ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সোনারগাঁয়ে পাঁচশত বছরের ঐতিহ্যের ‘বউমেলা’


সোনারগাঁ সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১০:৩৩ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০১৯, সোমবার
সোনারগাঁয়ে পাঁচশত বছরের ঐতিহ্যের ‘বউমেলা’

পহেলা বৈশাখের পরদিন সোমবার পূজার আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে শুরু হয় ৩ দিনব্যাপী বউমেলা। পাঁচশত বছরের ঐতিহ্যের বউমেলা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জয়রামপুরে বটতলে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

সোমবার দুপুরে সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জয়রামপুর এলাকায় ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠের বটতলায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, আদি বটবৃক্ষের নিচে সারিবদ্ধভাবে বিভিন্ন ফল-ফলাদির ঝুড়ি নিয়ে পূজা অর্চনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন নববধূ থেকে শুরু করে সনাতন ধর্মালম্বী জননীরা। তাদের সঙ্গে টুকটুকে রঙিন ফুলেল সাজে দাঁড়িয়ে সনাতনী কুমারী মেয়েরা। সবার দৃষ্টি বটবৃক্ষের দিকে। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুপুর হওয়ার আগেই চারদিকে বাড়ে সনাতন ধর্মালম্বীর অনুসারী আবাল, বৃদ্ধ, বনিতাদের কোলাহল।

এ মেলাকে সনাতন ধর্মালম্বীর অনেকে সিদ্ধেশ্বরী দেবীর মেলা ও বটবৃক্ষকে সিদ্ধেশরী দেবী বলে আখ্যায়িত করেন। প্রায় পাঁচ‘শ` বছরের পুরানো একটি বটবৃক্ষকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে পালিত হচ্ছে এ বউ মেলা। বৈশাখের ২য় দিন থেকে এ ‘বউমেলা’ শুরু হয়।

স্থানীয় হিন্দু ধর্মালম্বীরা জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এ বটবৃক্ষটি হয়ে উঠেছে পূণ্যের দেবতা। তাই হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে বটবৃক্ষটি সিদ্ধেশ্বরী দেবতা নামে সুপরিচিত। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকে সিদ্ধেশ্বরী কালী তলার এ বউ মেলার জন্য।

এ বিশ্বাসেই এখানে বউ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। রেকাবি ভরা বৈশাখী ফলের ভোগ নিয়ে দলে দলে হিন্দু নারীরা হাজির হয় বউ মেলায়। পাশাপাশি দেবতার সন্তুষ্টির জন্য কবুতর উড়ানো ও পাঁঠা বলি দেওয়া হয় বৃক্ষ দেবতার পদতলে। স্বামী সংসারের বাঁধন যেন অটুট থাকে সারা বছর সুখ শান্তিতে যেন কাটে দাম্পত্য জীবন এই কামনাতেই পূজার আয়োজন করে হিন্দু নারীরা।

অগণিত রমণীর কলহাস্য ও পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে বটতলার বউমেলা। বউমেলায় অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশ নারী হলেও পুরুষরাও এ মেলায় অংশগ্রহণ করে তবে সংখ্যায় কম। পূজা অর্চনা ছাড়াও বউ মেলায় বাঙালি সংস্কৃতির প্রাচীন ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এ বউ মেলায় দারু ও মৃৎ শিল্পীদের তৈরি নানা রংঙের নানা বর্ণের টেপা পুতুল, হাতি, ঘোড়া, ময়না, টিয়া, বাঘ-ভাল্লুক, হাঁড়ি পাতিল থেকে শুরু করে মন্ডা-মিঠাইয়ের দোকান বসে। বিভিন্ন মনোহারি জিনিস পত্রের পসরা নিয়ে বসে মেলায়। মৃৎশিল্প, লৌহশিল্প, কাঠ ও বাঁশের তৈরি লোক পণ্য ছাড়াও মেলায় পাওয়া যায় বাহারী মিষ্টান্ন সামগ্রী। সোনারগাঁওয়ের বউমেলা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর মধ্যে একটি।

সনাতন ধর্মালম্বীর অনেকের মতে বউ মেলায় পূজাঁ অর্চনা করলে পুরনো বছরের স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া বিবাদকে দূরে ঠেলে দিয়ে একজন বধূ যেন স্বামী সোহাগিনী হয়ে ওঠে এবং নতুন বছরে স্বামীর সংসারকে ধনধান্যে ভরে তুলতে পারে। অনেকের বিশ্বাস বটমূলের মাটি শরীরের মাখলে রোগবালাই থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। প্রেমে সফল ও দ্রুত বিয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার জন্য এ স্থানের মাটি খুবই উপকারী মনে করে এই দিনটিতে সনাতন ধর্মালম্বীর লোকেরা মাটি সংগ্রহ করে থাকে। বউমেলাকে কেন্দ্র উপজেলার জয়রামপুর, ভট্টপুর, ষোলপাড়া, পানামসহ আশে পাশের সনাতন ধর্মালম্বীর লোকজনদের মধ্যে উৎসবের আমেজে মুখরিত হয়ে উঠে।

মেলায় আগত সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা জানান, সংসারের সুখ শান্তি ও স্বামী সন্তানের মঙ্গল কামনায় আমরা এ মেলায় পূজা করতে এসেছি। বড়দের কাছ থেকে শুনেছি এ মেলায় এসে পূজা আর্চনায় স্বামী সন্তান ও সংসারের কল্যাণ কামনায় সফল হয়।

পুরোহীত চন্দন ভট্টাচার্য জানান, সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে নারীরা ভিড় করে সিদ্ধেশ্বরী বটতলার বউমেলায়। দুপুরে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পূজা আর্চনা হয়ে মেলা শুরু হয়। এ মেলা পূজা আর্চনা মূলত একদিনের। কিন্তু মেলা জমে ৩ দিন। এ মেলাটি নারীকেন্দ্রীক হলেও এখানে আসেন সকল ধর্মালম্বীর মানুষ ও বিদেশি পর্যটক।

বউমেলা আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা নিলোৎপল রায় জানান, নতুন বছর সবার জীবনে মঙ্গল বয়ে আনবে এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর বর্ষবরণ উৎসবে সিদ্ধেশ্বরী কলীপূজার আয়োজন করা হয়। গত বছরের তুলনায় এ বছর ভক্তদের উপস্থিতি একটু বেশি। স্থানীয়দের সহায়তায় এ বছর কালী মায়ের পূজার স্থানটি টাইলস বসিয়ে পাকা করা হয়েছে।

সিদ্ধেশ্বরী বটতলার পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি মানিক ঘোষ জানান, মেলার জন্য পর্যাপ্ত স্থান না থাকার কারণে মেলায় আগত দর্শনার্থীদেরকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তবু মানব কল্যাণে জগতের সকল পঙ্কিলতাকে দূর করতে দেবতার আর্শিবাদ নিয়ে আসবে এই মঙ্গল কামনায় ঐতিহ্যবাহী বউমেলা আমাদেরকে নিয়ে যায় শেকড়ের গভীরে।
মন্তব্য

অমৃতবাজার/আরএইচ