ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৭ | ২ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

স্কুলে স্কুলে বিস্কুট দেয়া বন্ধ


যশোর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৩:০২ পিএম, ১১ আগস্ট ২০১৭, শুক্রবার | আপডেট: ০৫:৪২ পিএম, ১১ আগস্ট ২০১৭, শুক্রবার
স্কুলে স্কুলে বিস্কুট দেয়া বন্ধ

প্রকল্পের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় ৩০ জুন ২০১৭ থেকে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় উচ্চ শক্তি সম্পন্ন বিস্কুট সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবার চলতি অর্থবছরে একনেকে তৃতীয়বারের মত এ প্রকল্প অনুমোদন হলেও সরবরাহ না থাকায় বিস্কুট পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। এতে স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে আশার কথা সরবরাহ প্রপ্তি সাপেক্ষে এ সপ্তাহ থেকে শিক্ষার্থীরা বিস্কুট পাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষাকে সকল স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার বুনিয়াদ হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি কর্তৃক পরিচালিত সমীক্ষা বিবেচনা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ২০১২ সালে যশোর জেলায় সদর ও চৌগাছা উপজেলায় সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং প্রকল্প শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে জুলাই থেকে ঝিকরগাছা উপজেলা যুক্ত হয়। এ তিন উপজেলায় ৫শ’ ২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ২৬ হাজার ৯শ’ ৬১ জন শিক্ষার্থী প্রতিদিন উচ্চ শক্তি সম্পন্ন বিস্কুট পায়। যা ফ্রেব্রুয়ারি ২০১২ থেকে ৩০ জুন ২০১৭ পর্যন্ত চলে।

এ সকল বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১২ সালে উপস্থিতির হার ছিল শতকরা ৮৩ ভাগ, ২০১৩-১৪ সালে ছিল শতকরা ৮৭ ভাগ, ২০১৫ সালে ৮৮ ভাগ, ২০১৬ সালে ৯০ ভাগ এবং ২০১৭ সালে শতকরা ৯২ ভাগ। যা এ প্রকল্পের সুফল বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তাপস কুমার অধিকারী জানান, সরকারের গৃহিত এ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের ফলে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার গুনগতমান বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষার্থী ভর্তি শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমেছে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয় আঙ্গিনায় সবজি বাগান সৃজন প্রক্রিয়া চলমান আছে। সদর উপজেলার ১শ’৬১টি স্কুলে সবজি বাগান করা হয়েছে। এসব কারণে আগামী তিন বছরের জন্য তৃতীয় বারের মত এ প্রকল্প একনেকে পাশ হয়েছে। নতুনভাবে অনুমোদনের পর পদ্ধতিগত কারণে একমাসের মত শিক্ষার্থীদের হাতে বিস্কুট তুলে দেয়া সম্ভব হয়নি। অচিরেই এ সমস্যা দূর করে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে একনেকে দরিদ্র পীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯শ’ ৯১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এ প্রকল্প চলবে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দেশের ১শ’ ৪টি উপজেলার প্রায় ৩২ লাখ শিক্ষার্থী এ প্রকল্পের আওতায় আসবে। এরমধ্যে যশোরের সদর উপজেলায় ২শ’ ৫৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৩০ হাজার ৯শ’ ৮৯ জন ছাত্র ও ৩১ হাজার ৬শ’ ৯৫ জন ছাত্রীসহ মোট ৬২ হাজার ৬শ’ ৮৪ জন শিক্ষার্থী, চৌগাছা উপজেলায় ১শ’ ৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৪ হাজার ৫শ’ ২৭ জন ছাত্র ও ১৪ হাজার ৩শ’ ৩৮ জন ছাত্রীসহ মোট ২৮ হাজার ৯শ’ ৫ জন শিক্ষার্থী এবং ঝিকরগাছা উপজেলায় ১শ’ ৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৭ হাজার ৮শ’ ৫৩ জন ছাত্র ও ১৭ হাজার ৫শ’ ১৯ জন ছাত্রীসহ মোট ৩৫ হাজার ৩শ’ ৭২জন শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় উচ্চ শক্তি সম্পন্ন বিস্কুট পাবে।

তিনি জানান, প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীকে দৈনিক ৭৫ গ্রাম পুষ্টিমানসমৃদ্ধ বিস্কুটের একটি প্যাকেট দেওয়া হয়। প্রতি প্যাকেটে সচরাচর ৮টি বিস্কুট থাকে । স্কুল শুরুর পর প্রথম পিরিয়ডে শ্রেণি শিক্ষক সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে বিস্কুট বিতরণ করেন। বিস্কুট গ্রহণের পূর্বে ছাত্রছাত্রীরা ভালো করে পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ধোয়। একসাথে প্যাকেটের সব বিস্কুট না খেয়ে প্রতি ক্লাশ সময়ে  ২/৩ টা করে বিস্কুট শিক্ষার্থীরা খায় ও বিশুদ্ধ পানি পান করে। সরবরাহকৃত বিস্কুট শিক্ষার্থীদের বাড়ি নিয়ে যাওয়া নিষেধ। শিক্ষার্থীরা বিস্কুট খাওয়ার পর খালি প্যাকেট নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে। প্রধান শিক্ষক  তার বিদ্যালয়ে  বিস্কুট  বিতরণ  কার্যক্রম  সার্বিকভাবে তত্ত্বাবধান করেন।

জানা গেছে, জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রস্তুত-প্রণালি অনুযায়ী বিস্কুট তৈরি করা হয়। গমের ময়দা - ৬৯%, চিনি - ১২%, উদ্ভিজ তেল - ১৩%, সয়া ময়দা- ৬%, খামির তৈরির উপকরণ (বেকিং সোডা ও অ্যামোনিয়াম বাইকার্বোনেট)- ১%, আয়োডিনযুক্ত লবণ- ০ দশমিক৫% এছাড়া প্রতিটি বিস্কুটে প্রয়োজনীয় পরিমাণ আয়োডিন, দস্তা, লোহা, ভিটামিন এ-রেটিনল, ভিটামিন বি১, ভিটামিন বি২, ভিটামিন বি৫, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২, ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই ও ফলিক এসিড থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম বিস্কুটের পুষ্টিমান খাদ্যশক্তি- ৪৫০ কিলোক্যালোরি, আমিষ ১০-১৫ গ্রাম, আর্দ্রতা ৪.৫%, চর্বি ১৫ গ্রাম, ক্যালসিয়াম  ১২৫ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ৭৫ মিলিগ্রাম। জীবাণুর আক্রমন খুব কম হয় বলে এ শুকনো খাবারের সংরক্ষণকাল সবচেয়ে দীর্ঘ। এ বিস্কুট একজন শিশু বা কিশোরের শরীরে দৈনিক ৩৩৮ কিলোক্যালোরি খাদ্যশক্তি যোগান দেয়। তৈরির তারিখ থেকে এ বিস্কুটের মেয়াদ নিশ্চিতরূপে ছয় মাস।

প্রকল্পের সমন্বয়কারী আব্দুল আজিজ জানান, রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশনের আরআরএফ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় বর্তমানে তিনটি জেলার ৬টি উপজেলায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এরমধ্যে যশোর সদর ও চৌগাছা উপজেলায় ৩শ’৯৬ টি স্কুলে, নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায় ১শ’ ৬২টি স্কুলে, বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট, শরণখোলা ও মোড়লগঞ্জের ৫শ’ ৫টি স্কুলে মোট ১ লাখ ৮২ হাজার ৭শ’ ৮ জন এি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। তিনি জানান, নতুনভাবে প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। বিস্কুট সরবরাহের প্রাথমিক কাজ শুরু সম্পন্ন হয়েছে। তবে সরবরাহ না থাকায় ছেলেমেয়েদের হাতে এখনও বিস্কুট তুলে দেয়া সম্ভব হয়নি। সরবরাহ নিশ্চিত হলেই যতদ্রুত সম্ভব ছেলেমেয়েদের হাতে বিস্কুট তুলে দেয়া হবে।

যশোর সরকারি মসজিদ মহল্লা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপংকর দাস রতন জানান, অপুষ্টি শিশুর অপার সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্থ করে। তাই শিক্ষার্থীদের মাঝে অধিক পুষ্টিমান সম্পন্ন শুকনো খাবার নিয়মিতভাবে সরবরাহ সরকারের একটা চমৎকার উদ্যোগ। এ প্রকল্প শিক্ষার্থীদের  ক্ষুধা নিবৃত্তি, পাঠে মনোযোগ বৃদ্ধি এবং অপুষ্টিজনিত রোগ নিরাময়ে কার্যকর। প্রকল্প এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে প্রতি বিদ্যালয় দিবসে পুষ্টিকর বিস্কুট প্রদান তাদের নিরাপদ জীবন গড়ে তোলার চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ৩০ জুন ২০১৭ থেকে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় উচ্চ শক্তি সম্পন্ন এ বিস্কুট সরবরাহ বন্ধ আছে। গত এক মাস ধরে তার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিস্কুট পায় না বলে তিনি জানান। এ বিদ্যালয়ে হরিজন সম্প্রদায় ও দরিদ্রতর শ্রেণির শিশুরা লেখাপড়া করে। তাই এ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমে যাওয়ারও আশঙ্কা ব্যক্ত করেন তিনি।

অমৃতবাজার/প্রণব/ইব্রাহিম

Loading...