ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭ | ৫ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ভ্রমনে ভোগান্তি: সুন্দরবনে কমছে পর্যটক ও রাজস্ব


বাগেরহাট সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১০:৫৯ এএম, ১১ অক্টোবর ২০১৭, বুধবার | আপডেট: ১১:০০ এএম, ১১ অক্টোবর ২০১৭, বুধবার
ভ্রমনে ভোগান্তি: সুন্দরবনে কমছে পর্যটক ও রাজস্ব

বিশ্বের বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় ও অন্যতম দর্শনীয় এ বন দেশের রাজস্ব আয়ের দিক থেকেও অতি গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনের মাছ, কাঠ, মধু থেকে বিপুল রাজস্ব আসে। এর পাশাপাশি বড় অংকের রাজস্ব আসে পর্যটকদের কাছ থেকে। কিন্তু নানা কারণে সুন্দরবনে বিদেশি পর্যটক আশংকাজনকভাবে কমছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের তথ্য মতে, ২০১২-১৩ সালে সুন্দরবনে বিদেশি পর্যটক এসেছিল ৩ হাজার ৮শ’ ৫৪ জন। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে তা নেমে এসেছে ২ হাজার ১শ’ ২৯ জনে। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪শ’ ৬৫ জন। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে তা বেড়ে ৩ হাজার ৭শ’ ৪১ জনে পৌঁছুলেও ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ফের কমে ২ হাজার ৫শ’ ৩৭ জনে নেমে যায়।

শুধু বিদেশি নয়, ২০১২-১৩ অর্থ বছরের পরে ২০১৫-১৬ অর্থ বছর পর্যন্ত দেশি পর্যটকও  ছিলো। ২০১২-১৩ সালে সুন্দরবনে দেশি পর্যটক সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৫শ’ ৬০ জন। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে এ সংখ্যা আশংকাজনক হারে নেমে ৭৫ হাজার ৭শ’ ৪২ জনে দাঁড়ায়। তবে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে কিছুটা বেড়ে ৭৭ হাজার ৪শ’ ৭৩ জন দেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে দেশি পর্যটক আরো বেড়ে হয় ৯১ হাজার ৮শ’ ২১ জন। তবে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে দেশি পর্যটক সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লক্ষ ২২ হাজার ৫শ’ ৩৪ জনে।

২০১২-১৩ অর্থ বছরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া মোট রাজস্ব  ছিল ১ কোটি ৩ লক্ষ ৬৮ হাজার ৮শ’ ৯০ টাকা।  ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে যা কমে  দাঁড়িয়েছিল ৬৭ লক্ষ ৪ হাজার ৬০ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে তা বেড়ে ৮৫ লক্ষ ৩১ হাজার ২শ’ ৭০ টাকায় পৌঁছুলেও ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ফের ৭৫ লক্ষ ৬৫ হাজার ৪শ’ ৮০ টাকায় নেমে যায়। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে রাজস্ব আয় হয় ৮২ লক্ষ ৬১ হাজার ৬শ’ ১০ টাকা, যা ২০১২-১৩ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২১ লাখ টাকা কম।

সুন্দরবন ভ্রমণে পর্যটক আসা কমে যাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাবসহ নানাবিধ সমস্যা। পর্যটকদের প্রথমত প্রয়োজন হয় একটু হাত-মুখ ধুয়ে বিশ্রাম নেওয়ার। সেই বিশ্রাম নেওয়ার জন্য মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ইজারা দেওয়া পিকনিক কর্নারে ও বন বিভাগের রেস্ট হাউস সংলগ্ন জায়গাতেও নেই একটি বিশ্রামাগার কিংবা যাত্রী ছাউনি। এ ছাড়া এ পিকনিক স্পটে রয়েছে ইজারাদারের অনিয়ম ও দুর্নীতি। সুন্দরবনে ভ্রমণে আসা নারী-পুরুষ, শিশু ও বয়স্কদের ভাড়া করা নৌযানে যেতে হবে করমজল কিংবা হাড়বাড়িয়াসহ অন্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে।

সেখানে যেতে প্রথমেই মোংলার স্থায়ী বন্দর এলাকার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ও ফেরিঘাট থেকে নৌযানে উঠতে হবে। কিন্তু নৌযানে ওঠার মতো কোনো ঘাট এখানে নেই। ঘাট না থাকায় পর্যটকরা নৌযানে উঠতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। নৌযান মালিক ও স্টাফরা টানাহেঁচড়া করেই যাত্রীদের নৌযানে তুলছে। নৌযানে উঠতে গিয়ে পর্যটকদের যে হয়রানির শিকার হতে হয় তাতে আর তাদের বন দেখার শখ থাকে না। এরপর নৌযানের ভাড়া নিয়ে দরকষাকষি। যে যার মতো গলাকাটা ভাড়া আদায় করছে পর্যটকদের কাছ থেকে।

করমজল ও হাড়বাড়িয়াসহ পর্যটন স্পটগুলোতে জনপ্রতি নির্দিষ্টহারে বন বিভাগকে রাজস্ব দিয়ে ভ্রমণ করতে হয়। করমজলে একটি শৌচাগার থাকলেও সেখান থেকে ৫/১০ টাকা করে আদায় করা হয়। হাড়বাড়িয়ায় পর্যটকদের জন্য কোনো শৌচাগার নেই। আছে শুধু একটি ‘ফুট ট্রেইলার’ ও একটি ওয়াচ টাওয়ার। বনের ভিতর ঘুরে বেড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো এলাকাও সংরক্ষিত নেই। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় পর্যটকদের থাকার জন্য হোটেল, মোটেল ও কটেজ না থাকায় দিনে দিনেই ফিরে যেতে হয় তাদের গন্তব্যে। তা না হলে যেতে হয় মোংলা অথবা খুলনা শহরে। এ ছাড়া সুন্দরবনে ভ্রমণের জন্য কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তারক্ষী দিতে পারলেও নেই গাইডের ব্যবস্থা। তাই ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে বন ভ্রমণ করতে হয়।

http://www.amritabazar.com/media/PhotoGallery/2016July/b20171010235708.jpg

দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অতি জরুরি হয়ে পড়ে ট্যুরিস্ট গাইডের। গাইডরা পর্যটকদের বন ঘুরিয়ে দেখান। কোথায় যাওয়া যাবে, কোথায় যাওয়া যাবে না, বনে কী করা যাবে, কী যাবে না- এ সব গাইডরা অবহিত করে থাকেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রশিক্ষিত তেমন গাইড তৈরী হয়েনি।

সুন্দরবনের পর্যটন ব্যবসায়ী এইচ এম দুলাল বলেন, মূলত সুন্দরবন ভ্রমণের মত অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এখন গড়ে ওঠেনি। তাই পর্যটকদের আগ্রহ ও আগমন কমছে বৈ বাড়ছে না।

সুন্দরবন ভ্রমণ শেষে ফিরে যাওয়া বেশ কয়েকজন দেশী পর্যটক ভ্রমণে তাদের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেন, সুন্দরবনের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করা গেলেও এর মধ্যে তাদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হওয়ায় অনেক আনন্দই ম্লান হয়ে গেছে। এসব পর্যটকরা সুন্দরবনে ভ্রমণে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন।

http://www.amritabazar.com/media/PhotoGallery/2016July/b20171010235425.jpg

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, নিরাপত্তা সঙ্কটের পাশাপাশি সুন্দরবন কেন্দ্রিক বড় কোনো পর্যটন প্রকল্প না থাকায় সুন্দরবনে পর্যটক ও রাজস্ব আয় কমছে। এ ছাড়া  অবকাঠামোগত অনেক ঘাটতি আছে। পর্যাপ্ত বাজেট পেলে পর্যায়ক্রমে পর্যটন স্পটগুলোতে জেটি ও অবকাঠামো নির্মাণসহ উন্নত ও আধুনিকায়ন করা হবে। তারপরও বর্তমানে যে ব্যবস্থা রয়েছে তাতে পর্যটক আসলে আমরা সাধ্যমত সেবা দেয়ার চেষ্টা করি।  

অমৃতবাজার/ইমরুল/সাইফুল

Loading...