ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৯ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

১৬ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র একজন ওয়াহেদ আলী


শাহাদত হোসেন কাবিল

প্রকাশিত: ১২:৪৫ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০১৯, সোমবার
১৬ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র একজন ওয়াহেদ আলী

দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ওয়াহেদ আলী সরদার নামে মাত্র একজন কাজটি করেন। যশোর শহরতলীর চাঁচড়া থেকে দক্ষিণে ৬ কিলোমিটার দূরের গ্রাম সাড়াপোলে তার বাড়ি। ওই বাড়িতে গেলে যে কেউ ভাববেন তিনি ভাংড়ি ব্যবসায়ী। উঠানে বড়সড় একটি লোহার ঢিবি। বোঝা যায় গ্রাম ধুড়ে কুড়িয়ে এনেছেন। একদিন বেঁচে দেবেন ভাংড়ি আড়ৎদারের কাছে।

কিন্তু না, তিনি ভাংড়ি ব্যবসায়ী নন। ওই ব্যতিক্রমী কাজ করতে গিয়ে এই লোহা তিনি পেয়েছেন। বিল বোর্ড টানানোর জন্য বেআইনীভাবে গাছে ঠোকা পেরেক তিনি তুলে ফেলেন। আর ওই পেরেক এক জায়গায় রাখায় বড় ঢিবি সৃষ্টি হয়েছে।

আবদুল ওয়াহেদ সরদার বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত বৃক্ষ প্রেমিক। তিনি ঘর-সংসার ফেলে রাস্তায় রাস্তায় গাছ লাগিয়ে বেড়ান। গাছের ওপর নির্যাতন বন্ধ ও তাদের রক্ষা করতে ব্রতচারীর মতো ঘুরে বেড়ান। গাছের গোড়ায় গিয়ে তাদের বোবা কান্না শোনেন। তাদের এই কান্নার প্রতিকারে এখন বিল বোর্ডের পেরেকে ত-বিত গাছের গভীরে ঢোকানো পেরেকগুলো দরদের সাথে তুলে গাছের কষ্ট নিবারণ করেন।

তিনি এভাবে ইতোমধ্যে ৬ মণ ১০ কেজি পেরেক তুলে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। সাড়ে ৮ মাসে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে গাছ থেকে তিনি এই পেরেক তোলেন।

তিনি জানান, গত বছর ১৮ জুলাই যশোর টাউন হল মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের একটি মেহগনি গাছের পেরেক তোলার মধ্য দিয়ে তার এ অভিযান শুরু করেন। একটানা তোলেন গত ২০ মার্চ পর্যন্ত। এ সময়ে তিনি প্রায় এক হাজার কিলোমিটার রাস্তার লক্ষাধিক গাছ থেকে পেরেক তোলেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই দীর্ঘ সময়ে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। সুযোগের অভাবে বেশির ভাগ দিন গোসল হয়নি তার। তার ভাষায় কাজ করতে করতে যেখানে রাত সেখানে কাত হয়েছেন, অর্থাৎ ঘুমিয়েছেন। এই ঘুমের জায়গা হলো পথের ধারের টি স্টলের বেঞ্চ অথবা স্কুল-কলেজের বারান্দা।

গাছে বিল বোর্ড টানানো বেআইনী। বিশেষ করে পেরেক ঠুকে বিল বোর্ড টানানো বড় অপরাধ।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পেরেক তুলতে গিয়ে যাদের বিল বোর্ড সরানো হয়েছে তারা কিছু বলেনি, বলেছে অতি উৎসাহী পুলিশ। অথচ পুলিশ হলো আইন প্রযোগকারী সংস্থা।

‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১২’ অনুযায়ী কোনো প্রকার প্রচার কাজে গাছ ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংস্থা এ আইন পরোয়া করছে না। তারা প্রচার কাজে শুধু গাছ ব্যবহারই করছে না, নির্দয়ভাবে গাছে বড় বড় পেরেকও ঠুকছে।

আবদুল ওয়াহেদ সরদার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এক দিক থেকে তিনি যে গাছের পেরেক তোলেন, অন্য দিকে সেই গাছে আবার পেরেক ঠুকে বিল বোর্ড টানানো হয়। বিষয়টির প্রতি বন বিভাগ ও প্রশাসনের কোনো নজর নেই। অথচ কাজটা কিন্তু তাদেরই। আইন বাস্তবায়নে তারাই দায়িত্বপ্রাপ্ত।

খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, আইনী শক্তি হাতে না থাকায় যারা গাছে পেরেক ঠুকছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছিনে। তবে আবদুল ওয়াহেদের এ শুভ উদ্যোগে সহযোগিতা করার জন্য গাছে পেরেক না ঠোকার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে জনসচেতনতা বাড়াতে বিল বোর্ড টানানো যেতে পারে।

আবদুল ওয়াহিদ সরদার জানান, গাছের প্রতি প্রাণের টানে তিনি বাংলা ১৪১২ সাল থেকে গাছ লাগানো শুরু করেন। তিনি নিজের খরচে প্রায় ৯০ বিঘা জমিতে গাছ লাগিয়েছেন। তার রোপিত গাছের সংখ্যা সাড়ে ১৩ হাজার। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল,লিচু, পেয়ারা, জামরুল, কালোজাম, কাগজি লেবু, আমড়া, কামরাঙ্গা, জলপাই প্রভৃতি। নিজের জমি না থাকায় তিনি এই গাছ লাগান সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, পতিত জায়গা ও রাস্তার পাশে। যশোর কালেক্টরেট চত্বর, এসপি অফিস, পুলিশ লাইন্স এবং চৌগাছা, মণিরামপুর ও অভয়নগর থানা চত্বর, বাগআঁচড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, বেজপাড়া আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্প চত্বর, স্টেডিয়ামপাড়া মিতালী সংঘ সংলগ্ন এলাকা, ট্রাফিক অফিস, চেকপোস্ট, বিল হরিণার শ্মশানঘাট, সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের ৮টি রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে তার রোপিত গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ওয়াহিদ সরদারের মহৎ কর্মের স্বীকৃতি ঘোষণা করছে।

এ স্বীকৃতিকে অস্বীকার করতে পারেনি সরকারও। তাই তাকে প্রদান করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪২১। প্রধানমন্ত্রী তার গলায় পরিয়ে দেন ব্রোঞ্জ পদক। একই সাথে পান ২৫ হাজার টাকা।

অমৃতবাজার/আরএইচ