ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ঝিকরগাছায় দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন বিলীন


এম আলমগীর, ঝিকরগাছা

প্রকাশিত: ০৩:৩৩ পিএম, ০৪ মে ২০২০, সোমবার
ঝিকরগাছায় দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন বিলীন

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার দুই ঘণ্টার বৃষ্টিতে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন নষ্ট করে দিয়েছে। পানির নীচে পড়ে থাকা ধান বাঁচানোর জন্য কৃষককে দ্বিগুন শ্রম দিতে হচ্ছে। কেউ স্কুলের বারান্দায়, কেউ ঈদগাহ মাঠে আবার কেউ রাস্তার উপর ধান এনে শুকানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবুও চারা গজিয়ে যাচ্ছে, রক্ষা পাচ্ছে না ধান।

জানা যায়, গত শুক্রবার দুপুরে টানা দুই ঘন্টা বৃষ্টিতে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন পানির নীচে পড়ে। উপজেলার সকল মাঠে হাজার হাজার হেক্টর জমির কাটা ধান পানির তলিয়ে রয়েছে । বিচালী রেখে ধান সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে অনেক কৃষক। এতে করে ধানের ও বিচালীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এবং কৃষকের খরচ দ্বিগুন বেড়ে যাবে বলে অনেক কৃষক জানিয়েছেন।

ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের হিসাব মতে, চলতি বছরে উপজেলায় ১৮ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী ধান উৎপাদিত হয়েছে। চাষ হয়েছে ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে। এবং মোট সাড়ে ৮৬ হাজার মেট্্িরকটন ধান উৎপাদিত হবে। অন্য কয়েক বছরের তুলনায় এবার প্রাকৃতিক দূর্যোগ কম হওয়ায় ধানে বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষক লাভের স্বপ্ন দেখছিল কিন্তু শুক্রবার দুপুরে টানা দুই ঘন্টা প্রবল বৃষ্টিতে কৃষকের সেই স্বপ্ন বিলিন করে দিয়েছে। লাভের পরিবর্তে এখন লোকসানের ঘানি টানতে আর দ্বিগুন শ্রম দিতে হবে প্রতিটি কৃষকের। প্রতিটি ক্ষেত্রে খরচের পরিমাণ বেড়ে যাবে। ধানের রং পরিবর্তন হয়ে যাবে। ফলে ধানের মূল্য কমে যাবে।

সরোজমিনে দেখা যায়, উপজেলার নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় মতিয়ার রহমান ও ঈদগাহ মাঠে লাল্টু মিয়া নামে দুই কৃষক ধান তুলেছে। তারা জানায়, এই ধান বিক্রয় করে দায়-দেনা পরিশোধ করতে হবে। সংসার চালাতে হবে। ধান যদি ভাল দামে বিক্রয় করতে না পারি, তাহলে দেনা বোঝা নিয়ে পথ চলতে হবে। সে জন্য ধান বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু তবুও তেমন কোন ফল পাওয়া যায়নি। ধানে চারা গজিয়ে গেছে। জানিনা কেমন দামে ধান বিক্রয় করতে পারবো।

কৃষক আব্দুর রশিদের জানান, শুক্রবার সকালে আড়াই বিঘা জমির ধান কেটেছি। দুপুরের পানিতে সবই পানির নিচে। এখন ধান বাঁচানোর জন্য বিচালী রেখেই ধান তুলতে হচ্ছে। বিচালীর বাবদ বিঘাপ্রতি ৩/৪ হাজার টাকা লোকসান হবে বলে তিনি জানান।

কথা হয় একই গ্রামের সাদেক আলী, জাহাঙ্গীর আলম, মতিয়ার রহমান, আব্দুল মোমিন, মাস্টার মনিরুজ্জামান মিন্টু, মাস্টার হাসানুর রহমান, আনিছুর রহমান ছমির, রেজাউল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, অহেদ আলী, আহম্মদ আলী, ফজর আলী নামের কৃষকদের সাথে। তাদের সবারই মাঠে ধান কাটা আছে এবং সেগুলো পানির নিচে তলিয়ে আছে। উপজেলার সবচেয়ে বড় মাঠ বাঁকড়া বিল কচুয়ার দৃশ্য অনেক বেশী ভয়াবহ। সেখানে হাজার হাজার হেক্টর জমির কাটা ধান পানির নিচে রয়েছে। বিল কচুয়ার পানি নিষ্কাশনের সংযোগ খাল দিয়ে ঠিকভাবে পানি বের হচ্ছে না। সরকার পানি নিষ্কাশনের জন্য খালটি গত বছর কাটিয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার কাজের ফাঁকি দিয়ে খালের গভীরতা কম করেছে। ফলে খালের বুক বিলের জমির থেকে উচু হয়ে আছে। এতে করে বিলের জমি বা ধান ক্ষেত থেকে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। ফলে এ সমস্ত জমির ধান বাড়ি যাবে কিনা তা নিয়ে মহাদুঃচিন্তায় আছে কৃষক।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রায়পটন গ্রামের আবু রায়হানের ১২ বিঘা, আবু তালেবের ৯ বিঘা, বিষ্ণুপুর গ্রামের লুৎফর রহমানের ৪ বিঘা, আলীপুর গ্রামের হাশেম আলীর ৫ বিঘা, বাঁকড়া গ্রামের ইজ্জেত আলীর ৭ বিঘা, উজ্জ্বলপুর গ্রামের মশিয়ার রহমানের ৯ বিঘা, মহেশপাড়ার আরশাদ আলীর ৮ বিঘা , জুম্মাম আলীর ৫ বিঘা এবং শিমুলিয়া গ্রামের রবিউল ইসলামের ১০ বিঘা কাটা ধান পানির নিচে তলিয়ে আছে।

এ ব্যাপারে শিমুলিয়া গ্রামের রবিউল ইসলাম এ প্রতিনিধিকে জানান, এ বৃষ্টির ফলে প্রতিটি কৃষকের কষ্ট এবং খরচ  দিগুন বেড়ে গেল। ধান বাড়ি আনার জন্য কৃষককে যথেষ্ট মাশুল দেয়া লাগবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন, গত এক যুগের মধ্যে এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছিল। কৃষক লাভের স্বপ্ন দেখছিল। এ বৃষ্টিতে ধানের তেমন কোন ক্ষতি হবে না। যদি রোদ হয় তাহলে কোন সমস্যাই নেই। কিন্তু আবহাওয়া অফিস বলছে আরো বুষ্টি হতে পারে। তবে ৭ থেকে ১০ দিন ধান পানির নিচে থাকলে তেমন কোন ক্ষতি হয় না। তবে বিচালী সংগ্রহ করতে পারবে না। এতে করে গরুর খাদ্যের সংকট পড়তে পারে।

তিনি আরো জানান, আমরা কয়েক জায়গায় কুষকদের পরামর্শ দিয়েছি স্যালোমেশিন দিয়ে পানি বের করে দিতে এবং বিচালী বাদ রেখে ধান তুলে নিতে। অনেক কৃষক সেগুলোই করছে।