ঢাকা, সোমবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৭ | ৭ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে কলেরা ভ্যাকসিন খাওয়ানো হয়েছে


অমৃতবাজার রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৫:৪৪ পিএম, ১১ অক্টোবর ২০১৭, বুধবার
দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে কলেরা ভ্যাকসিন খাওয়ানো হয়েছে

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে গত দু’দিনে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন (টিকা) খাওয়ানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক উখিয়ার জামতলীতে আনুষ্ঠানিকভাবে কলেরার টিকা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। মঙ্গলবার একদিনে এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে টিকা খাওয়ানো হয়েছে। বুধবারও সন্ধ্যা পর্যন্ত এক লাখের মতো টিকা খাওয়ানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। উখিয়া এবং টেকনাফে ২০১টি কেন্দ্রে স্বতঃস্ফূর্তভাবে টিকা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।


রোহিঙ্গা এবং আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এই সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে জরুরিভিত্তিতে টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। উখিয়া সদর হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও প্রতিষেধক টিকা কার্যক্রমের সমন্বয়কারী ডা. মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ আজ বিকালে বাসসকে এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছয়দিন প্রথম রাউন্ডের টিকা কার্যক্রম চলবে। এ সময়ের মধ্যে এক বছরের বেশি বয়সী সকলকে কলেরা ভ্যাকসিন খাওয়ানো হবে এক ফোঁটা করে। ৩১ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ছয় দিন চলবে দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকা কার্যক্রম। এ ছয়দিন এক বছর থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের কলেরার ভ্যাকসিন খাওয়ানো হবে। প্রথম রাউন্ডে সাড়ে ৬ লাখ এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে আড়াই লাখ ভ্যাকসিন খাওয়ানো হবে। মঙ্গলবার এক লাখ ২০ হাজার ভ্যাকসিন খাওয়ানো হয়েছে। আজ বুধবার আরো এক লাখ ভ্যাকসিন খাওয়ানো সম্ভব হবে।’

ভ্যাকসিন কার্যক্রমের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মী দায়িত্ব পালন করছে। এর মধ্যে দুজন টিকা খাওয়াচ্ছেন। একজন ভ্যাকসিন খাওয়ানোর পর রোগীকে শনাক্তকরণ চিহ্ন দিচ্ছেন। একজন লাইনে দাঁড় করাচ্ছেন এবং আরেকজন ক্যাম্পে গিয়ে রোহিঙ্গাদের ডেকে আনছেন। ভ্যাকসিন খাওয়ানোর পর এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি খাওয়ানো হচ্ছে। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী সকলেই কলেরার ঝুঁকির মধ্যে আছেন। এ জন্য স্থানীয় বাসিন্দা ও পুরনো রোহিঙ্গাদেরও কলেরার ভ্যাকসিন খাওয়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে হাম-রুবেলা, পোলিও এবং ভিটামিন-এ টিকা কার্যক্রমের পর আগাম সতর্কতা হিসেবে কলেরা ভ্যাকসিন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পে থাকা সব রোহিঙ্গা এই ভ্যাকসিন কার্যক্রমের আওতায় থাকবে।

রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য কক্সবাজারে অবস্থানকারী চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘সরকার আগাম সতর্কতা হিসেবে কলেরাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৮ হাজার ৪৯২ জন ডায়রিয়া ও অতি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। ৬ হাজার ৬২৬ জন আমাশয়ে ভুগছেন। এখন পর্যন্ত কলেরা রোগী পাওয়া না গেলেও প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ ডায়রিয়া-আমাশয়ে ভুগছে। এতে কলেরা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। সেজন্য আমরা কলেরা ভ্যাকসিন খাওয়ানো শুরু করেছি। এতে রোহিঙ্গারা ১২ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে।’ এর আগে গত ৮ অক্টোবর জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ৯ লাখ কলেরার ভ্যাকসিন কক্সবাজারে পাঠায়।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে কোনো সংক্রামক রোগ রয়েছে কিনা, তা যাচাইয়ে নমুনা সংগ্রহের জন্য সংক্রামক ব্যাধি, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা কেন্দ্র (আইইডিসিআর)-এর একটি বিশেষ মেডিকেল টিম কাজ করছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। এই পর্যন্ত টেকনাফে ৬ জন হাম-রুবেলা আক্রান্ত রোহিঙ্গা শিশু শনাক্ত হয়েছে। হেপাটাইটিস-বি ও সি আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়েছে ১০ জন। এ ছাড়া অসংখ্য রোহিঙ্গা বিভিন্ন ক্যাম্পে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

এদিকে বুধবার সকাল থেকে কুতুপালং ও বালুখালী ক্যাম্প এলাকার কেন্দ্রগুলোতে ভ্যাকসিন দিতে আসা রোহিঙ্গাদের লাইন দেখা গেছে। এদের মধ্যে সবুরা খাতুন ও নাছিম আক্তার জানান ‘বাংলাদেশ সরকার আমাদের টিকা দিচ্ছেÑ যাতে কলেরা না হয়। আমাদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে, ওষুধপত্র দিচ্ছে।’

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার সময়ে সঙ্গে নিয়ে আসছে মারাত্মক সব সংক্রামক রোগ। ইতোমধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে বিভিন্ন ক্যাম্পে। অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর আগে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা শিশুকে দুই লাখ ৮০ হাজার ডোজ হাম-রুবেলা, পোলিও এবং ভিটামিন-এ প্রতিষেধক টিকা দেয়া হয়েছে। ডায়রিয়া ও অতি ডায়রিয়ার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ-বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) উখিয়া ও টেকনাফে চারটি কেন্দ্র খুলেছে।

অমৃতবাজার/অনির্বান

Loading...