ঢাকা, সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯ | ১০ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শ্রীলংকায় খাবারের অপেক্ষায় ভান ধরে ছিল হামলাকারী!


অমৃতবাজার ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৪০ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার | আপডেট: ০২:২৭ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার
শ্রীলংকায় খাবারের অপেক্ষায় ভান ধরে ছিল হামলাকারী!

দীর্ঘ ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসানের পর ধীরে ধীরে শান্তি ফিরেছিল শ্রীলংকায়। কিন্তু ইস্টার সানডের দিনে একযোগে বোমা হামলায় আবারও রক্তাক্ত করেছে দেশটিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ ওই হামলার চিত্র। বিস্ফোরণ ঘটানোর আগে শ্রীলংকার সিনামন গ্র্যান্ড হোটেলের ইস্টার সানডে ব্রেকফাস্ট বুফের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল আত্মঘাতী হামলাকারী। খাবারের প্লেট নিয়ে হাতে খাবারের অপেক্ষায় ভান ধরে ছিল।

হোটেলের এক ম্যানেজার বলেন, ওই ব্যক্তি শনিবার রাতে কলম্বোর এ পাঁচ তারকা হোটেলটিতে উঠেছিল। তখন নিজের নাম মোহাম্মদ আজম মোহাম্মদ বলে জানিয়েছিল সে। লাইনের সামনে আসার পর যখন তার প্লেটে খাবার দেয়া হবে ঠিক তখনই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায় ওই ব্যক্তি। বিস্ফোরক তার পিঠে বাঁধা ছিল বলে এএফপিকে জানিয়েছেন ওই ম্যানেজার।

হোটেল ম্যানেজার বলেন, ‘রোববার সাপ্তাহিক ছুটি ও ইস্টার সানডে উপলক্ষে সিনামন গ্র্যান্ডের ট্যাপ্রোবেন রেস্তোরাঁয় তখন বহু লোকের ভিড় ছিল। নিহতদের মধ্যে আমাদের যে ম্যানেজার অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছিলেন তিনিও আছেন।’ নিহতদের মধ্যে আত্মঘাতীও ছিল। পুলিশ তার শরীরের কিছু অংশ অটুট অবস্থায় পেয়ে সেগুলো নিয়ে যায়। এ আত্মঘাতী শ্রীলংকান নাগরিক ছিল বলে জানিয়েছেন হোটেলটির ম্যানেজাররা। তার দেয়া ঠিকানাটি ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। ব্যবসার কাজে সে কলম্বো এসেছে বলে তাদের জানিয়েছিল।

শ্রীলংকায় বেড়ে ওঠা ৪৮ বছরের চিকিৎসক জুলিয়ান ইমানুয়েল বর্তমানে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে বাস করেন। স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে কয়েকদিন আগে তারা কলম্বোয় যান, ওঠেন সিনামন গ্র্যান্ড হোটেলে। বিবিসিকে ইমানুয়েল বলেন, ‘বিকট বিস্ফোরণের সময় আমরা শয়নকক্ষেই ছিলাম। বিস্ফোরণের ধাক্কায় আমাদের কক্ষ কেঁপে উঠেছিল। আমাদের হোটেলের লাউঞ্জে আনা হয় এবং পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে বলা হয়। সেখানে আমরা কয়েকজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পাই।’

নিজের স্ত্রী-সন্তানদের দুরবস্থা নিয়ে দারুণ উদ্বিগ্ন এ চিকিৎসক আরও বলেন, ‘আমি জীবনের প্রথম ১৮ বছর শ্রীলংকায় কাটিয়েছি। ওই সময়ে আমি গৃহযুদ্ধ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখেছি। কিন্তু আমার সন্তানদের বয়স মাত্র ১১ ও ৭। তারা কখনও যুদ্ধ দেখেনি, এমনকি আমার স্ত্রীও না। তাদের জন্য এ এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। এটা সত্যিই খুব দুঃখের। আমি ভেবেছিলাল শ্রীলংকা এসব লড়াই-সংঘাত পেছনে ফেলে এসেছে। কিন্তু এখন দুঃখ হল, তা আবার ফিরে এসেছে।’

কলম্বোর বাসিন্দা উসমান আলি তার বাড়ির কাছের গির্জা থেকে লোকজনকে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে দেখে বুঝেছিলেন খারাপ কিছু একটা ঘটেছে। তার বাড়ির সামনের সড়কে অনেক অ্যাম্বুলেন্স ভিড় করতে দেখে কারণ বুঝতে তিনি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করেন। সেখানে হামলার রক্তাক্ত ছবি ও ভিডিও দেখতে পান। সেখানে আহতদের জন্য রক্ত দেয়ার আবেদন করা হয়। তা দেখে তিনি ন্যাশনাল ব্লাড সেন্টারে ছুটে যান।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক কিরন আরাসারাত্মাম কয়েক দিন আগে শ্রীলংকায় যান। ওঠেন শাংরি-লা হোটেলে, এটির তৃতীয় তলার রেস্তোরাঁয় বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। শরণার্থী হিসেবে ৩০ বছর আগে শ্রীলংকা থেকে যুক্তরাজ্য যান কিরন। একটি সামাজিক উদ্যোগের উদ্বোধন করতে তিনি কলম্বোয় গিয়েছিলেন। যখন হোটেলের রেস্তোরাঁয় বিস্ফোরণ হয় তখন তিনি নিজের কক্ষে ছিলেন।

কিরন বলেন, ‘এত জোরে শব্দ হয়েছিল যে আমি বজ পাত ভেবেছিলাম। সবাই আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন। আমি ডানের একটি কক্ষের দিকে তাকাই, সেখানে সব জায়গায় রক্ত দেখতে পেয়েছি। তিনি বলেন, ‘সবাই দৌড়াতে শুরু করে, বেশিরভাগ মানুষ বুঝতেই পারেননি আসলে কি হয়েছে। আমি লোকজনের শার্টে রক্ত দেখতে পাই। একটি ছোট মেয়েকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলছিলেন একজন। দেয়াল ও মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।’ সকালের নাশতা খেতে যেতে তার সামান্য দেরি হয়েছিল বলে প্রাণে বেঁচে গেছেন, বলেন ৪১ বছরের এ অধ্যাপক।

শ্রীলংকার নেগোম্বোর সেইন্ট সেবাস্টিয়ান গির্জায় চলছিল ইস্টার সানডের উৎসব। অনেকে আগেভাগেই পৌঁছে যান সেখানে। দিলীপ ফার্নান্দো পরিবার নিয়ে ওই গির্জায় যান সকাল সাড়ে ৭টার দিকে। একটু দেরিই হয়ে যায় তাদের। পৌঁছে দেখেন বেশ ভিড়। এত মানুষ দেখে অন্য গির্জায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন দিলীপ। এতে সপরিবারে রক্ষা পেয়েছেন তিনি।

সেখান থেকে চলে যাওয়ার অল্প সময় পরেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সোমবার সকালে আবার ওই গির্জায় গিয়ে এএফপিকে অবসরপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা বলেন, ‘খুব ভিড় ছিল। আমি আর আমার স্ত্রী দাঁড়ানোর জায়গাও পাচ্ছিলাম না। তাই অন্য গির্জার দিকে রওনা দেই।’

দিলীপ ও তার স্ত্রী চলে গেলেও তার পরিবারের অন্য সদস্যরা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে দিলীপের দুই নাতনিও ছিলেন। তারা জায়গা না পেয়ে গির্জা বাইরে বসে অপেক্ষা করছিলেন। সে সময়ই এক তরুণকে তারা দেখতে পান। খুব ভারি একটা ব্যাগ নিয়ে গির্জার ভেতর ঢুকছেন। তাদের বিশ্বাস, ওই তরুণই আত্মঘাতী এ হামলা চালায়। শান্ত চেহারার ওই তরুণ যেতে যেতে দিলীপের এক নাতনির মাথায় হাত রাখেন। তিনি ভেতরে ঢোকার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরণ ঘটে।

দিলীপ বলেন, ‘আমার নাতনিরা জানায়, তরুণটির বয়স ৩০ বছরের মতো হবে। খুব সাদাসিধে চেহারা। তার মধ্যে কোনো উত্তেজনা ছিল না, ভয়ও ছিল না। খুব শান্ত ছিল সে। ওই তরুণ ভেতরে ঢোকার পরপরই বিস্ফোরণ ঘটে।’ বিস্ফোরণের পর দিলীপের পরিবারের সদস্যেরা দৌড়ে ওখান থেকে সরে আসেন। খুব ভয় পেয়েছিলেন সবাই।

অমৃতবাজার/পিকে