ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

রাবিতে বাড়ছে বিদেশি শিক্ষার্থী: প্রতিবন্ধকতা ‘বাংলা’


শিহাবুল ইসলাম, রাবি

প্রকাশিত: ০৩:৩৭ পিএম, ১৮ এপ্রিল ২০১৮, বুধবার
রাবিতে বাড়ছে বিদেশি শিক্ষার্থী: প্রতিবন্ধকতা ‘বাংলা’

বিশ্ববিদ্যালয়ে কেটে গেছে একটি বছর। অনেক চড়াই-উৎরায় পেরিয়ে আয়ত্ব হয়েছে আধো আধো বাংলা। একটু আধটু বলতে পারলেও বাংলা লেখা বা পড়া কোনটাই আত্মস্থ করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি। তবুও থেমে নেই বাংলা শেখার সংগ্রাম।

এভাবে সংগ্রাম করেই লেখাপড়া চলছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের তিন শিক্ষার্থীর। এ সংগ্রাম শুধু তাদের নয়, এটি রাবির বিভিন্ন বর্ষে পড়াশোনা করা ৩৩ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর।

এদিকে গত কয়েক বছর থেকে রাবিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। কূটনৈতিক জটিলতা নিরসন, ভর্তি প্রক্রিয়া সহজকরণ, টিউশন ফি হ্রাসসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করায় এ সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। ভর্তি হওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের সমস্যা দূর করতে কেন্দ্রীয়ভাবে ‘কমিউনিকেটিভ বাংলা’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে প্রকৌশল অনুষদ। একই দাবি করেছেন অন্য বিভাগের শিক্ষকরাও।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক শাখা জানায়, ৮-১০ বছর পূর্বে এখানে মার্কিন দুই তরুণ-তরুণী ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ না করেই তারা চলে যায়। এর দীর্ঘ সময় পর ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে দুইজন এবং ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে তিনজন নেপালি শিক্ষার্থী স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়। এরপর ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে রেকর্ড সৃষ্টি হয়। পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে ওই সেশনে ১৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। এদের মধ্যে ১০ জন স্নাতক শ্রেণি ও ৪ জন স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে। যাদের মধ্যে ৬ জন নেপালি, ৬ জন সোমালিয়া, জর্ডান ও ভারতের একজন করে।

চলতি ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির জন্য আবেদন করেন ৩৬ জন বিদেশি শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই শেষে ৩১ জনকে মনোনয়ন দেন। এরমধ্যে স্নাতকোত্তরে ১৪ জন ও স্নাতকে ১৭ জন। এখন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ১৪ জন। স্নাতক পর্যায়ে প্রথম বর্ষে ভর্তির জন্য মনোনিত ১৭ জনের মধ্যে ১৬ জন নেপালি ও একজন জর্ডানের শিক্ষার্থী। এখন পর্যন্ত অনার্সে ৮ জন ও মাস্টার্সে ৬ জনসহ মোট ১৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। মাস্টার্সে ভর্তি হওয়া ছয় জন শিক্ষার্থীই সোমালিয়ার। অনার্সের ৮ জনের মধ্যে জর্ডানের একজন বাদে সবগুলোই নেপালের।

এদের মধ্যে পাঁচজনই ভর্তি হয়েছেন ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগে। বাকী ৯ জনের মধ্যে অর্থনীতি ও অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগে দুইজন করে এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ফর্মেসি, রসায়ন ও ফিসারিজ বিভাগে একজন করে ভর্তি হয়েছে।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগের সিলেবাস এখন ইংরেজিতে প্রণয়ন করা হয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের কিছু বিভাগে অপশনাল হিসেবে বাংলায় পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান অনুষদে এর বালাই নেই। ইংরেজি ভার্ষনে লেখাপড়া বাধ্যতামূলক হলেও প্রতিটি বিভাগেরই প্রায় দুই-চার জন শিক্ষক ক্লাস নেন বাংলায়। আর এখানেই বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় মহাবিপাকে।

বাবা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পেশা মনে ধরে কৃষ্ণ প্রষাদ চৌধুরীর। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন বড় হয়ে ভেটেরিনারি চিকিৎসক হবার। বড় ভাইয়ের পরামর্শে ইন্টারনেটের মাধ্যমে রাবির ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগে ভর্তির আবেদন করেন। কৃষ্ণ প্রষাদ বলেন, ‘রাবিতে ভর্তি হয়ে অনেক ভয়-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে ক্লাস করাও শুরু করি। ভেবেছিলাম ক্লাসে গিয়ে ভয়টা কেটে যাবে। কিন্তু যখন দেখলাম একজন শিক্ষক এসে বাংলায় কথা বলছেন তখন ভয়টা বেড়ে যায়। পুরো ক্লাসে হা করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই বুঝে উঠতে পারি নি।

কয়েকজন শিক্ষক ইংরেজি ও ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে ক্লাস নেয়, সেগুলো একটু বুঝতে পারলেও বাংলায় ক্লাস নেয়া কয়েকজন শিক্ষকের ক্লাসে কিছুই বুঝতাম না। আমরা তিন নেপালি বন্ধু ছাড়া কোন বন্ধুর সঙ্গেও কথাবার্তা বলতে পারতাম না। প্রথম দিকে এই বিষয়গুলো মানসিকভাবে খুব কষ্ট দিয়েছিল। অনেক প্রচেষ্টার পর এখন বাংলা শুনে কিছুটা বুঝতে পারলেও বাংলায় লেকচারশিট দিলে কিছু পড়তে পারি না।’

জর্ডানের আম্মান শহর থেকে এ বছর রাবির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হয়েছেন রাদ ইব্রাহিম খলিল আবু সায়ন। এ দেশের ঐতিহ্যকে ভালোবেসে ভর্তি হয়েই ২৫ জানুয়ারি চলে আসেন ক্যাম্পাসে। ভালোবাসার খেসারত হিসেবে তাকে পদে পদে পড়তেও হচ্ছে বিপাকে। আবু সয়ন বলেন, ‘ইন্টারনেট ও এখানে পড়া বড় ভাইদের থেকে শুনে এদেশের ঐতিহ্যের প্রেমে পড়ে যায়। তাই ভর্তি হয়ে খুব দ্রুত ক্যাম্পাসে চলে আসি। এখানকার সিনিয়র-জুনিয়রের সম্পর্কটা খুব ভালো লাগছে। সিনিয়রকে বড় ভাই হিসেবে দেখা হয়, যেটা আমাদের দেশে নেই। এদেশের মানুষ খুব রিসপেক্টফুল ও হেল্পফুল। সবসময় সহযোগিতা পাচ্ছি।’

সমস্যার কথা উল্লেখ করে রাদ বলেন, ‘যোগাযোগ করতে গিয়ে পদে পদে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। ক্যাম্পাসে ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে পারলেও বাংলা না জানায় আশেপাশে গিয়ে কারো সঙ্গে কোন কথা বলতে পারছি না। তার থেকেও বড় সমস্যা হচ্ছে ক্লাসে গিয়ে। অধিকাংশ শিক্ষক ইংরেজি ও ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে ক্লাস নিলেও কয়েকজন শিক্ষক বাংলায় ক্লাস নেন। বাংলায় নেয়া ক্লাসগুলোতে কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আবহাওয়া ও খাবার নিয়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, তবে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি।’

ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. আবু জাফর মোহাম্মাদ তোহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিদেশি শিক্ষার্থীদের সমস্যার বিষয়টি মাথায় রেখেই আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ থেকে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ‘কমিউনিকেটিভ বাংলা’ একটা কোর্স চালুর প্রস্তাব দিয়েছি। এটার প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের এখানে যারা বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে তারা সবাই ওই কমন কোর্সটি পড়ে বাংলা শিখতে পারবে। এতে তাদের যোগাযোগ করার সমস্যাটা দূর হবে।’

ক্লাসে বাংলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সিলেবাস ইংরেজি হলেও আমাদের মাতৃভাষা তো বাংলা। তাই ক্লাসে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর ক্ষেত্রে বাংলা চলে আসে। অধিকাংশ শিক্ষক ইংরেজিতে ক্লাস নেন বা ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে ক্লাস নেন। এটা শুধু আমাদের এখানে না, সব বিভাগেই এমন সমস্যা আছে। আমরা শিক্ষকরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করছি অচিরেই এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবো।’

ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ইসমত আরা বেগম বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকরা কেউ একেবারে বাংলায় ক্লাস নেন না। কিন্তু আমাদের মাতৃভাষা তো বাংলা। এইজন্য বোঝানোর ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহার প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাদের বাংলা শেখার ব্যবস্থা করলে তারা উপকৃত হবে।’

এ বিষয়ে অ্যাকাডেমিক শাখার উপ-রেজিস্ট্রার এএইচএম আসলাম হোসেন বলেন, গত ২১ জানুয়ারি থেকে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়ে মার্চ পর্যন্ত চলে। ইতোমধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মনোনিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৪ জন ভর্তি হয়েছেন।

অমৃতবাজার/শিহাবুল/সুজন