ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

খেয়া ঘাটের মাঝি প্রতিবন্ধী প্রদীপ


আরমান খান, রাঙামাটি

প্রকাশিত: ১২:২০ পিএম, ১৯ মে ২০১৭, শুক্রবার
খেয়া ঘাটের মাঝি প্রতিবন্ধী প্রদীপ

‘মা যদি হও রাজি, বড় হলে আমি হব খেয়া ঘাটের মাঝি’ কবিতার এ লাইনের মতো জীবনের ছন্দ যেন মিলে গেছে প্রতিবন্ধী যুবক প্রদীপ জলদাসের। জন্ম থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে পায়ে হেঁটে চলাচল করতে পারে না সে । দু‘হাতে ভর দিয়ে চলতে হয় তাকে। এখন এ দু‘হাতেই তুলে নিয়েছেন বৈঠা। দিনভর খেয়া পারাপার করেই চলে তার জীবন জীবিকা।

রাঙামাটির লংগদু উপজেলার মাইনীমূখে জালিয়াপাড়ায় বসবাস প্রদীপের। বাবা নেই, মা থাকেন বড় ভাইয়ের সংসারে। সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে নিয়েই তাদের টুনাটুনির সংসার। যা রোজগার করেন তাতে কোনো মতে চলে যায় দু’জনের। তবে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে অনেক যাত্রী মালামাল নিয়ে আমার নৌকায় ওঠে না। কারণ অন্য মাঝিদের মতো আমি তাদের মালামাল ওঠাতে নামাতে পারিনা। গত সোমবার জারুলবাগান-মাইনীমূখ বাজার খেয়া ঘাটে আলাপকালে এমনটাই জানালেন প্রতিবন্ধী মাঝি প্রদীপ জলদাস।

ছোট বেলায় মাইনীমূখ বাজারে ভিক্ষা করতেন প্রতিবন্ধী প্রদীপ জলদাস। বড় হওয়ার পর ভিক্ষা ছেড়ে দিয়ে নৌকা চালানো শুরু করেন। প্রদীপ অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, বুঝতে শেখার পর ভিক্ষা করতে মন চাইতো না। অনেক সময় বাড়ি থেকে বাজারে আসলেও ভিক্ষা না করে দিনশেষে ফিরে যেতাম। জালিয়াপাড়া থেকে মাইনীমূখ বাজারে আসতে নৌকা পার হতে হয়। প্রতিদিন নৌকায় যাতায়াত করতে করতে সিদ্ধান্ত নিলাম আমিও নৌকা চালাবো। ঘরে গিয়ে মাকে রাজি করালাম। সেই থেকে শুরু। আর কখনো ভিক্ষা করিনি।



নিজের নৌকা নেই। অন্যের নৌকা ভাড়া নিয়ে চালান প্রদীপ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিশ টাকা ভাড়া দিতে হয়। বাকী সময় কোনো কাজ থাকে না। ফলে আয় রোজগারও কম হয়। নিজের একটা নৌকা থাকলে বেশি ভাল হতো। নতুন একটা নৌকা বানাতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়।
 
প্রতিবন্ধী মাঝি প্রদীপের সঙ্গে দশ মিনিটের নৌ ভ্রমনে আরো জানা যায়, সরকারি সাহায্য বলতে শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী ভাতাটাই পাচ্ছেন। আর কোনো সাহায্য সহযোগীতা কখনো পায়নি। একটা ভিজিডি কার্ড পেলে বেশ উপকার হতো। আমার মতো মানুষের একটা কার্ড পাওয়ার অধিকার কী নেই? এলাকার চেয়ারম্যান মেম্বারদের অনেকবার বলেছি, কেউ দেয়নি।
 
কথা বলতে বলতে পাড়ে চলে এলাম। দশ টাকা ভাড়া দিতে চাইলে নিতে চাচ্ছিলো না সে। বলে স্যার, আপনি আমার কথা শুনেছেন এতেই আমি খুশি। আপনার থেকে ভাড়া নেই কেমন করে। অগ্যতা জোড় করেই ভাড়া দিতে হলো।
 
একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্বেও ভিক্ষা ছেড়ে নৌকা চালিয়ে জীবন সংগ্রামে নামা প্রদীপদের পাশে আমাদের দাড়ানো প্রয়োজন। যে যুবক নিজের আত্মসম্মানের কথা ভেবে ভিক্ষা ছেড়ে দিয়েছেন। তাকে অন্তত সরকারি সাহায্য সহযোগীতা দেয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সুদৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

অমৃতবাজার/আরমান/রেজওয়ান

Loading...