ঢাকা, রোববার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১১ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ইংরেজ প্রতিরোধের প্রথম নাম ফকির মজনু শাহ


অমৃতবাজার ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩:২৯ পিএম, ১৩ জানুয়ারি ২০২০, সোমবার
ইংরেজ প্রতিরোধের প্রথম নাম ফকির মজনু শাহ ছবি- প্রতিকী ফকির মজনু শাহ

চতুর ইংরেজরাও বুঝতে পারেনি, এক ফকিরের তরবারির ধার কতখানি! বোঝেনি, সেই ফকিরের নেতৃত্বের জোর সারা দেশে তাদের বিরুদ্ধে প্রথমবার বিদ্রোহ সংঘটিত করে তুলতে পারে। তবু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম বা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস কিন্তু সাক্ষ্য দেয়, সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাই সম্ভব করে তুলেছিলেন মজনু শাহ। মজনু ফকির নামেও যিনি পরিচিত। যদিও তথাকথিত জাতীয়তাবাদী ইতিহাস দেশের বীর সন্তান বলে যাঁদের কথা বলে থাকে, তাঁদের সঙ্গে একাসনে প্রায় কখনোই তাঁকে বসানো হয় না। প্রকৃত প্রস্তাবে, প্রথমবার ইংরেজদের ঘুম যিনি কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি এই মজনু ফকিরই। সেই অর্থে তিনি-ই আমাদের প্রথম বিদ্রোহী নায়ক।

ইংরেজরা শোষণের কলে জোর দিতে কসুর করেনি। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এল অবধারিত ভবিতব্য হয়ে। বাংলা-বিহারের গ্রামসমাজের সেই রক্ষাকবচটি এর ফলে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হল। ইতোমধ্যে বস্ত্রশিল্পীদের বুড়ো আঙুল কেটে নিয়ে শিল্পবিপ্লবের পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। বাংলা-বিহার থেকে এই যথেচ্ছ লুটতরাজই গোটা দেশ দখলে প্ররোচিত করে ইংরেজদের। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে তারা ওস্তাদ-ই ছিল। ফলে বিবাদে জীর্ণ দেশীয় রাজাদের কবজা করে ভারত দখল করতে তাদের বেশি বেগ পেতে হয়নি। এর উপর জুড়ে বসল তীর্থভ্রমণের কর। মূলত বাংলা-বিহারেই। এতে ঘৃতাহূতি হল। মূলত কৃষক, বস্ত্রশিল্পী কারিগরদের মধ্যে যে ক্ষোভ সঞ্চিত ছিল, তা গতি পেল সন্ন্যাসী-ফকিরদের অসন্তোষে। এই সেই মুহূর্ত যখন সঠিক নেতৃত্ব পেলে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে পারে বিদ্রোহ। ঠিক সময়েই এগিয়ে এসে হাতে তরবারি ও নেতৃত্বভার তুলে নিয়েছিলেন মজনু শাহ।

১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ থেকেই এই বিদ্রোহীরা ইংরেজদের জব্দ করতে শুরু করে। প্রথমে দখল করা হয় ঢাকার ইংরেজ কুঠি। রাতের অন্ধকারে ফকির-সন্ন্যাসীরা গিয়ে কুঠি ঘিরে ফেলে। ইংরেজরা প্রায় হতবুদ্ধি হয়ে গা ঢাকা দেয়। ক্লাইভ তো এই ঘটনায় এত চটে যান যে, কুঠির প্রধানকে বরখাস্ত করেন। বেশ কয়েক মাস পরে সে-কুঠি পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয় ইংরেজরা। এরপরও বেশ কয়েকটা কুঠি দখল করেন বিদ্রোহীরা। অনুমান করা হয়, এগুলোর নায়ক ছিলেন কোনো এক ফকির। অন্যদিকে দিনহাটায় ইংরেজ লেফট্যানান্ট মরিসনের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ বাধে সন্ন্যাসীদের। এই যুদ্ধে সন্ন্যাসীদের নেতৃত্ব দেন রামানন্দ গোঁসাই। এবং মরিসনের বাহিনী সন্ন্যাসীদের কাছে হার স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ইংরেজের টনক নড়ে। মন্বন্তরের পর বিদ্রোহীরা ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে হারতে থাকে। এমনকী মজনু শাহের নেতৃত্বেও একবার পরাজয় বরণ করে বিদ্রোহীরা। এখান থেকেই মূলত মজনু ফকিরের নেতৃত্বের দৃঢ়তা আমরা লক্ষ করব। তিনি দমে তো যাননি, উলটে ছত্রভঙ্গ বিদ্রোহীদের পুনরায় সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে নেমে পড়েন।

মজনু চেয়েছিলেন, কৃষকদের সঙ্গে বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে যেন ঐক্যবদ্ধ হন জমিদার শ্রেণীও। নাটোরের জমিদার রানি ভবানীকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চিঠি দিয়েছিলেন। এর উল্লেখ আমরা পাই সুপ্রকাশ রায়ের ‘ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ বইটিতে। মজনু লিখেছিলেন, ‘পূর্বে ফকিররা একাকী ভিক্ষা করিয়া বেড়াইত, এখন তাহারা দলবদ্ধ হইয়াছে। ইংরেজরা তাহাদিগের এই ঐক্য পছন্দ করে না। তাহারা ফকিরদের উপাসনায় বাধা দেয়। আপনিই আমাদের প্রকৃত শাসক, আমরা আপনার মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করি। আপনার নিকট হইতে আমরা সাহায্য লাভের আশা করি।” রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট। যদিও এ আবেদনে ফল মেলেনি। তথাপি মজনু বসে থাকেননি। দেশীয় কামারশালে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়েই তাঁর বাহিনী তৈরি করেছিলেন। এরা গেরিলা যুদ্ধেও ছিল পটু। জমিদার ও ধনী শ্রেণির মানুষের সম্পদ লুট করত। গ্রামবাসীরা এদের সহায় ছিল। তারা জমিদারকে রাজস্ব না দিয়ে তুলে দিত মজনু ও তাঁর বাহিনীর হাতে। ফলে রাজস্ব আদায়ে বিরাট ঘাটতি দেখা গেল। তখন কী ছিল ইংরেজদের প্রতিক্রিয়া?

রংপুরকে কেন্দ্র করে এই সময় সক্রিয় হয় বিদ্রোহীরা। উত্তরবঙ্গেও তাদের হাতে ধাক্কা খাচ্ছিল ইংরেজ। অত্যাচার করেও রাজস্ব আদায় হয় না। যে গ্রাম-সমাজকে ইংরেজরা ধ্বংস করেছিল, সেই গ্রাম-সমাজের সহায়তাতেই বিদ্রোহীরা শাসন ব্যবস্থাকে প্রায় অচল করে তুলেছিল। ইংরেজবাহিনী কোনোদিক থেকেই এঁটে উঠতে পারছিল না। এমনকি রণকুশলতাতেও। যেমন, একটা যুদ্ধে বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়। সেই আনন্দে ইংরেজ বাহিনী যখন গোলাগুলি শেষ করে ফেলেছে, তখন গ্রামবাসীদের নিয়ে চারদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিদ্রোহীরা। প্রথম পরাজয় আসলে ভান ছিল। বিদ্রোহীদের দাপটে নাভিশ্বাস ওঠে ইংরেজদের। শেষমেশ তাদের দমন করার কঠোর নির্দেশ আসে উপরমহল থেকে।

ইংরেজদের সবরকম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মজনু বিদ্রোহীদের একজোট করতে থাকেন। দিনাজপুরে তাঁর উপস্থিতি খবর পেয়ে ইংরেজ এত আতঙ্কিত হয় যে, রাজস্ব রক্ষায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কৌশলে যুদ্ধ এড়িয়ে মজনু বিদ্রোহীদের এককাট্টা করে হয়তো আরও ব্যাপক আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ এবং ফকিরদের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ মিটিয়ে ঐক্য আনাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। পূর্ববঙ্গ ও উত্তরবঙ্গ জুড়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়ে এ কাজটি করতেও পেরেছিলেন। এই সময়ে ইংরেজদের চিঠিতে একাধিকবার মজনুকে নিয়ে তাদের আশঙ্কা ও আতঙ্কের কথা জানা যায়। শেষমেশ ১৭৮৬ সালে কালেশ্বর নামে এক জায়গায় মজনুর বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজদের সরাসরি যুদ্ধ বাধে। তরবারি হাতে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন স্বয়ং মজনু। শত্রু বেষ্টনী ভেদ করে পালাতেও সক্ষম হন। কিন্তু মারাত্মক জখম হয়েছিলেন। ওই বছরই শেষের দিকে আত্মগোপনরত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ইংরেজরা শত চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত মজনু শাহকে ধরতে পারেনি।

এর পরেও যোগ্য নেতারা কৃষক বিদ্রোহের ভার তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রমে তা স্তিমিত হয়ে আসে। সন্ন্যাসী ও কৃষক বিদ্রোহ যে ব্যাপক আকার নিয়েছিল, তা কেবলমাত্র মজনু শাহের নেতৃত্বের কারণে নয়। রামানন্দ গোঁসাইয়ের মতো আরও অনেকেই ছিলেন, যাঁরা সে সময় আগুন জ্বালিয়েছিলেন। মজনুর পরবর্তীতে ভবানী পাঠক বা দেবী চৌধুরানিও এই সংগ্রামের ইতিহাসে চলে আসেন। কিন্তু এ-কথা ঠিক যে, মজনু ফকিরই প্রথম সার্থকভাবে একটা বিদ্রোহকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। খণ্ডযুদ্ধ ও বীরত্বের প্রদর্শন নয়, অর্থ জোগাড় করে, গ্রামবাসীদের বিশ্বাস অর্জন করে, জমিদার শ্রেণির কাছে আবেদন জানিয়ে, অন্তর্কলহ মিটিয়ে, ধর্ম ও অন্যান্য ভেদাভদের ঊর্ধ্বে উঠে এবং সর্বোপরি ইংরেজদের আক্রমণ করে এক বৃহত্তর ও ব্যাপক বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পেরেছিলেন তিনি। প্রথম বিদ্রোহী নায়কের শিরোপা তাই তাঁরই প্রাপ্য।

আমাদের ইতিহাসে যে দেশপ্রেমিকদের আত্মদানের কথা আমরা শুনেছি এবং গৌরবের সঙ্গে তা স্মরণ করে থাকি, সেখানে সর্বাগ্রে ঠাঁই হওয়ার কথা মজনু ফকিরেরই। ফকির শব্দটি তার স্বীয় সম্মান পায় যখন তার সঙ্গে মজনু শাহের নাম মিশে থাকে, কোনও রাজনৈতিক বক্তৃতার করতালিমুখর চটক নয়। আসলে দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদ-কে নিয়ে নানা রাজনৈতিক দলই ছক্কা-পুট খেলছে। এর হাতে সাত ফুট মূর্তি থাকলে, ওর আস্তিনে তাই লোকানো দশ ফুট মূর্তির নকশা। এই দেশপ্রেমের প্রতিযোগিতা যে কী মারাত্মক, সে আমরা আজ হয়তো হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছি। আর সেই বিপর্যয়ের মুখেই মজনু শাহ হয়ে ওঠেন আমাদের বাঁশের কেল্লা। আমরা চিনতে পারি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের স্বরূপ, যা ধর্ম নয়, কেবলমাত্র মানুষের অধিকার অর্জনের ভিত্তিতে-ই প্রতিষ্ঠিত। সেই স্বাধিকার অর্জনই দেশপ্রেম। কোনো আখ্যানই এর বিকল্প যেন না হয়ে উঠতে পারে, মজনু শাহের খোলা তরবারি যেন আমাদের সে-কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

সূত্রঃ প্রহর ডট ইন

অমৃতবাজার/এমআর