জন্ম কথা-
১৯১৯ সালের ১ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানার দত্তপাড়া গ্রামে কবি আব্দুল হাই মাশরেকী জন্ম (শিক্ষা সনদ অনুযায়ী) গ্রহণ করেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতোই প্রতিবাদী ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের এ লোককবির মৃত্যুর প্রায় তিন যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে তার অনেক লেখনি। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি দেশের এ বিশিষ্ট গীতিকার,সাহিত্যিক, কবি, গবেষক ও সাংবাদিকের। মাটি ও মানুষের এ লোককবি আব্দুল হাই মাশরেকী ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একজন সাংবাদিক।

চল্লিশের দশকের মধ্যভাগ থেকে সত্তরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মাশরেকীর লেখালেখি উভয় বাংলা তথা কলকাতা ও ঢাকার পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়। তার লেখা কবিতা,গান, ছোটগল্প নানা কাগজে প্রকাশিত হয়।দ’টি নাটক ও কিছু অনুবাদকর্মও তিনি করেছেন। বেশকিছু গীতিনাট্যেরও রচয়িতা তিনি। সে সময়ের মোহাম্মদী, পরিচয়, দিলরুবা, সাওগাত, মাহে-নও, পূবালী, কৃষিকথা, এলানসহ বিভিন্ন সাময়িকিতে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

তার উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে-‘ এই বীভৎস হানাহানি আর-/ এই মৃত্যুকে স্বীকার করিনি কভূ/ মানুষেরপথ’,‘শ্বাপদ হিংস্র নখরে বিঁধিছে তবু/ তবু তো রক্তে ভিজে গেল রাজপথ’, হে আমার দেশ হৃদয়ের প্রেম দিয়ে তোমাকে তো ভালবাসি হে আমার দেশ’, এই তো পেয়েছি মাকে/ বাড়ির সামনে তার নতুন কবর/ ’বধ্যভূমি ঘুরে ঘুরে --।

বাংলা গানের বিশিষ্ট গীতিকার হিসেবে মাশরেকীর নাম স্মরণযোগ্য। যৌবনের প্রারম্ভে তিনি কলকাতার এইচএমভির সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। ১৯৬৮ সালে ঢাকার গ্রামোফোন কম্পানীর সঙ্গেও গীতিকার হিসেবে তিন বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। ঢাকা বেতারের তালিকাভূক্ত গীতিকার তিনি। তার অসংখ্য গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় পল্লীগীতি গানের একটি ‘প্রাণ সখীরে, বাবলা বনের ধারে ধারে বাঁশি বাজায় কে-’ । তার লেখা ‘ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি’ গানটি তৎকালীন রেডিও সংবাদের আগে ও পরে বাজানো হতো।

শহীদদের স্মরণে তার লেখা-‘তারা মরে নাই তারা যে অমর/ নহে গো নহে এ তাদের কবর’। গ্রামীন লোকসাহিত্যের পাশাপাশি তিনি মানুষকে গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহী করতে লিখেছেন-‘ এসো গণতন্ত্র গড়ে তুলি/ নতুন দিনের/ এসো করব কায়েম রাজ-কলুষ হীনেরসহ অসংখ্য গান। দেশাত্ববোধক গানের উল্লেখযোগ্য ‘বাংলা মা তোর শ্যামল বরণ/ হৃদয় আমার করল হরণ’।ইসলামি গানের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় ‘পড়ি তাসমিয়া পড়ি বিসমিল্লাহ/পড়ি লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’।

তিনি কলকাতায় থাকাকালীন এবং ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় গুরুত্বপূর্ণ পান্ডুলিপিগুলো এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দেয়া উপহার ‘হারমোনিয়াম’ সেখানে রেখে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে চলে আসেন।

১৯১৯ সালের ১ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলার ঈশ^রগঞ্জ থানার মাতুতালয়ে কাঁকন হাটি গ্রামে কবি আব্দুল হাই মাশরেকী জন্ম (শিক্ষা সনদ অনুযায়ী)গ্রহন করেন। বাবা ওসমান গনি সরকার আর মা রহিমা খাতুন। বাবা ছিলেন জমিদার বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী।

কবি আব্দুল হাই মাশরেকী পিত্রালয় থেকে প্রাথমিক পাঠ শেষে ঈশ^রগঞ্জের চরনিখলা মধ্য ইংরেজি স্কুলে পরে কাঁকনহাটি গামে মাতুলালয়ে থেকে জাটিয়া হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন ১৯৩৯ খ্রীঃ। অতপর ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেনিতে ভর্তি হয়েও আর্থিক অসচ্চলতার কারণে অকালে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনে ছেদ পড়ে। কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতা ও পরে জুট রেগুলেশনে চাকরি করেন। তিনি দৈনিক সংবাদে সহ-সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে কৃষি মন্ত্রনালয়ের কৃষিকথা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৬ সালে অবসর গ্রহন করেন।

অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার ‘চোর’ গল্প প্রকাশিত হয়। আমাদের সাহিত্যাকাশের নিত্য স্মরণীয় কোন জ্যোতিষ তিনি হতে পারেননি সত্য, তবে অনেক তারকার মধ্যে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল। লিখেও ছিলেন তিনি কম নয়, কিন্তু প্রকাশিত হয়েছে ক’খানা। জীবদ্দশায় প্রকাশিত গ্রন্থগুলো  হলো-‘দুখু মিয়ার জারি’(পল্লিগীতিকা ১৯৬১), ‘কুলসুম’(ছোটগল্প ১৯৯১),‘বাউল মনের নকশা’(‘কুলসুম’ এর নামন্তরিত বর্ধিত সংস্করণ ১৯৫৪),‘সাকো’ (একাঙ্কিকা ১৯৫৯),‘আকাশ কেন নীল’(অনুবাদ শিশুতোষ বিজ্ঞান ১৯৬২), মাঠের কবিতা মাঠের গান’(কবিতা ১৯৭০), নতুন গাঁয়ের কাহিনী’( নাটক ১৯৭০)। ১৯৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর কবি আব্দুল হাই মাশরেকী সকলকে কাঁদিয়ে  না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

মৃত্যুর পর ছেলেদের সহযোগিতায় বেশ কিছু পান্ডুলিপি প্রকাশিত হলেও অনেক পান্ডুলিপি রয়েছে এখনো প্রকাশের বাইরে। এ লোককবির অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি গুলো প্রকাশিত হলে তার প্রকৃত শিল্পীসত্তা ও শক্তিমত্তার প্রকৃত স্থান নিধারন সম্ভব বলে সাহিত্যপ্রেমীরা মত পোষণ করেন।

অমৃতবাজার/বাবুল/শাওন