ঢাকা, সোমবার, ০১ জুন ২০২০ | ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

চৌগাছার বড়বাড়ি রাজাপুর মাদকের রমরমা হাট!


যশোর অফিস

প্রকাশিত: ০২:৪২ পিএম, ২৯ এপ্রিল ২০২০, বুধবার
চৌগাছার বড়বাড়ি রাজাপুর মাদকের রমরমা হাট! সিন্ডিকেট প্রধান জাফরিন পাশা

যশোরের চৌগাছার দুইটি গ্রাম এখন মাদকের হাট বলে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। দিন রাত সারাক্ষণই এখানে মাদকের রমরমা ব্যবসা হচ্ছে। বর্তমানে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে করে এই গ্রাম দুটিতে সদ্য ভুমিষ্ঠ শিশু মাদকের ঘ্রাহন নিয়ে পৃথিবীর আলো দেখছেন।

যশোর শহরসহ বিভিন্ন এলাকা এবং ঝিনাইদহ জেলার বেশ কিছু অঞ্চলের শ শ মাদসেবীরা নিয়মিত গ্রামে আসছে এবং সেবন করে নিরাপদে চলে যাচ্ছে। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে ওই গ্রামের অধিকাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানদের দিয়ে মরণনেশা মাদকের ব্যবসা করাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে থানা পুলিশ টহল দিলেও থেকে নেই ব্যবসা।

এলাকাবাসী মাদকের নীল ছোবল থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন সুখপুকুরিয়া। ভারতের চব্বিশ পরগনা জেলার বাগদা বাজারের পাশ দিয়ে এই ইউনিয়নের অবস্থান। সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের দুইটি গ্রাম বড়বাড়ি রাজাপুর। অত্যান্ত শান্ত প্রকৃতির গ্রাম বলে অতীতে এর সুনাম চারিদিকে রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই শান্ত প্রকৃতির গ্রাম যেন অশান্ত হয়ে উঠেছে। গ্রামের এক শ্রেনীর অর্থলোভী মানুষ অন্য পেশা বাদ দিয়ে এখন মরণনেশা মাদক ব্যবসার পেশা বেছে নিয়েছে। শুধু তাই না ওই ব্যক্তিরা তাদের ছোট ছোট কিংবা শিক্ষিত ছেলেদেরকে দিয়ে এই ব্যবসা করাচ্ছেন। বাজার করা ব্যাগের ভিতরে করে মাদক নিয়ে তারা কখনও বাইসাইকেলে আবার কখনও পায়ে হেটে বলাচলে ফেরি করে বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন। মাদক বিক্রি চক্রের বড় একটি সিন্টিকেট বেশ আগেই তৈরী হয়েছে। এই সিন্টিকেটের কাছে গ্রামের সাধারণ নিরীহ প্রকৃতির মানুষ আজ বলাচলে এক প্রকার জিম্মি। এই অবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে ভবিষ্যত প্রজন্মকে চরম মূল্য দিতে হবে বলে মনে করছেন এলাকার সচেতন মহল।

সরেজমিন বড়বাড়ি ও রাজাপুর এলাকা ঘুরে মাদক বিকিকিনির ভয়াবহ সেই চিত্র সম্পর্কে জানা যায়। বড়বাড়ি ও রাজাপুর গ্রাম হচ্ছে দুটি। এই গ্রাম দুটির অবস্থান আবার দুই উপজেলা চৌগাছা ও ঝিনাইদাহের মহেশপুর উপজেলার মধ্যে। এখানে গেলে বুঝে উঠার উপায় নেই কারা কোন উপজেলার বাসিন্দা। রাজাপুর গ্রামে একটি বাজার আছে। বাজার থেকে পশ্চিম দিকে একটি সড়ক গেছে মহেশপুরের যাদবপুর বাজারে। দক্ষিনে একটি সড়ক গেছে চৌগাছার কুলিয়া গ্রামের দিকে, আর উত্তর পাশের সড়কটি চৌগাছা উপজেলা সদরে ও পুড়োপাড়া হয়ে মিশেছে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলাতে।

মূলত এই সড়ক গুলো দিয়ে মাদকসেবিরা নিয়মিত গ্রাম দুটিতে যাচ্ছে এবং নিরাপদে সেবন এমনকি ক্রয় করে সেই মাদক সাথে নিয়ে চলে আসছে।

বড়বাড়ি রাজাপুর গ্রামের একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা হলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশ স্বাধীনের পর মাদকের এমন রমরমা ব্যবসা এই এলাকার মানুষ কখনও দেখেনি। বর্তমানে গ্রাম দুটির হাতে গোনা ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষিক যুবক ভাল আছে, বাকি সকলেই মাদক ব্যবসার সাথে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত।

তারা বলেন, এর জন্য যুবকরা দায়ি না, দায়ি তাদের অভিভাবকরা। অভিভাবকরা মাদক বাজার কারার প্যাকেটে ঢুকিয়ে তা ফেরি করে বিক্রির জন্য সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছে। রাজাপুর গ্রামের আমজাদ হোসেনের ছেলে জাফরিন পাশা সেরা মাদক বিক্রেতাদের অন্যতম একজন। অনেকে এই পাশাকে মাদক বিক্রির মূল নায়ক বলে অভিহীত করেন। এছাড়া আইজেল মন্ডলের ছেলে আব্দুস সালাম। তিনি পেশায় একজন পোল্ট্রি ব্যবসায়ী। পোল্ট্রি ব্যবসা তার লোক দেখানো মাত্র। এর আড়ালে রমরমা মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামটির মজনু মিয়ার ছেলে মুকুল মিয়াও অন্যতম হোতা বলে অনেকে জানান। এরা সকলেই স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের অর্থের লোভ দেখিয়ে এই পেশায় নিযুক্ত করেছেন বলে অনেকে জানান।

অনুরুপ ভাবে বড়বাড়ি গ্রামের দুখে মিয়ার ছেলে শুকুর আলী একজন চিহিৃত মাদক ব্যবসায়ী অনেকে তাকে মাদকের ক্যাডর বলে অভিহীত করেছেন। এ ছাড়া গ্রামটির তক্কেল মন্ডলের ছেলে আতিয়ার রহমান, আনোয়ার হোসেনের ছেলে আসকুল মিয়া, আইনাল মিয়ার ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী তোতা মিয়া, জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়ার ছেলে ইউছুপ আলী ওরফে ইসোপসহ বড় একটি চক্র রমরমা মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। দুই গ্রামের মাদক চক্রের মধ্যে সম্পর্ক বেশ ভাল। কোন দুঃসংবাদ একজন পেলে দ্রুত তা সকলের মাঝে পৌছে দেয়। এই চক্রটি প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার উপরে মাদক বেচাকেনা করেন বলে জানান স্থানীয়রা। এলাকাবাসি ভয়াবহ এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চৌগাছা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রিফাত খান রাজীব বলেন, এ ধরনের একটি খবর আমিও শুনেছি। সেখানে প্রতিনিয়ত অফিসারসহ পুলিশ সদস্যদের পাঠানো হচ্ছে কিন্তু মাদক বিক্রেতা বা সেবনকারীদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি কেটে গেলে সেখানে চিরুনী অভিযান চালানো হবে এবং কাউকে ক্ষমা করা হবে না বলে তিনি হুশিয়ারী দেন। মাদকের ব্যাপারে চৌগাছা থানা পুলিশ জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন বলে তিনি জানান।