ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

থানার সামনেই গায়ে আগুন কলেজছাত্রীর


অমৃতবাজার রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১২:৪২ পিএম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রোববার | আপডেট: ১২:৪৯ পিএম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রোববার
থানার সামনেই গায়ে আগুন কলেজছাত্রীর

রাজশাহী নগরীর শাহমখদুম থানার সামনে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন এক কলেজছাত্রী। স্বামীর নির্যাতনের বিষয়ে কয়েকদিন ধরে অভিযোগ করে এলেও পুলিশ তা গ্রহণ না করায় শনিবার দুপুরে ওই ছাত্রী গায়ে আগুন দেন। তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তবে অবস্থার অবনতি হলে বিকালে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

ওই ছাত্রীর নাম লিজা (১৯)। তিনি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার প্রধানপাড়া এলাকার আবদুল লতিফ বিশ্বাসের পালিত মেয়ে। লিজা রাজশাহী মহিলা কলেজের বাণিজ্য দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। নগরীর পবাপাড়া এলাকার একটি মেসে থাকতেন তিনি।

লিজার সহপাঠী ও বান্ধবীরা জানান, ২০ জানুয়ারি লিজার সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার খানদুরা গ্রামের খোকন আলীর ছেলে ও রাজশাহী সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র সাখাওয়াৎ হোসেনের (২০) বিয়ে হয়। পরিবারকে না জানিয়েই সাখাওয়াৎ লিজার গোবিন্দগঞ্জের বাড়িতে গিয়ে বিয়ে করেন। সাখাওয়াতও রাজশাহীতে একটি ছাত্রাবাসে থাকেন। বিয়ের কিছুদিন পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ শুরু হয়। পরিবারের সম্মতি না পাওয়ায় সাখাওয়াৎ লিজাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেননি।

একপর্যায়ে সাখাওয়াৎ স্ত্রী লিজার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে গ্রামের বাড়ি গিয়ে থাকতে শুরু করেন। জুলাইয়ে লিজা সাখাওয়াতের খোঁজে ছুটে যান নাচোলে। স্বামীর বাড়ি খুঁজে বের করেন। লিজাকে দেখে সাখাওয়াৎ বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এ নিয়ে লিজা নাচোল থানা পুলিশে অভিযোগ করেন। পুলিশ সাখাওয়াৎ ও তার বাবাকে থানায় ডেকে এনে তাদের সঙ্গে লিজাকে পাঠিয়ে দেন। এরপর কয়েকদিন একসঙ্গে থাকলেও রাজশাহীতে ফিরে আবারও সাখাওয়াৎ স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

বান্ধবীরা জানান, কয়েকদিন আগে লিজার সঙ্গে দেখা করেন সাখাওয়াতের এক ভগ্নিপতি। ওই সময় সাখাওয়াৎও সঙ্গে ছিলেন। তারা লিজাকে মারধর করেন, আবারও পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন। সেই থেকে লিজা অভিযোগ দেয়ার জন্য নগরীর শাহমখদুম থানায় ঘুরছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার দুপুরে আবারও শাহমখদুম থানায় যান লিজা। সেখানে ডিউটি অফিসারকে তার অভিযোগ রেকর্ড করার জন্য অনেকবার অনুরোধ করেন। না করায় ওসির সঙ্গেও দেখা করেন তিনি। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে পাগল বলে পাত্তা না দিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন।

থানা থেকে বের হয়েই কাছের একটি দোকান থেকে কেরোসিন কিনে আবার থানার সামনে আসেন লিজা। গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। মুহূর্তেই লিজার শরীরের বেশির ভাগ স্থান পুড়ে যায়। আশপাশের লোকরা ছুটে এসে পানি ঢেলে আগুন নেভায়। প্রায় অচেতন অবস্থায় লিজাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে লিজাকে পুলিশ পাহারায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান ডা. অসীম কুমার জানান, লিজার শরীরের বেশির ভাগই পুড়ে গেছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ কারণে তাকে ঢাকায় বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। তার শ্বাসনালি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর চিকিৎসা রাজশাহীতে সম্ভব নয়।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহমখদুম থানার ওসি মাসুদ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, লিজার অভিযোগ শোনা হয়েছিল। তার অভিযোগ মামলা আকারে রেকর্ডের নির্দেশও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে হঠাৎ করেই থানা থেকে বের হয়ে গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। কি কারণে লিজা এতটা মানসিক যন্ত্রণায় ছিল তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তার স্বামী সাখাওয়াৎকে পুলিশ খুঁজছে। লিজার সহপাঠীরা আরও জানান, লিজার বাবা মারা যান ছোটবেলায়। মা অন্যত্র বিয়ে করায় তাকে এক ব্যক্তি দত্তক নেন। সেই পরিবারেই লিজা বড় হয়েছে।

তার পালিত বাবা রাজনৈতিক কারণে কারাগারে আছেন। এ অবস্থায় তার টাকা-পয়সার সংকটও চলছিল অনেকদিন ধরে। লেখাপড়া বন্ধের উপক্রম হয়েছিল। অন্যদিকে স্বামীও তার দায়িত্ব নিতে চাইছিল না। ফলে দু’জনের দেখা হলেই ঝগড়া হতো। সম্প্রতি স্বামী তাকে নির্যাতন করেন। এসব কারণে মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। পুলিশের কাছে অভিযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েই সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।

 অমৃতবাজার/ কেএসএস