ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

নারী পাচারকারী জব্বার ও গরুর দালাল বিল্লাল হঠাৎ ‘সাংবাদিক’


এম আলমগীর, ঝিকরগাছা

প্রকাশিত: ০৫:৩৫ পিএম, ১৮ মে ২০২০, সোমবার | আপডেট: ০৫:৪০ পিএম, ১৮ মে ২০২০, সোমবার
নারী পাচারকারী জব্বার ও গরুর দালাল বিল্লাল হঠাৎ ‘সাংবাদিক’ বিল্লাল হোসেন ও আব্দুল জব্বার- ফাইল ফটো

যশোরে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজিকালে আটক আব্দুল জব্বার বরফ বিক্রেতা ও নারী পাচারকারী এবং বিল্লাল হোসেন এলাকায় গরুর দালাল হিসেবে পরিচিত। হঠাৎ সাংবাদিক পরিচয়ে দাপিয়ে বেড়ানো জব্বার-বিল্লাল এলাকার মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন।

সরেজমিনে ঝিকরগাছার বাঁকড়া গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বরফ, ভাজা বিক্রেতা ও নারী পাচারকারী আব্দুল জব্বার এবং গরুর দালাল বিল্লাল হোসেন রাতারাতি মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক হয়ে যায়। আব্দুল জব্বারের লেখাপড়ার যোগ্যতা ক্লাস টু পাস ও বিল্লাল হোসেন এসএসসি পাস।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আব্দুল জব্বার লেখেন জাতীয় পত্রিকা, ১০টি অনলাইন এবং তিনটি ইউটিউব চ্যানেলে। বিল্লাল হোসেন মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক। দুজনে মোটরসাইকেলের সামনে প্রেস লিখে ঘুরে বেড়ান বাঁকড়া এলাকা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে। যেখানে মহিলাদের ঝগড়া-ঝাটি সেখানেই চলে যান মুহূর্তের মধ্যে এবং মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও করা আর মহিলাদের ওপর জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। ইতোমধ্যে লাঞ্ছিতও হয়েছেন কয়েকবার।

এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে গেলে আব্দুল জব্বার সম্পর্কে বিভিন্ন অজানা তথ্য বেরিয়ে আসে। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া গ্রামের আবুল কাশেম ওরফে দুখীর ছেলে আব্দুল জব্বার। ৬ ভাইবোনের মধ্যে জব্বার সবার বড়। তার পিতা অভাবের তাড়নায় নিজ বসতভিটা ছেড়ে চলে যান মণিরামপুর উপজেলার পাঁচপোতা গ্রামে। সেখানে দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। ছোটবেলায় আব্দুল জব্বার তার পিতার সাথে বরফ ও ভাজামুড়ি বিক্রয় করতো। পরে তার মায়ের সাথে চোরাই পথে ভারতে পাড়ি জমান। মুম্বাই শহরে দীর্ঘদিন থাকেন। এরই মধ্যে সখ্যতা গড়ে তোলে একই গ্রামের রেজাউল ইসলামের মেয়ের সাথে এবং তাকেই বিয়ে করেন। তার স্ত্রী এখনও মুম্বাই শহরে অবস্থান করছেন। আব্দুল জব্বার বাংলাদেশ থেকে এলাকার মেয়েদের কাজ দেয়ার নাম করে মুম্বাই শহরে নিয়ে যান। সেখানে তার স্ত্রী তাদের রিসিভ করেন। পরে তাদের বিভিন্ন মদের বারে বিক্রয় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বাঁকড়া গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়েকে ভারতে কাজ দেয়ার কথা বলে নিয়ে গিয়ে বিক্রয় করে দিয়েছিলেন জব্বার। পরে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে ভারতের পুলিশের কাছে আটক হলে ১৪ মাস জেলে থাকেন। শেষে ভারত সরকার তাকে বাংলাদেশ ফেরত পাঠায়। তিনি বাড়ি ফিরে আব্দুল জব্বারের নামে নারী পাচারের মামলা করেন। দীর্ঘ ৬ বছর মামলাটি চলেছে।

আব্দুল জব্বার নিজের অপরাধ ঢাকতে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং বাঁকড়া ইউপি চেয়ারম্যানের সান্নিধ্য লাভ করেন। এ সুযোগে আব্দুল জব্বার এলাকার সন্ত্রাসীদের নিয়ে নারী পাচার মামলার বাদীকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। অবশেষে চাপে পড়ে বাদী তার মামলা তুলে নেন এবং জব্বারের কাছে থাকা একটি সোনার কানের দুল ও নগদ কিছু টাকা ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত দেয়নি।

এলাকা থেকে অনেকে মেয়ে আব্দুল জব্বার ভারতে পাচার করে বিক্রয় করেছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মামলার বাদী জানান। তার মা দীর্ঘদিন মুম্বাই শহরে থেকেছে। তার স্ত্রী এখনও মুম্বাই শহরে থাকে এবং বারে কাজ করে।

বরফ ও ভাজামুড়ি বিক্রয়, নারী পাচার সবশেষে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শেষ করে সম্প্রতি সাংবাদিক হয়েছে আব্দুল জব্বার। তার নামে ৪টি ফেসবুক আইডি আছে। ভারতে গেলে একটি আইডি চলে, বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় সাবেক এমপিকে নিয়ে একটি আইডি এবং বর্তমান এমপি ও অন্যন্য নেতাদের নিয়ে একটি আইডি চালান। যখন যে নেতারা ক্ষমতায় আসে তাদের নিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন লেখা দিয়ে তাদের ছত্রছায়ায় যাওয়ার চেষ্টা করে।

তার ফেসবুক আইডি সূত্রে জানা গেছে, জব্বার জাতীয় ‘মাতৃজগত’ নামে একটি পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে পরিচয় দেন। যার অস্তিত্ব এলাকার মানুষ কোনোদিন দেখেনি। ‘মাতৃজগত টিভি’র জেলা প্রতিনিধি, ‘জেটিভি’র জেলা প্রতিনিধি, ‘ক্রাইম টিভি’র জেলা প্রতিনিধি। এছাড়া অনলাইন ‘আলোচিতবার্তা’র যশোর জেলা ব্যুরো প্রধান, ‘ক্রাইম২৪তালাশ ডটকমে’র ঝিকরগাছা প্রতিনিধি, ‘জনকণ্ঠ নিউজে’র ঝিকরগাছা প্রতিনিধি, ‘অন্যদৃষ্টি’র ঝিকরগাছা প্রতিনিধি, ‘দৈনিক কপোতাক্ষ নিউজে’র যশোর জেলা ব্যুরো প্রতিনিধি, ‘দৈনিক অপরাধ অনুসন্ধানে’র জেলা প্রতিনিধি, ‘বিজয় বাংলা নিউজে’র যশোর জেলা ব্যুরো প্রধান ও ‘ক্রাইম নিউজে’র যশোর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে তিনি কাজ করেন।

স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, একজন ব্যক্তি বাঁকড়ার মতো মফস্বল জায়গায় থেকে জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কিভাবে সাংবাদিকতা করতে পারেন? বাঁকড়ায় বসে যশোর, শার্শা, বেনাপোল, চৌগাছা, মণিরামপুর, বাঘারপাড়া, উভয়নগর, কেশবপুরসহ প্রত্যেক স্থানের নিউজ তারা কিভাবে সংগ্রহ করেন?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তারা বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা ও ফেসবুক থেকে সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহ করে তারা কপি করে এবং সেগুলো ওইসব নাম সর্বস্ব অনলাইন পত্রিকায় দিয়ে নিজের ফেসবুকে শেয়ার করেন।

আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে তার গ্রামের সাধারণ মানুষও অতিষ্ঠ হয়ে আছে এবং তাদের একটি প্রশ্ন, সাংবাদিক হতে গেলে কি কোনো যোগ্যতা লাগে না? টু ক্লাস পাস করে কি সাংবাদিক হওয়া যায়?

এ ব্যাপারে কথা হয় বাঁকড়া গ্রামের ফজর আলী নামে এক ব্যক্তির সাথে। তিনি বলেন, তার জীবনের সবকুল শেষ হয়েছে। এখন সাংবাদিক হয়েছে। কোন যোগ্যতায় সে সাংবাদিক হয়েছে, সেটা আমাদের জানা নেই। তার নামে নারীপাচার মামলা ছিল। জোরপূর্বক তুলে নিয়েছে। আমি সেই মামলার দুই নম্বর সাক্ষী ছিলাম।

বাঁকড়া গোন্দুর মোড়ের মুদি দোকানি তোহিদ বলেন, যে লিখতে পারে না, যে স্কুলের বারান্দায় যায়নি, সে সাংবাদিক হয় কিভাবে? এর আগে চেয়ারম্যানের চামচামি করতো। এখন কিছুই করে না। তাহলে ওর চলে কিভাবে? এলাকার কোনো বাড়িতে যদি বউ-শাশুড়ি ঝগড়া করে, সেখানে তারা চলে যায় ভিডিও করতে।

বাঁকড়া গ্রামের আব্দুল লতিফ জানান, সেদিন আমার সাথে জব্বারের দেখা হয়েছিল, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তুইতো সাংবাদিক, তোরতো কোনোদিন টিভিতে দেখলাম না? তখন জব্বার উত্তর দিল- ফেসবুকে দেখতে হবে!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, জব্বার বিভিন্ন জায়গা থেকে চাঁদা নেয়। কয়েকদিন আগে একটি পার্ক থেকে ১৭ হাজার টাকা এনেছে। ফেসবুকে লেখার কারণে বাজারের রেজাউল ইসলাম নামে এক দোকানির নিকট থেকে টাকা নিয়েছে। আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েল দেয়ার নাম করে ইউনিয়নের বিভিন্ন লোকের নিকট থেকে টাকা নিয়েছে।

মজনু নামের এক ব্যক্তি বলেন, ও বোম্বে থাকতো। ওর বউ বাচ্চা এখনও বোম্বে আছে। সর্বশেষ শিমুলিয়া গ্রাম থেকে একটি মেয়েকে ভারতে পাচার করেছে বলে আমরা শুনেছি।

আব্দুল জব্বারের শ্বশুর রেজাউল ইসলাম জানান, আমার মেয়েকে বিয়ে করার পর তাদের সাথে আমি সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।

এদিকে বিল্লাল হোসেন এলাকায় গরুর দালালি করে সংসার চালাতেন। হঠাৎ করে সে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক বনে যান। কিছুদিন আগে একটি অসুস্থ গরু কেনার পর সে গরু মারা যায়। বিল্লাল সেই গরু জবাই করে তার মাংস গ্রামের মানুষের কাছে বিক্রি করেছিল। লোক জানাজানি হলে গ্রামবাসী সে মাংস ফেরত দেয় এবং কেউ সে মাংসের টাকা দেয়নি। বিল্লাল তার বৃদ্ধ মায়েরও কোনো খোঁজ খবর নেন না বলে গ্রামের মানুষ জানিয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঝিকরগাছা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইমরান রশিদ বলেন, ‘এই ওয়ানলাইন আর টুলাইনই চলুক। মূলধারার পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাক! আমাদের এখানে আছে আফজাল হোসেন চাঁদ। তিনি যা লেখেন তা পড়তে গেলে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ দাঁড়ি, কমা কতক্ষণ পরে দিবে তার ঠিক নেই। ভাষাগত কোনো মিল নেই। এরাই সাংবাদিক, এরাই এডিটর আবার এরাই প্রকাশক, এরাই সবকিছু। বাঁকড়ায় জব্বার আর আমিরুল। তিনটা-চারটা বিয়েও করেছে। শংকরপুরেও একজন আছে।’

তিনি আরো বলেন, এসব দেখে মনে হয় না আর সাংবাদিকতা করি। যতক্ষণ পর্যন্ত নির্দিষ্ট নীতিমালা না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত সাংবাদিকতার মান দিন দিন লুণ্ঠিত হচ্ছে বলেও মত দেন তিনি।

উল্লেখ্য, শনিবার (১৬ মে) আব্দুল জব্বার ও বিল্লাল হোসেনসহ চার প্রতারককে আটক করে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামে এক নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে চাঁদা দাবি করলে স্থানীয়রা তাদের আটক করে পুলিশের সোপর্দ করে। পরে তাদেরকে জেল-হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। এ খবর বাঁকড়া এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।