ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৫ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আজ লক্ষ্মীপুর গণহত্যা দিবস


শাহাদত হোসেন কাবিল

প্রকাশিত: ১০:৩৮ এএম, ১৮ এপ্রিল ২০১৯, বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০১:৪৮ পিএম, ১৮ এপ্রিল ২০১৯, বৃহস্পতিবার
আজ লক্ষ্মীপুর গণহত্যা দিবস

আজ ৫ বৈশাখ, লক্ষ্মীপুর গণহত্যা দিবস। ১৩৭৮ সালের (১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল) আজকের দিনে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিশ্বাসঘাতকতার এক ঘৃণ্যতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এ দিন গ্রামের বিলাত আলী, গোলাম দফাদার, নাসির উদ্দিন নাটো, তাজুল ইসলাম, ওলিয়ার রহমান, আফসার আলী, সৈয়দ আলী ছৈয়ে, যশোর আলী ও খোরশেদ আলী সামরিক জান্তার বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন। তাদের মধ্যে যশোর আলী আজো জীবন্ত ইতিহাস হয়ে বেঁচে আছেন।

মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের বিচ্ছিন্নতাকামী, দেশদ্রোহী এবং দৃষ্কৃতকারী আখ্যা দিয়ে ঝিকরগাছা থানা শান্তি কমিটির উদ্যোগে প্রায়শ মাইকিং করা হতো। বলা হতো ওদেরকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করুন। সবাই বাড়ি-ঘরে ফিরে আসুন। স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন। শান্তিপ্রিয় জনসাধারণের নিরাপত্তা দেয়া হবে। এই সাথে ৪ বৈশাখ সন্ধ্যায় সামরিক জান্তা টিক্কা খান বেতারভাষণ দেয়। তার ভাষণেও একই কথা উচ্চারিত হয়। বলা হয়, দুষ্কৃতকারী ও বেআইনী অস্ত্র খুঁজে বের করতে ঘর তল্লাশি হবে। কেউ যেন বাড়ি না ছাড়ে।

সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় শান্তি কমিটির নেতাদের উপস্থিতিতে তল্লাশি হবে। কাউকে কিছু বলা হবে না। দেশবাসীর নিরাপত্তা বিধান করা পাকিস্তান রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জনসাধারণের ওপর যদি কেউ অত্যাচার নির্যাতন করে তাহলে উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে তার যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

ধূর্ত টিক্কা খানের নরহত্যার নেশার কৌশল অনেকেই বুঝতে পারলো না। বুঝতে পালো না ঝিকরগাছা থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামের অনেকেই। তারা বাড়িতেই থাকলো। খলের কথায় বিশ্বাস করে রাত না পোহাতেই তাদের জীবন তুলে দিতে হলো টিক্কা খানের পোষা হায়েনার হাতে।

৫ বৈশাখ সকালে প্রবল বৃষ্টি হয়েছিল। আগের দিন সন্ধ্যায় টিক্কা খানের ভাষণ এবং সকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টি এ দু’য়ে সকলেই ধারণা করেছিল গ্রামটি আজ নিরুপদ্রুব যাবে। কিন্তু না। তাদের ধারণা ভুল হলো।

সকাল ১০ টা না বাজতেই যশোর সেনানিবাস থেকে একদল পাকিস্তানি সেনা সন্তর্পণে এসে গ্রামটি ঘিরে ফেলে। খবর পেয়ে যে যেমনি পরলো পালালো। যারা টিক্কার ভাষণে বিশ্বাসী হয়ে বাড়িতে ছিল তারা শিকার হলো হায়েনাদের। রক্তের নেশা মেটালো পাকিস্তানি নরঘাতকরা তাদের ধরে নিয়ে। ভাগ্যাহত যুবক বিলাত আলী ছিলেন বাড়িতেই। ঝিকরগাছা বাজার থেকে শুনে এসেছিলেন বাড়িতে থাকলে খান সেনারা কাউকে কিছু বলবে না। বেতার ভাষণেও এ কথা বলা হয়। লোভাতুর দাতালের মতো ক’জন খান সেনা বাড়িতে ঢুকলো।

বিলাত আলী সামনে এসে দাঁড়ালেন। সালাম জানাতেই একজন রাইফেল তাক করলো তার দিকে। অপরজন এক থাবায় বিলাত আলীর চুল ধরে পিঠে রাইফেলের আঘাত বসিয়ে দিয়ে বললো, -শালা শুয়ারকা বাচ্চা। বাঙালি যুবক সালামের জবাব পেলেন। একে একে বুটের লাথি, বেয়নেটের আঘাতে তিনি বিশ্বাসের মূল্য উপলব্ধি করতে শুরু করলেন।

বিলাত আলীর ষাটোর্দ্ধ মা ছেলের দৃশ্য দেখে ছুটে গেলেন। হাউ-মাউ করে এক সেনার পায়ে পড়ে ছেলের প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন। বললেন, আমার একমাত্র বেটা-ছেলে। আমাকে মেরে, বাবারা তোমরা ওকে ছেড়ে দাও। ঝটকা লাথিতে বৃদ্ধাকে ছুড়ে দিল পাষান্ড সৈনিক। ককিয়ে উঠলেন হাত বিশেক দূরে পড়ে। উঠে আসতে পারলেন না আর। এবার এগিয়ে গেলেন তার নিকট আত্মীয় গোলাম দফাদার। তার ভাগ্যেও নামে বিলাত অবস্থা।

সেই নির্মমতার জীবন্ত ইতিহাস যশোর আলী জানান, তিনি ক্ষেতের কাজে মাঠে যাচ্ছিলেন। তখন তার বয়স বছর ত্রিশেক হবে। তাকেও ধরে হায়েনারা। শুরু করে নির্মম অত্যাচার। এক হিংস্র জানোয়ারের চপেটাঘাতে যশোর আলীর কান ফেটে দরদরিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। তিনি প্রায় সংঙ্গাহীন হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তাদেরকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যায় গ্রামের চারাতলা বধ্যভূমিতে। সেখানে ছিলেন আরো কয়েকজন। সকলেই সামরিক জান্তার বিশ্বাসঘাতকতার শিকার।

গ্রাম থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে চারাতলা বধ্যভূমিতে লাইন করে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো গ্রামের খেটে খাওয়া সরলপ্রাণ নয় আদম সন্তানকে। বক্ষস্থল লক্ষ্য করে পাতানো মেশিনগান গর্জে উঠলো ঠাঁ ঠাঁ করে। বিপক্ষে সমস্বরে উচ্চারিত হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’ ঢলে পড়লেন সবাই মাতৃভূমি মা-মাটির কোলে। এর মধ্যে বুলেটে ঝাঁজরা হয়েও বেঁচে যান যশোর আলী ও খোরশেদ আলী। অন্য সাত জন শহীদ হন। মুসলমান হয়েও ‘ইসলামের রক্ষকদের’ হাত থেকে ওরা রক্ষা পেলেন না-একমাত্র বাঙালি হওয়ার অপরাধে।

যশোর আলী আলী জানান, তিনি শুধু গুলির শব্দ শুনেছিলেন। এরপর আর কিছু বুঝতে পারেননি। পরে চিকিৎসায় সুস্থ হলে জানতে পারেন গুলি লেগে তার পেটের নাড়ি-ভুড়ি বের হয়ে গিয়েছিল। এমনিভাবে কারো মাথা গুড়িয়ে গিয়েছিল, কারো বুক বিদীর্ণ হয়েছিল, কারোবা হাত উড়ে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, সেদিনকার সেই নির্মমতার স্মৃতি আজো মনে পড়লে শিউরে উঠি। মৃত্যুকে প্রত্যক্ষভাবে দেখার এমন নির্মম মুহূর্ত যেন কারো ভাগ্যে না আসে।

বেদনাবহ দিনটি স্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে বসেছে। যার ফলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মহান স্বাধীনতার জন্য গ্রামবাসীর ত্যাগ ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বতার কাহিনী অজানা থেকে যাচ্ছে। গ্রামটির গণহত্যা ও বাংলাদেশে হানাদার বাহিনীর নির্মমতা একই সূত্রে গাথা। ইতিহাস না জানলে দেশপ্রেম শানিত হয় না।

এজন্য গ্রামটিতে পাকিস্তানি বাহিনী যে পৈশাচিকতা চালিয়েছিল তা গ্রামবাসীর কাছে চির জাগরুক রাখার জন্য সেই গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে দেশের জন্য জীবনদানকারী এই শহীদদের স্মরণে চারাতলা বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতি স্তম্ভ মির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে।

অমৃতবাজার/পিকে