ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

খেলার মাঠে অস্থায়ী শেডে ক্লাস, মেঘে হলেই স্কুল ছুটি


চৌগাছা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭:৪২ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০১৮, রোববার
খেলার মাঠে অস্থায়ী শেডে ক্লাস, মেঘে হলেই স্কুল ছুটি

টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পর ঠিকাচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণের জায়গার জন্য পুরাতন ভবন অপসারণও করা হয়েছে। চুক্তি মোতাবেক ভবন নির্মাণের মেয়াদ জুন মাসে শেষ হয়েছে। ঠিকাচুক্তির মেয়াদ শেষে দ্রব্যমূল্য বেশির অযুহাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোন কাজ না শুরু করেই ছেড়ে দেয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

পুরাতন জরাজীর্ণ স্কুল ভবন ভেঙে বিক্রি করার পর এখন খোলা আকাশের নিচে ক্লাশ করতে বাধ্য হচ্ছে যশোরের চৌগাছার পাঁচনমনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তাহেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ফলে সামান্য বৃষ্টি বা অতিরিক্ত রোদ পড়লেই শিক্ষার্থীদের ছুটি দিতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকরা। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলছেন উপজেলা প্রকৌশল অফিসের অবহেলার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে উপজেলা প্রকৌশল অফিস বলছে ঠিকাদার কাজ করতে না চাওয়ায় ঠিকাচুক্তি অনুযায়ি তাদের জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তের সুপারিশ করা হয়েছে। এমন অবস্থায় স্কুল দুটির ভবন নির্মান কবে শুরু হবে অথবা আদৌ ভবন নির্মান হবে কিনা সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দু’অফিসের কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তিই এ বিষয়ে নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে এবিষয়ে তথ্যের জন্য উপজেলা প্রকৌশলী তারিকুল হাসানের সাথে কয়েকবার যোগাযোগ করলেও তিনি কোন প্রকার সহযোগিতা করেন নিউপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, প্রকৌশল অফিস ও সংশ্লিষ্ট স্কুল দু’টির শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা যায় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের (পিইডিপি-৩) অধীনে স্কুল দুটি’র নতুন ভবন নির্মণের জন্য গত জানুয়ারী মাসে দরপত্র আহবান করা হয়। স্কুল প্রতি বরাদ্দ ছিল ৭৬ লক্ষ টাকা। সেখানে বেশ কয়েকজন ঠিকাদার অংশগ্রহণ করেন। সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঝিনাইদহের মহেশপুরের চৌধুরী কনস্ট্রাকশন বিদ্যালয় দুটির নতুন ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পায়। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ঠিকাচুক্তিও সম্পন্ন করে। ঠিকাচুক্তি অনুযায়ী চার মাসের মধ্যে বিদ্যালয় দু’টির নতুন ভবন নির্মাণ কাজ সমাপ্তের কথা ছিল। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কোন কাজ না করে সম্প্রতি ভবন নির্মাণ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় এবং জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তের আবেদন করে। সে প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রকৌশলী তাদের জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তের সুপারিশ করে এলজিইডি প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন।

এদিকে স্কুল দুটির নতুন ভবন নির্মাণের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যেখানে স্কুলের পুরাতন ভবন ছিল। সে সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস দরপত্র আহবানের মাধ্যমে পুরাতন ভবন দু’টি বিক্রি করে দেয়। পুরাতন ভবন ক্রয়কারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গত মার্চ মাসেই বিদ্যালয় দুটির পুরাতন ভবন ভেঙে নিয়েছে। ফলে স্কুলের খেলার মাঠে অস্থায়ীভাবে বাশের উপর টিনদিয়ে সেখানে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়া হচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টি হলেই শিক্ষার্থীরা ভিজে যাওয়ার ভয়ে স্কুল ছুটি দিয়ে দিতে হচ্ছে। আবার একটু বেশি রোদ-পড়লেই টিনের এই অস্থায়ী শেডে অতিরিক্ত গরমে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ায় ছুটি দিতে হচ্ছে। ফলে পুরো শিক্ষা-বছর জুড়েই ঠিকমত শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা নেয়া যাচ্ছেনা। অভিভাবকদের দাবি এতে তাদের সন্তানরা শিক্ষায় অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ এই দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের সন্তানদের সরিয়ে অন্য স্কুলেও নিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে তাহেরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মৃধা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে এসেছিলেন খোঁজ নিতে। তিনি এ প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেনের কাছে তার স্কুলের দুর্দশার কথা বললে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাকে উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরে খোঁজ নিতে পরামর্শ দেন। শাহা আলম মৃধা তখন বলেন স্যার উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের লোকজন আমাদের সাথে ভাল করে কথাই বলেন না। মূল্যই দেন না। খোঁজ নেব কি করে? তার নিকট প্রশ্ন করা হয় আপনাকে ভবন নির্মাণের জন্য ড্রইং-ডিজাইন কিছু দেয়া হয়নি? তিনি বলেন আমাদের কিছুই জানানো হয়না। এখন লোকমুখে শুনছি ঠিকাদার কাজ করবেন না। তখন শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন উপজেলা প্রকৌশলীর অবহেলাতেই ভবন দু’টি নির্মাণ হলোনা। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন বিষয়টি নিয়ে যেন পত্রিকায় লেখা হয়।

পাঁচনমনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার বলেন আমার স্কুলে ১১৯ জন শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের ভবন ভেঙ্গে ফেলায় পরিত্যাক্ত টিন ও বাঁশ দিয়ে গোজামিল দিয়ে একটি অস্থায়ী অফিস কক্ষ, ৩টি ক্লাস রুম তৈরি করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই ক্লাস রুমে পানি ঢোকে এবং জরাজীর্ণ টিনের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। ফলে বৃষ্টি হলেই বা বেশি গরম পড়লেই স্কুল ছুটি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন এসকল কারণে বর্তমানে দিন দিন স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমতে শুরু করেছে।

তবে উপজেলা প্রকৌশলী তারিকুল হাসানের দপ্তরে একাধিকবার ধর্ণা দিলেও তিনি সাইডে আছেন বলা হয়। পরে গত ৯ আগস্ট তাকে নিজের দপ্তরে তাকে পাওয়া যায়। সে সময় তিনি বলেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কাজটি না করে জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তের আবেদন করেছেন। সে প্রেক্ষিতে তাদের জামানত বাজেয়াপ্তের সুপারিশ করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে বিষয়টি আমাকে ফাইল দেখে বলতে হবে। বলেই তিনি বলেন আমাকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডেকেছেন, সেখানে যাচ্ছি। আপনি পরে আমাকে ফোন করলে ফাইল দেখে সঠিক তথ্য দিতে পারব। প্রায় দেড় সপ্তাহ যাবৎ এবিষয়ে তার সেল ফোনে কল করে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবারই তিনি সংযোগ কেটে দিয়েছেন। এসময়ে কয়েকবার তার দপ্তরে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবারই তার অফিসের কর্মচারীরা বলেছেন স্যার সাইডে আছেন।

অমৃতবাজার/রেজওয়ান/শাওন