ঢাকা, রোববার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কুবির ময়নুলের মামলার নথিতে অসংলগ্ন তথ্যের অভিযোগ


কুবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৫:০২ পিএম, ২৪ মে ২০১৯, শুক্রবার
কুবির ময়নুলের মামলার নথিতে অসংলগ্ন তথ্যের অভিযোগ

 

হিন্দুধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ময়নুল হোসেন ওরফে ময়নুল ইসলাম আবিরের বিরুদ্ধে করা মামলার এজাহার ও ডিবি কর্তৃক আসামিকে কোর্টে প্রেরণের আবেদনে ভুল তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ ওঠেছে। ‘মামলার এজাহার ও ডিবির আবেদনে উপস্থাপিত তথ্যে বেশকিছু অসংলগ্নতা রয়েছে যা থেকে বুঝা যায় অভিযুক্ত ময়নুল নির্দোষ’ এমনটাই দাবি করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁঠালতলায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ময়নুলের নিঃশর্ত মুক্তি চেয়ে মানববন্ধন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবি, ময়নুলের নামে ভুয়া আইডি খুলে একটি সাম্প্রদায়িক উস্কানিদাতা মহল তাকে ফাঁসিয়েছে। এসব বিষয় আমলে না নিয়ে পুলিশ অন্যায়ভাবে তার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দিয়েছে। তারা ময়নুল ইসলাম আবিরের মুক্তি, শ্যামল চন্দ্র দাস নামের ভুয়া আইডির পরিচয় সনাক্তকরণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখার দাবিতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানববন্ধনে উপস্থিত হোন।

শিক্ষার্থীরা জানান, সর্বপ্রথম ‘Shamol Chandra Das’ নামের যে ভুয়া ফেসবুক আইডি দিয়ে ‘Moinul Islam Abi’ নাম ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্টকারী কমেন্টটি ফেসবুকে ছড়ানো হয়েছিল সেই আইডির আসল পরিচয় উদঘাটন করা দরকার ছিলো সবার আগে। তা না করে নিজের নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করতে গেলে জিডি না নিয়ে উল্টো মামলা দিয়ে ময়নুলকে গ্রেফতার করায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

এদিকে মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, ময়নুল হোসেন গত ১৯ মে আনুমানিক রাত ১০ টা ৫২ ঘটিকায় তার আইডি ‘Moinul Islam Abir’ থেকে ‘Ashiqur Rahman Rabbani’ নামক একজনের ফেসবুক স্ট্যাটাসে ‘বাংলাদেশের মালাউনগুলোকে জুতাপেটা করে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হোক। সেখানে গিয়ে তাদের সেক্সি মা দুর্গার সাথে সেক্স না করলে এদের বুদ্ধি হবে না। বাংলাদেশের মাটিতে মালাউনদের ঠাঁই নাই’- এমন বিরূপ মন্তব্য করেন এবং সেটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়।

এই প্রেক্ষিতে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এস আই (নিঃ) খালেকুজ্জামান বাদী হয়ে ২০ মে শিক্ষার্থী ময়নুল হোসেন আবিরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ২৮ ও ৩১ নং ধারায় মামলা দায়ের করেন।

উল্লেখ্য, মামলা দায়েরের পর সেদিন রাতেই তাকে এই মামলায় আবিরকে গ্রেফতার দেখানো হয়। গ্রেফতারের পর ২২ মে তাকে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মামলার এজাহারে উল্লেখিত ‘Ashiqur Rahman Rabbani’ নামক ব্যক্তির পোস্টে নয় বরং কমেন্টটি করা হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ মুসলিম সম্প্রদায়’ নামক একটি ফেসবুক পেইজের পোস্টে। পেইজটির আইডি নং - ২০২০৩৯৩১৯৮৫১৯০। ১৭ মে (শুক্রবার) রাত ৮ টা ৫৩ মিনিটে করা পোস্টটির শিরোনাম ছিলো ‘মোদি সরকারের আমলে মুসলমানরা কেন ভবিষ্যত নিয়ে আতঙ্কিত?’। তবে স্ক্রিনশটটি ভাইরাল হওয়ার পরেই ঐ কমেন্টটি মুছে ফেলা হলেও তার আগে ও পরের দুটি কমেন্ট এখনও (এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত) বিরাজমান।

ব্যক্তি আশিকুর রহমান রাব্বানী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ৭ম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, সে (ময়নুল) কোনো কমেন্ট করে নাই। এমনকি লাইক পর্যন্ত দেয় নাই। সে আমার ফ্রেন্ডলিস্টেও নাই। তারে আমি চিনিও না।

তিনি আরও জানান, আমি ঐ কমেন্টের স্ক্রিনশট ভাইরাল হওয়ার পরে পোস্ট দিছি। তাহলে সে আমার পোস্টে কমেন্ট করে কিভাবে?

এছাড়াও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্ত ময়নুলকে কুমিল্লা নগরীর পশ্চিম বাগিচাগাঁও এর একটি বাসা থেকে সুকৌশলে ধৃত করেছেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এস আই (নি:) খালেকুজ্জামান ও তার ফোর্স।

কিন্তু জিডি করতে যাওয়া ময়নুলের সাথে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঐদিন পুরোটা সময় ময়নুল কুমিল্লা কোতোয়ালি থানা ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ের বাইরে আর কোথাও যাননি। শিক্ষার্থীরা তাকে বাইরে নিয়ে আসতে চাইলে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু ছালাম মিয়া জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে আসতে দেননি। এখানে `সুকৌশলে আটক` করার জন্য কোনও বিষয়ই ছিলো না বলে জানিয়েছেন তারা।

সোমবার (২০ মে) ময়নুল কুমিল্লা কোতয়ালি মডেল থানায় নিরাপত্তা চেয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করতে যান। তবে পুলিশ জানায়, তার পক্ষ থেকে কোনও জিডি নথিভুক্ত হয়নি। জিডি করতে যাবার সময় অভিযুক্ত ময়নুলের সাথে উপস্থিত ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মাজহারুল ইসলাম হানিফ জানান, কয়েকজন তাকে নিয়ে তার নিরাপত্তার জন্য জিডি করতে যায়। আমি থানায় ব্যক্তিগত কাজে আগে থেকেই ছিলাম। একজন ওসি এবং এসআই তার সব কথা শুনে এবং মোবাইলের সবকিছু দেখে তাকে বলেন এএসপি আব্দুল্লাহ আল মামুন আপনাদের জিডি কপি দেবেন। পরে জিডি কপি আর দেয়া হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, অধিকতর তদন্তের জন্য তাকে একদিন আমাদের জিম্মায় থাকতে হবে।

পরে মামলার নথি অনুযায়ী ২০ মে রাতেই তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। তবে তাকে কোন জায়গা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট তথ্য জানায়নি পুলিশ। এ ব্যাপারে মামলার বাদী এসআই খালেকুজ্জামান তার সিনিয়র অফিসার থানায় উপস্থিত না থাকায় কোনও ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। ময়নুলের সঙ্গে তার মেসে থাকা অন্যান্য বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমেন্ট ভাইরাল হওয়ার পর ময়নুল আর সেই বাসায় আসেননি।

মামলাটি বর্তমানে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) শাখায় তদন্তাধীন রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে গত ২১ মে (মঙ্গলবার) কুমিল্লা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে আসামীকে কোর্টে প্রেরণ করার আবেদন করেন কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) শাখার এস. আই (নি:) মোহা. ইকতিয়ার উদ্দিন। আবেদনে তিনি আসামির বয়স ২৩ বলে উল্লেখ করেন, যেখানে মামলার এজাহারে তার বয়স লেখা ২১।

এছাড়াও ‘আসামি জামিনে মুক্তি পাইলে পলাতক হবার সম্ভাবনা’ এবং ‘মামলার তদন্তের স্বার্থে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের প্রয়োজন হতে পারে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে’। কিন্তু ভুক্তভোগী ময়নুল পূর্বে থেকেই বলে আসছেন, ‘আমি সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল। আমি হিন্দু ধর্ম নিয়ে কোনো বাজে মন্তব্য করিনি। আমার নামে ফেইক আইডি খুলে এই অপপ্রচার চালানো হয়েছে। কেউ আমাকে ভুল বুঝে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। আমি বঙ্গবন্ধুর আমি বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বিশ্বাসী।’

মামলার এজাহারে ভুল তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এস আই (নি:) খালেকুজ্জামান জানান, আমি এখন এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না। পরে ফোন দেন। একই প্রশ্ন আবার করলে তিনি বলেন, `থানার ওসিকে ফোন দেন। আমি এখন অপারেশনে আছি।

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবু ছালাম মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ওঠাননি।

মামলার নথিতে ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয় জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রতিবেদনে ত্রুটি থাকলে সেটা আদালত দেখবে। আপনি দেখার কেউ না।

এসব ত্রুটির কারণে একজন ‘নিরপরাধ’ শিক্ষার্থী ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিনা জানতে চাইলেও তিনি একই উত্তর দেন।

এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ড. কাজী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন জানান, ‘ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের। তাই এই বিষয়ে আমি প্রশাসনিকভাবে যথাসম্ভব খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করেছি বাকি বিষয় পুলিশ প্রশাসন ও আদালত দেখবে। তদন্তের ভিত্তিতে ময়নুল যদি দোষী না হয় তাহলে সে অবশ্যই ছাড়া পাবে।

অমৃতবাজার/কিশোর/আরএইচ